এইতো আমার শহর…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হোমায়েদ ইসহাক মুন

কয়েকদিন আগেই এই শহরে এক ঝলক বৃষ্টি ঝরে পড়লো। একে ফাল্গুনের হাওয়া বদল বলা যায়। আমাদের বাড়ির প্রধান ফটক গলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই একটা কড়া গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা লাগল। মাদকতায় ভরা আমের মুকুলের সোধা গন্ধ। এর সঙ্গে মিলে মিশে আছে বৃষ্টির পরে মাটি আর বালি ফুড়ে উপচে পড়া মাটির গন্ধ। নিজেকে বড়ো সৌভাগ্যবান মনে হল যে, এই ঢাকা শহরে রীতিমত যুদ্ধ করে এখনো  আমাদের বাড়িতে ছোট আঁকারের পাঁচ থেকে সাতটি আম গাছ দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টির ঠিক আগেও অগনিত আমের মুকুলে বাড়িময় মৌ মৌ করছিলো। স্বভাবতই ঝড় বৃষ্টিতে অধিকাংশই  ঝড়ে পড়ে।গানের ভাষায় বলতে হয় এই শহর যাদুর শহর। না হলে এত বৈপরিত্তের মাঝে আমাদের বেঁচে থাকাটাইতো ঢের। একশো একটা বাঁকা কথা চাইলেই বলা যাবে এই শহরকে নিয়ে, তবুও নিত্যদিন এই শহরেই কত ফুল ফোটে। হয়তো যেখানে সেখানে এই ফুল পাবেন না, তারপরও সময় করে একবার রমনা পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন বা বলধা গার্ডেনেই যান না দেখবেন ফুটে আছে জেসমিন, সন্ধ্যা মালতি, নয়নতারা, জবা, হাস্নাহেনা, টগর,কামিনী, বাগানবিলাস, জুঁই কতকি। চার দেয়াল আমাদের সঙ্গী তাতে কী, একটা ফুলের গাছও ঠাই পেতে পারে না!চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে গেলে মনটাই ভরে যায়, কৃষ্ণচূড়ার দল যেন লাল গালিচায় আসার আহ্বান জানাচ্ছে। কাক ছাড়াও এই শহরে আরও অনেক পাখি আছে, শুধু ভালোভাবে একটু তাকাতে হবে।শালিক, ফিঙ্গে, ঝুটি ওয়ালা বুলবুলি, দোয়েল ,শ্যামা, চড়ুই, টুনটুনি, টিয়া একটু গাছ পেলেই আসবে।এছাড়াও কিনতে পারবেন এই শহরে নানা রঙ্গের পাখি খাঁচায় বন্দী ঠিক আমাদের মতই।

বোটানিক্যাল গার্ডেন

কোথাও কারো দাঁড়াবার দুদণ্ড সময় নেই তারপরও একটু ছুটি পেলে হাওয়া খেতে  ছুটে যাওয়া যায় হাতিরঝিল।রাতের আলোকসজ্জাতে মনে হয় এই ঢাকা যেন সত্যি অন্য এক যাদুর শহর। বর্ষার আগমনী বার্তাকে সামনে রেখে রাস্তা খোঁড়ে প্রজন্মের কল্যাণে, তারপরও পথ তো চলতে হবে এই শহরে। কাদাময় রাস্তায় কেউ গাড়ি হাঁকিয়ে গেলে একটু ছিটে ফোটা বরদাস্ত করতে হবে বৈকি। উন্নয়ন তো হচ্ছে, উড়াল সেতুতে উড়াল দেবেন কষ্টতো একটু সইতেই হবে। কত শত ছেলে-মেয়েরা এখন সাইকেলে পথ চলছে

তা কিন্তু শুভ লক্ষণ এই দূষণময় শহরের জন্য। যানজটের এই শহরে বাস এ উঠলে মনে হয় গল্পের একেকটা প্লট পাওয়া যাবে। সঙ্গে একটা বই রাখুন, একটু হাতে সময় নিয়ে বের হন, সিট পেলে পড়তে শুরু করুন, দেখবেন গল্পের ক্লাইম্যাক্স আসতে আসতে আপনার গন্তব্যও চলে এসেছে। এক্ষেত্রে মনে হয় যানজটটাই আশীর্বাদ, কত শত গল্প পাওয়া যায় তাতে। গাল দেবেন না, কারন এতে আমার আপনার হাতে নেই। সময়টাকে উচ্ছন্নে না বিলিয়ে একটু কাজেই লাগালেন আর কী। সবাইতো এই বুকেই আছে তাই একটু ঢুকলাম না ফেইসবুক এ। শহরের খাবারে ভেজাল, তারপরওতো এই শহরে তাজা শাঁক আর নদীর মাছও পাওয়া যায়। কারন বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, এজন্যই তো আমারাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। শহরের সব কিছুতে গণ্ডগোল তারপরেও বৃষ্টি হলে খিচুড়ি, ডিম, ভর্তা আর আঁচারের জন্য মনটা অস্থির হয়। বাড়ি ফিরে দেখি মা ঠিকই রেঁধে রেখেছেন, তা গ্যাসের সঙ্কট শহরে যতই থাকুক। ঢাকা শহর থেকে চাঁদ মামাকে ঠিক ঠিক দেখা যায়, তবে বড়ো দালানের উপরে উঠতে হবে বৈকি। বিদ্যুতের আসা যাওয়ার মাঝে একটু দেখে নিতে পারলে ক্ষতি কী!

বলধা গার্ডেন

অনেক মুরুব্বীদের কাছ থেকে আগের দিনের ঢাকার গল্প শুনি, এই শহরের কত জায়গা যেখানে এক সময় শিয়াল ডাকতো তা এখন পরিকল্পিত বস্তি।বছর দশেক আগেও যে জায়গায় নৌকা দিয়ে বেড়াতে গেলাম সেখানে এখন সিটি বস্তি। যেখানে শুধুমাত্র একটা শহরের উপর সকলে নির্ভরশীল সেখানে

তো কিছুদিন পর পর পয়নিস্কাসন প্রণালীতে হাত দেওয়া ছাড়া উপায় কী বলুন! নদী গুলো যা আছে তা শহরকে অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছে তারপরও বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা আমাদেরই নদী। নদী বাঁচাও বলে হাহাকার করে কী লাভ! এত মানুষের বর্জ্য যাবেটা কই তাহলে। এই শহরে বাণিজ্য মেলা হয়, বই মেলা হয়, ছবি মেলা হয়, সিনেমার মেলা হয়, গান বাদ্য হয়। ম্যারাথন হয়, সাইকেল রেস হয়, সাতার হয়, ঘুড়ি উড়ানো হয়।গাছ কেটে আরেকটা গাছ লাগানো হয় না, রাস্তা খুড়ে তা সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করা হয় না, বস্তিতে আগুন লাগলে তা নেভানো হয় না, নদী ভরাট করলে তা দখলমুক্ত করা হয় না। না এর কথাতো বলাই যায়। সঙ্গে হয় অনেক কিছুই তার মধ্যে ভালবাসাটা হয় রিক্সায়। এই শহর যে রিক্সারও শহর, মসজিদের শহর, কান ফাটানো ওয়াজ আর ভাষণের শহর, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলার শহর, ফুটপাত দখলের শহর, সস্তায় কাপড় কেনার শহর, পুরাণ ঢাকার বিরিয়ানির শহর, সর্বোপরি উৎসবের শহর।

আমাদের এই ঢাকা শহর ৪০০ বছরেরও পুরনো। এর মধ্যে জড়িয়ে আছে কত ইতিহাস, সংগ্রাম, কত ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। এখানেই স্বৈরাচার আন্দোলন হয় আবার গণজাগরণের আন্দোলন হয়। গনমানুষ এক হয় দাবি আদায়ের জন্য। অবরোধ-ধর্মঘট-হরতালে মানুষ হেঁটে চলে মাইল কে মাইল। দাবি আদায় হয় আবার বাড়ি ফিরে যায়। এই শহরতো আজব শহর। কখন যে কি হয় বলা মুশকিল। এই শহরে যাদের জন্ম তারা এতেই অভ্যস্ত, এতেই তৃপ্তি। পৃথিবীর আর কথাও যে এমন শহরটি নেই কো।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]