এই আরব্য মরুশহর আমার নয়

ডা. এম আল মামুন

(তাবুক, সৌদি আরব থেকে): দেশ ছেড়ে এই মরুশহরে এসেছি অনেকগুলো বছর হয়ে গেল। মরুশহরের নাম তাবুক। এটি সৌদি আরবের চতুর্থ বৃহত্তম শহর। এ শহরকে ঘিরে যে প্রদেশ সেই ‘তাবুক প্রদেশ’-এর অবস্থান দেশটির উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে। তাবুক প্রদেশের পুরো পশ্চিমপ্রান্ত ছুঁয়ে আছে ‘রেড সী’, যাকে আমরা বাংলায় বলি লোহিত সাগর। ছোটবেলায় ভূগোল বইয়ে লোহিত সাগরের নাম পড়েছিলাম। আমার জীবনের একটি অংশও যে সেই লোহিত সাগরের এতো কাছাকাছি এসে প্রবাহিত হবে- তা কি কখনো ভেবেছি? এই লাল সমুদ্রের নীল জলরাশি তাবুক প্রদেশেরই একটি অঞ্চলে এসে উপসাগরে রূপ নিয়েছে। উপসাগরের উল্টো তীরেই পিরামিডের দেশ মিসর। তাবুকপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মিসরপ্রান্তের দিকে তাকালে সাগরের নীল ঢেউ ছাপিয়ে চোখে পড়ে দিগন্ত ছুঁয়ে যাওয়া সারি সারি পাহাড়। লালরঙা পাহাড়ের চূড়ায় উঁকি দেয় ঝকঝকে নীল আকাশ। সুনশান রোদেলা মরুদুপুরে লোহিত সাগর তীরের মন উদাস করা এসব দৃশ্য দূরবাস জীবনের নিঃসঙ্গতাকে করে তোলে গভীর থেকে আরও গভীর…।

প্রথম দিকে বেশ খারাপ লাগলেও এই মরুশহরের জীবনে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি বলাটা হয়তো ঠিক হলো না। আসলে কথাটি হবে নিজেকে অভ্যস্ত করে নিয়েছি। কারণ মন খারাপ করা নিঃসঙ্গতার পাশাপাশি এখানে আছে মন ভাল করা পেট্রো-ডলার। আমাদের জীবনে কখনও কখনও ‘টাকা’-এর চাইতেও বেশী দরকার বোধ হয় ‘ডলার-পাউন্ড-ইউরো’ কিংবা ‘পেট্রো-ডলার’-এর। হয়তো এ কারণেই লোকজন প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে বেছে নেয় দূরবাস জীবন।

পেশায় চিকিৎসক হলেও আমাকে এখানে কোনো হাসপাতালে ‘ডাক্তারি’ অর্থাৎ রোগী দেখার কাজ করতে হয় না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে এখানকার সরকারী প্রাদেশিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভবনে রোগ প্রতিরোধ বিভাগে সপ্তাহে পাঁচ দিন অফিস করি। ভবনের পাঁচতলার পুরোটা জুড়ে আমাদের জনস্বাস্থ্য বিভাগ। কখনও কখনও অফিসে কাজের ফাঁকে ধূমায়িত কফি হাতে জানালার পাশে এসে দাঁড়াই।  জানালার বাইরে ধূসর আকাশ আর মরুশহরের চারপাশের সু-উচ্চ মেটেরঙা পাহাড় দেখে সময় পার করি। আর উইক-এন্ডগুলো কাটিয়ে দেই স্বদেশী সহকর্মীদের সাথে নির্জন মরুভূমির পীচঢালা রাস্তায় লং ড্রাইভে, কিংবা ‘রেড সী’র ধার ঘেষে মেরিন ড্রাইভে, কখনও কখনও লাল সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল পানিতে সাঁতার কেটে। কোনও কোনও পূর্ণিমার রাতে বিনে পয়সায় উপভোগ করি মরুভূমির শূন্যতা মেশানো অপরূপ রূপালী মরুজোছনা। আহা! কি অদ্ভুত মায়াবী সেই মরুজোছনা। যে মরুজোছনা মানুষের মনকে পাগল করে দেয়…।

সময় কাটানোর জন্য এখানে আরও অনেক কিছুই আছে। দ্রুত গতির ইন্টারনেট, সবগুলো অন-লাইন বাংলা খবরের কাগজ, কিংবা স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সব ক’টা বাংলা টিভি চ্যানেল। তাবুক শহরের ডাউন টাউনের বাঙালী মার্কেটে গেলে এক টুকরো বাংলাদেশকেও খুঁজে পাওয়া যায়। ভোজন বিলাসী মানুষদের জন্য এই শহরে আছে হরেক দেশের হরেক খাবারের রেঁস্তোরা। ঐতিহ্যবাহী অ্যারাবিয়ান রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি তুর্কি রেস্টুরেন্ট, লেবানিজ রেস্টুরেন্ট, ইজিপ্শিয়ান রেস্টুরেন্ট, সুদানী রেস্টুরেন্ট, দক্ষিণ-ভারতীয় রেস্টুরেন্ট, অথবা পাকিস্তানী রেস্টুরেন্ট। হাতে গোণা দু’ একটি বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টও আছে। আরও আছে স্টারবাকস্ কফি শপ, আছে কে এফ সি, ম্যাকডোনাল্ড, পিৎজা হাটের মত উন্নত বিশ্বের সব কটা ফার্স্ট ফুড চেইন। এত কিছু থাকার পরও এখানে কি যেন নেই, কে যেন নেই। হয়তো এই দূরবাস জীবনে চারপাশে অনেক সহকর্মীর ভীড়েও প্রতিটি প্রবাসীই ভীষণ রকম একা। আরব্য সংস্কৃতির এই মরুশহরে স্বদেশ এবং স্বদেশের প্রিয় মানুষদের মিস্ করাটাই যেন সব প্রবাসীর নিয়তি।

মরুভূমি মানেই সব সময় গরম লু হাওয়া নয়। এই যেমন, এই নিঃসঙ্গ মরুশহরে, এখন মধ্য-জানুয়ারীর তীব্র শীত। মাঝে মাঝেই তাপমাত্রা শুন্যের (ডিগ্রী সেলসিয়াস) নীচে নেমে যায়। তখন শহরের বাইরে দূর-উত্তরের পাহাড়গুলো ঢেকে যায় তুষারকণার আবরণে। শহর থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে জর্ডান সীমান্ত। সীমান্ত অতিক্রম করে ঘন্টা তিনেক ড্রাইভ করলেই পৌঁছে যাওয়া যায় ইউরোপে। ইউরোপের খুব কাছাকাছি হওয়ায় শীত মৌসুমে এই মরুশহরে বইতে থাকে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। কর্মব্যস্ত দিনের শেষে মরুশহরের শীতের রাতগুলো হয় খুবই শুনশান, নিস্তব্ধ। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ল্যাপটপের ইউটিউব থেকে ভেসে আসা কোনও কোনও বাংলা গান অবশ্যই আপনাকে তীব্র রকম নস্টালজিক করে তুলবে। যেমন, এই গানটি……।

“এই দূর পরবাসে তারা গুণি আকাশে আকাশে

কাটে নিঃসঙ্গ রাত্রিগুলো।

মাঝে মাঝে স্বপ্নের বেশে স্মৃতিরা এসে

আমাকে করে যায় বড় বেশী এলোমেলো।

মনে পড়ে যায় বন্ধুদের আড্ডা মুখর প্রহর

তমুল উল্লাসে ভরা প্রিয় শহর।

সেখানে হয়তো সবাই, ব্যস্ত, মেলে না সময়

তবু সেখানেই ফিরে যেতে চায় ফেরারী হৃদয়……..।”

 

লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box