এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়…

কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত নীরা বিষয়ক একটি কবিতার লাইন –
‘‘এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে , ভালোবাসি–
এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?’’

ওষ্ঠের ভাষা চুম্বন। স্পর্শ, গন্ধ আর স্বাদে মস্তিষ্কে পৌঁছে যাওয়া ভালোবাসার এক আলোকিত আহ্বান। সে আহ্বানে মানব-মানবী সেই আবহমান কাল থেকে ঘর বাঁধে, সংসার গড়ে, জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকে হয়তো। দিনটা ছিলো বৃষ্টিভেজা। রাজধানী জুড়ে কদমফুল ফুটেছিলো কি না জানা হয়নি, যেমন জানা হয়নি বৃষ্টিহীন বর্ষাকালে প্রর্থিত বৃষ্টি এসে তাদের স্থানকাল ভুলিয়ে দিয়েছিলো কি না।জানা হয়নি বাজারে কমেছিলো কি না ইলিশের দাম। কিন্তু বৃষ্টিশেষে ম্লান আলোয় প্রকাশ্য রাজপথে তাদের চুম্বনদৃশ্য চমকে দিয়েছে অনেককেই। আর মুহূর্তেই চুমু খাওয়ার এই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে।

বলছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি‘র মোড়ে একজোড়া ভালোবাসার মানুষের ভালোবাসা প্রকাশের ছবিটির কথা। এই তরুণ-তরুণীর নাম জানা যায়নি। আর নামেই বা কী এসে যায়? এমন ঘনঘোর বরিষায় তো ভালোবাসার দিন কদমফুলের মতো সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে ফুটে ওঠে।

ছবিটি নিয়ে চলছে ব্যাপক বিতর্ক। ছড়িয়েছে উত্তপ্ত পক্ষে-বিপক্ষে। প্রশ্ন উঠেছে নৈতিকতার সীমা ভাঙ্গা নিয়ে।কথা হচ্ছে সমাজে ভালোবাসার এমন সুন্দর প্রকাশভঙ্গী নিয়েও।

মানবসমাজে চুম্বনের শুরুটা কোথায়, আর কীভাবে? উত্তর দেয়াটা বেশ কঠিন। তবে ১৯৬০ সালে ইংরেজ প্রাণিবিজ্ঞানী ডেসমন্ড মরিস প্রথম প্রস্তাব করেন যে, চুম্বন সম্ভবত উদ্ভূত হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষ প্রাইমেট মায়েদের খাবার চিবানো আর সেই খাবার অপরিণত সন্তানকে খাওয়ানোর মাধ্যমে। শিম্পাঞ্জি মায়েরা এখনও এভাবে সন্তানদের খাওয়ায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও ব্যাপারটা ঠিক এভাবেই এবং এ কারণেই তৈরি হয়েছিল। আর একটা সময় চুম্বন মানববিবর্তনের একটি অংশ হয়ে ওঠে। এর পরিধি বৃদ্ধি পায় সন্তানের প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রেমিক-প্রেমিকার রোমান্টিকতায়, যার নানা ধরণের অভিব্যক্তি আমরা লক্ষ্য করি মানবসমাজের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে। ১৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে বৈদিক সাহিত্যে নাসিকা ঘর্ষণের কথা জানতে পারা যায় | যার মাধ্যমে প্রকাশিত হত নর-নারীর প্রগাঢ় অনুরাগ | সাহিত্যে, মহাভারতের মত মহাকাব্যে পাওয়া যায় প্রথম চুম্বনের বীজ — সে ছুঁয়েছিল আমার ওষ্ঠ/ তৃপ্তির ফুল ফুটেছিল বুকে/ চারদিক জ্যোৎস্নাময়/ কী অফুরন্ত সুখে !

প্রথম চুমু কথাটার মাঝেই ঘোরলাগা একটা ব্যাপার আছে। স্মৃতির পাতা উল্টে গেলে ঠিক শোনা যায় পেছনে ফেলে আসা অনেক সময় আগের সেই বুকের ধুকপুক। প্রথম চুমু খাওয়ার ওপর সাহিত্যে শত শত লাইন লেখা হয়েছে, ব্যবহার করা হয়েছে বহু উপমা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই চুমুর মাঝে লুকিয়ে থাকে সংকেত। চুমু সহায়তা করে সঠিক সঙ্গী খুঁজে নিতে।
গবেষণায় পাওয়া গেছে, পুরুষের তুলনায় একজন নারী অনেক বেশী চুম্বনকে গুরুত্ব দেয়। তাদের শরীরে যখন ‘প্রজেস্টেরন’ নামে একটি বিশেষ হরমোনের মাত্রা বেশী থাকে তখনই তারা বেশী চুমু খেতে চায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মেয়েরা তখন স্বাস্থ্যবান, নরম অবয়বের এবং নিম্ন কন্ঠের পুরুষকে চুমু খেতে বেশী আগ্রহী হয়। মেয়েদের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে তারা দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্য সম্পর্ক এবং সুন্দর সম্পর্কের জন্য চুম্বনের ভূমিকাকে সব সময় ভোটে এগিয়ে রাখে। বিজ্ঞান বেলে, নারীর ভেতরে বংশ বৃদ্ধির যে প্রবণতা কাজ করে তারই সূত্র ধরে তারা পুরুষ সঙ্গীকে বেঁধে রাখতে চায় চুম্বনে।

চুমু নিয়ে পৃথিবীতে কাণ্ডকারখানার কোন অন্ত নেই। সিনেমার পোস্টার থেকে শুরু করে দীর্ঘতম চুম্বন-সব জায়গায় সুপারহিট। পঞ্চাশের দশকে হলিউডের ছবি ‘গন উইথ দা উইন্ড’-এর পোস্টারে নায়ক-নায়িকার চুমু খাওয়ার দৃশ্য আজ পর্যন্ত সবচাইতে রোমান্টিক দৃশ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মানুষের সবচাইতে দীর্ঘ চুমু খাওয়ার রেকর্ড রয়েছে ৫৮ ঘন্টা ৩৫ মিনিট এবং ৫৮ সেকেন্ডের।
তবে সিনেমায় রোমান্টিক চুম্বন দৃশ্য যেমন আছে তেমনি পৃথিবীর আকর্ষণীয় ঠোঁট নিয়েও জরিপ চালিয়েছে মানুষ। আর তাতে দেখা গেছে এখন পর্যন্ত সব চাইতে বেশী ভোট পেয়েছে অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির ঠোঁট।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

ছবিঃ গুগল