এই কান্নার কোন সমাধান নেই

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

(কানাডা থেকে): সরিষাবাড়ীতে যাত্রা দল আসতো শীতকালে। যাত্রা তখনো ভদ্রলোকের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়নি। আমার আব্বা নাটক পাগল মানুষ ছিলো। নিজে এক সময় মঞ্চ নাটক করেছে। আমার আম্মা-চাচী-বোনেরা যাত্রা দেখতে যেতো। আমার যাওয়া হতো না। কারণ যাত্রা শুরু হতো অনেক অনেক রাতে। আমি ততক্ষনে গভীর ঘুমে। ক্লাস ফাইভ-টাইভে উঠার পর একদিন জেদ ধরে বসলাম। আমি আজ দেখবোই।মফস্বলে রাত। দশটা অনেক রাত। কুয়াশাঘেরা শীতকালে সেটা মধ্য রাত।

বোনেরা জেগে থাকার জন্য লেপের ভেতর পা ঢুকিয়ে রেডিও শুনতো….নাম-দেশ-ফল-ফুল খেলতো। আমি তখনো এই কঠিন জ্ঞানের খেলা শিখিনি। শীতের রাতে লেপের ওমের ভেতর আমার জেগে থাকা তাই সহজ ছিলো না।সেদিন জোর করে আমি জেগে থাকলাম। বোনেরা বিরক্ত হলো। ওরা চাইছিলো আমি না যাই। যাত্রা দেখতে গিয়ে ঘুমিয়ে গেলে বিরাট ঝামেলা। কোলে নিয়ে বসে থাকতে হবে।কিন্তু আব্বা খুব খুশি হলো। আমি জীবনের প্রথম যাত্রা দেখবো!

রাস্তা-ঘাটে তখনো এতো বাতি আসেনি। অন্ধকার আর শীত শীত রাস্তা হেঁটে আমরা শিমলা বাজারের পেছনে চলে এলাম।কারবার দেখে চমকে গিয়েছিলাম তা স্পষ্ট মনে আছে। এই মধ্যরাতে শত শত মানুষ…গম গম করছে বিরাট প্যান্ডেল! আলোতে আলোতে ঝলমল করছে। আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেলো। পুরো জনবসতি যেখানে ঠান্ডায় কুঁকড়ে ঘুমিয়ে আছে সেখানে এমন একটি আলোর দ্বীপ সশব্দে অন্ধকার ফুঁড়ে জেগে আছে সেটা এই একটু আগে ভাবাই যাচ্ছিলো না।

মঞ্চের সামনে খড় বিছানো মাটিতে মানুষ জমিয়ে বসে আছে। মঞ্চের দুই পাশে আর মাটিতে বসা মানুষের পেছনে বেশি পয়সায় টিকেট কাটা মানুষের জন্য চেয়ার বসানো আছে। আব্বা আমাদেরকে চেয়ারে বসিয়ে দিলো।আমার মন পড়ে রইলো খড়ে বসা মানুষদের দিকে। চাদর-মাফলার লাগিয়ে দলে-বলে গায়ে গা লাগিয়ে বসেছে তারা। বিরাট হা হা হি হি চলছে। একটা মানুষও মন খারাপ করে বসে নাই। মনে হচ্ছিলো ওখানে গিয়েই বসি। ওম বেশী হবে!আব্বা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আজকের যাত্রা পালার নাম সোহরাব-রুস্তম। বাবা-ছেলের গল্প। খুব ভালো পালা।’হলোও তাই। সে রাতে এই যাত্রাপালায় চোখের পলক ফেলা কঠিন ছিলো। টান টান উত্তেজনা…দূর্দান্ত অভিনয়..মিউজিক…আমি আজো চোখ বন্ধ করলে দিব্বি দেখতে পাই। এই জগৎ বিখ্যাত ট্র্যাজিক কাহিনী জানে না এমন কি কেউ আছে? মনে হয় না। তবু বলতে ইচ্ছে করছে।

…সোহরাব পূত্র আর রুস্তম পিতা। দুই জনই বিরাট যোদ্ধা। ভাগ্যের র্নিমম পরিহাসে কেউ কাউকে চেনে না। দুই জনের মধ্যে কয়েক দিন ধরে সরাসরি যুদ্ধ চলছে। সোহরাব জানে প্রতিপক্ষের প্রধান তার বাবা। কিন্তু সে তার চেহারা চেনে না। বার বার রুস্তমকেই জিজ্ঞেস করছে, ‘তুমি কি রুস্তম?..তুমি কি রুস্তম?’ রুস্তম তখন যুদ্ধে জেতা নিয়ে ব্যস্ত। তার এই সব প্রশ্নে আগ্রহ নেই। সে শুধু জিততে চায়। তাই সোহরাবের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না।একদিন রুস্তম ঠিক কৌশল করে সোহবারকে পরাস্ত করে ফেললো। বসিয়ে দিলো তার বুকে বিশাল তরবারি। সোহরাব এই কৌশলে অবাক হয়েছিলো। তার মতো বিরাট বীরের কাছে এই কৌশল কাপুরুষতা মনে হয়েছিলো। সে তার না-চেনা বাবা রুস্তমকেই বলেছিলো, ‘আমার বাবা রুস্তম তোমাকে ছাড়বে না।’

রুস্তম তখন স্তম্ভিত..অসহায়..কিংকর্তব্যবিমূঢ় এক বাবা যে না চিনে তার প্রিয় সন্তানকেই হত্যা করে ফেলেছে।সে রাতে কাঁদতে কাঁদতে আব্বার হাত ধরে বাসায় ফিরেছিলাম। সেই প্রথম গল্পের চরিত্র নিয়ে আমি কেঁদেছিলাম।অনেক পরে যখন জানলাম এই গল্প শাহনামা থেকে নেয়া। যেটা লিখেছেন মহাকবি ফেরদৌসী। ৩৩ বছর ধরে মহাকাব্যের কাজ শেষ হয় ৬০ হাজার শ্লোকে। শাহনামায় আছে ৯৯০টি অধ্যায়, ৬২টি কাহিনি! খুব ইচ্ছে হলো মূল লেখাটা পড়ি। সেটা সম্ভব না। মূল লেখা ফার্সী ভাষায়। আমি এই ভাষা জানি না। বাংলা অনুবাদ দু একটা পড়লাম। মন ভরলো না।

এরপর একট ইংরেজী অনুবাদ হাতে এলো। মৃত্যু পথযাত্রী পুত্র সোহরাব না চেনা হত্যাকারী বাবা রুস্তমকেই বলছে-

“Whether you become a fish in the sea,

Or fade into the darkness of night,

Or If you become a twinkle in the starry sky,

And forsake the earth all together,

My father will come seeking vengeance,

When he learns, my bed is in the ground!

Of all these warriors present,

One will bring the news to Rostam,

That ‘your son Sohrab is stricken down’

Then he will come looking for you!!!”

পড়তে পড়তে ঠিক ছোটো বেলার মতো চোখে আবার জল এলো। কেন এলো? সোহরাবের জন্য? রুস্তমের জন্য? নাকি অন্য কিছুর জন্য? আমি বই বন্ধ করে বসে রইলাম। এবার আর কেউ আমার হাত ধরতে এগিয়ে এলো না।ছোটোবেলার কান্না সাধারন। তাই এর সমাধান আছে। বড়বেলার কান্না জটিল। কারন বোঝা যায় না। যিনি কাঁদেন তিনিও ঠিক ঠিক জানেন না কেনো কাঁদছেন। তাই এই কান্নার কোন সমাধান নেই।

ছবি: গুগল

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box