এই গরমে কী করবেন, কী করবেন না

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

গরম মানেই অসুখের সূচনা, আমাদের দেশ এমনিতেই ক্রান্তীয় সূর্যের দেশ, তাপমাত্রা স্বাভাবিক ভাবেই বেশী।  যতদিন গড়াচ্ছে তাপমাত্রা বাড়ছে। আর সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে অসুখের প্রকোপ।  গবেষণায় দেখা গেছে, গরমের সময়ই মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা বেশি দেখা দেয়। তাই এ সময়ে সতর্ক হয়ে না চললে যেকোনো সময়ই আপনিও পড়তে পারেন অসুস্থতায়। গরমে সাধারণত যেসব স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে তা নিয়ে-ই প্রাণের বাংলার এই সংখ্যার প্রচ্ছদ আয়োজন।

পানিশূন্যতা  

গরমে শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বেরিয়ে যায়। প্রয়োজনীয় পানির অভাবে শরীরে এ সময় দেখা দিতে পারে পানিশূন্যতা। পানিশূন্যতার পাশাপাশি শরীরে লবনের অভাবও দেখা দেয়। এ সময়ে শরীরের কোষ সজীব রাখতে প্রচুর পানি খেতে হবে। ইলেকট্রোলাইটসের অভাব পূরণ করতে খাবার স্যালাইন খাওয়া যেতে পারে। শরীরে পানি কম হলে প্রস্রাব হলুদ হবে ও পরিমাণে কম হবে এবং জ্বালাপোড়া করবে। যে পর্যন্ত না প্রস্রাব স্বাভাবিক রঙ ফিরে পাবে, সে পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি খেয়ে যেতে হবে। পানির সঙ্গে অন্যান্য তরল যেমন ফলের রস খাওয়া যেতে পারে।

হিক স্ট্রোক 

অসহনীয় গরমে অনেকে মূর্ছা যেতে পারে। কেউ মূর্ছা গেলে অর্থাৎ হিট স্ট্রোক হলে তাকে যথাসম্ভব শীতল জায়গায় নিতে যেতে হবে। পরনের কাপড় চোপড় ঢিলা করে দিতে হবে, যাতে শরীরে পর্যাপ্ত বাতাস পৌঁছতে পারে। রোগীকে ঘিরে ভিড় করা উচিত নয়। রোগীর শরীরে হালকা ম্যাসাজ করে দেয়া যেতে পারে। রোগীর মুখে শীতল পানির ঝাপটা দিতে হবে। রোগীকে গ্লুকোজ ও খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে।

হঠাৎ অজ্ঞান হওয়া

গরমের তীব্রতায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলা বিচিত্র নয়। মাথাঘোরা, মাথাব্যথাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। হঠাৎ করে রক্তচাপ কমে যাওয়ার ফলে ত্বক শীতল ও ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করে হৃদস্পন্দন দুর্বল থাকে। এ সমস্যা দেখা দিলে অজ্ঞান ব্যক্তিকে দ্রুত ঠাণ্ডা পরিবেশে নিয়ে শুইয়ে দিন। তারপর অজ্ঞান ব্যক্তির শরীর থেকে পোশাক-পরিচ্ছদ খুলে ফেলুন। ঘাবড়ানোর কিছু নেই। কিছুক্ষণ এ অবস্থায় রাখলে অজ্ঞান ব্যক্তির জ্ঞান ফিরে আসবে। তখন মুখে কিছু তরল খাবার খাইয়ে দিন কিংবা প্রয়োজন হলে স্যালাইন দিন।

খিঁচুনি

তীব্র গরমে ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায় বেশিমাত্রায় পানি ও লবণ। শরীরে জলীয় পদার্থ ও লবণের ঘাটতির ফলে ধীরে ধীরে মাংসপেশির সঙ্কোচন শুরু হয়। এমনকি তীব্রভাবে মাংসপেশিতে টান অনুভূত হয়। ব্যথা করে পেশি। ত্বক আর্দ্র ও ঠাণ্ডা থাকে। মাংসপেশি চাপ দিলে ব্যথা লাগে। এ অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শীতল পরিবেশে আনতে হবে এবং খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। প্রতি গ্যালন পানিতে চার চা চামচ লবণ থাকা চাই। এতে করে শরীরে পানি ও লবণের অভাব পূরণ হবে এবং রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারবে।

অবসাদগ্রস্ততা

গরমে বেশি কাজ করার ফলে, সেই সঙ্গে অপর্যাপ্ত লবণ খাওয়ার কারণে অবসাদগ্রস্ততা দেখা দেয়। রোগীর পানিস্বল্পতা, সোডিয়ামের অভাব, আইসোটনিক ফ্লুইডের ঘাটতিসহ প্রভৃতি পরিবর্তন ঘটে। রোগী প্রবল তৃষ্ণা ও দুর্বল অনুভব করে। মাথাব্যথা, অবসন্নতা, কখনো কখনো অজ্ঞান হওয়ার মতো ব্যাপার ঘটে যায়। এ অবস্থায় রোগীকে ঠাণ্ডা পরিবেশে নিয়ে প্রচুর পানি খাওয়াতে হবে। যেমন, দুই থেকে চার ঘণ্টা অন্তর তাকে এক থেকে দুই লিটার পানি খাওয়াতে হবে, সেই সঙ্গে লবণ। প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইন প্রয়োগ করা যেতে পারে। কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা রোগীকে বিশ্রামে রাখতে হবে।

ঘামাচি

ঘামের সঙ্গে ধুলোবালুর মিশ্রণে ত্বকের তেলগ্রন্থি বন্ধ হওয়ার ফলে ত্বকের নিচে ঘাম ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঘামাচির উৎপত্তি হয়। এ সমস্যা এড়াতে দিনে দু-তিনবার ভালোভাবে পরিষ্কার পানি দিয়ে গোসল করতে হবে। সুতি জামাকাপড় পরতে হবে। অনেকে ঘামের জন্য ট্যালকম পাউডার ব্যবহার করেন? কিন্তু সেটা আরো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ছত্রাক সংক্রমণ

গরমে ঘাম জমে থাকার ফলে, বিশেষ করে ঊরুসন্ধিস্থলে ছত্রাক সংক্রমণ ঘটে। ছত্রাক ভেজা স্থানগুলো পছন্দ করে। ছত্রাকের হাত থেকে রেহাই পেতে হলে স্থানটিকে শুকনো রাখতে হবে। সুতির আন্ডার গার্মেন্টস ব্যবহার করতে হবে। ছত্রাক সংক্রমণ ঘটলে অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম যেমন ক্লোট্রামজল দিনে অন্তত দু’বার মাখতে হবে।

ত্বকের সমস্যা

প্রখর রোদে ত্বকে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সময়ে খোলা আকাশের নিচে চললে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি ত্বক ভেদ করে কোষের জন্য বিপদ ডেকে আনে। ত্বকে ফোসকা পড়াসহ ত্বক বিবর্ণ হতে পারে। মেয়েদের ঠোঁটের রঙ পরিবর্তন হতে পারে। কারো কারো ঠোঁট ফেটে জ্বালা যন্ত্রণা করে। তাই এ সময়ে বাইরে বেরোলে অবশ্যই সানস্ক্রিন ক্রিম ত্বকে মেখে বের হতে হবে। ক্রিমের গায়ে সান প্রটোকেশন ফ্যাক্টর বা এসপিএফ লেখা নিশ্চিত হয়ে কিনতে হবে। আমাদের দেশের লোকের জন্য এসপিএফ ১৫ যথেষ্ট। মুখমণ্ডলে এক চা চামচ এবং পুরো শরীরে দুই চা চামচ সানস্ক্রিন ক্রিম বা লোশন মাখতে হবে। এ সময়ে চোখে সানগ্লান পরা শ্রেয়। রিকশায় চড়লে সর্বদা হুড উঠিয়ে চলতে হবে। রঙচঙের পোশাক এবং কালো পোশাক এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। যথাসম্ভ হালকা রঙের কিংবা সাদা রঙের পোশাক পরা গরমের জন্য উত্তম।

গরমে শরীরে ঘাম জমে ছত্রাক সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। ঘাম শরীরের বিভিন্ন ভাঁজে বিশেষ করে কুঁচকিতে, আঙুলের ফাঁকে ও জননাঙ্গে জমা হয়ে সেখানে ছত্রাক সংক্রমণের পথ বিস্তার করে দেয়।

তাই এ সময়ে ছত্রাক সংক্রমণ এড়াতে হলে শরীরের ভাঁজগুলোতে ঘাম জমতে দেয়া যাবে না। প্রয়োজনে ছত্রাকবিরোধী পাউডার এসব স্থানে ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। প্রত্যেক দিন আন্ডার গার্মেন্টস ও মোজা পরিষ্কার করতে হবে।

গরমে শরীরে ঘামাচি দেখা দিতে পারে। ঘামাচির চুলকানি রোধ করতে হলে অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি ঘামাচি থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে হবে। ঘামাচি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কখনো সিনথেটিক পোশাক পরা চলবে না। সব সময় সুতির ঢিলা পোশাক পরতে হবে। শরীরে যাতে ঘাম না জমে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিষ্কার পানি দিয়ে গোসল করতে হবে। প্রয়োজনে একাধিকবার গোসল করা যেতে পারে। শরীরে ট্যালকম পাউডার বেশি না ঢালাই শ্রেয়। রাতে শোবার সময় শরীর থেকে সব পোশাক খুলে ফেললে ভালো।

সুস্থ থাকবেন কীভাবে

 বেশি করে সালাদ খান : সালাদ ঠাণ্ডা রাখে শরীরটাকে। দুঃসহ গরমে বেশি করে সালাদ খান। চর্বিজাতীয় খাবার এসময়ে খাবেন না। বিভিন্ন ধরনের সবজি খাবেন। যেসব মহিলার শরীরে মেদ জমে আছে, এই গরমে তাদের ক্ষেত্রে মেদ কমানোর উপযুক্ত সময়। খাবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসুন এ সময়ে। কম খান। বেশি খেলে পরিশ্রম হয় বেশি। তা ছাড়া বেশি খেলে জমতে থাকে মেদের স্তূপ। কিন্তু সালাদ বেশি খেলে ক্ষতি নেই। বরং ভালো। গরম মোকাবেলার পাশাপাশি আপনার শরীরের মেদও কমিয়ে দিচ্ছে তা।

বেশি করে পানি খান : গরমের হাত থেকে রেহাই পেতে পানির বিকল্প নেই। হাতের কাছে সব সময় পানির পট রাখবেন। প্রচুর পানি খাবেন এ সময়। তৃষ্ণা না পেলেও খাবেন। ঠাণ্ডা থাকবে শরীর। প্রয়োজনে ফ্রিজে রাখা পানি খান। এক চুমুক ঠাণ্ডা পানি আপনার শরীরে বইয়ে দেবে চমৎকার শীতল অনুভূতি। মাঝে মাঝে হাত দিয়ে মুখমণ্ডলে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দেবেন । ভালো লাগবে।

সুতির কাপড় পড়ুন : গরমে সিনথেটিক কাপড় পরবেন না। বাসায় সুতির কাপড় পরে থাকুন। কখনো টাইট পোশাক পরবেন না। সাদা পোশাক পরুন। অন্তর্বাসগুলোও যেন সুতির হয়। সিনথেটিক এবং টাইট পোশাকে শরীরে জমে উঠবে ঘাম। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে ঘাম জমা হয়ে সৃষ্টি হবে চুলকানিসহ বিভিন্ন চর্মরোগ। সেই সাথে গরমে অসহ্যতা তো আছেই। সে ভয় নেই সুতির সাদা কাপড়ে। সুতির দুধা পোশাক আপনাকে ঠাণ্ডা রাখবে।

লেবুর শরবত খান : গরমে লেবুর শরবত হতে পারে আপনার স্বাস্থ্যের জন্য এক চমৎকার পানীয়। শরবতে একটু লবণ ও চিনি মিশিয়ে নিন। চিনি শক্তি জোগাবে, আর লবণ পূরণ করবে আপনার শরীর থেকে ঘামের সাথে বেরিয়ে যাওয়া লবণের অভাবটুকু। লেবুতে থাকে ভিটামিন সি। এই গরমে ভিটামিন সি ফিরিয়ে দেবে আপনার লাবণ্যতা।

ঘরটাকে ঠাণ্ডা রাখুন : লোডশেডিংয়ের ঝামেলায় দুঃসহ গরমে আপনার ঘর ঠাণ্ডা রাখার জন্য বিকল্প  ব্যবস্থা নিতে হবে। দরজা-জানালায় সাদা রঙের পর্দা টানান, যাতে বাইরে থেকে ঢুকতে না পারে সূর্যের তীব্র আলো। মেঝেতে ঠাণ্ডা পানি ঢালুন। পর্দাগুলোও  ভিজিয়ে দিন পানি দিয়ে। আপনার ঘরের মাথার ছাদেও পানি ঢালার ব্যবস্থা করুন। ছাদের ওপরে ছাদজুড়ে শামিয়ানা টানিয়ে নিন।

চুল ড্রাই করবেন না : গরমে চুল ড্রাই করবেন না। তাতে গরম বেশি লাগবে, এমনকি তেলও মাখবেন না। শ্যাম্পু করুন নিয়মিত, ঝরঝরে লাগবে নিজেকে। প্রতিদিন গোসল করুন কয়েকবার। চুলগুলো ছড়িয়ে রাখুন। তাতে বাতাস লাগবে মাথায়। মাঝে মাঝে কলার মোচার মতো করে খোঁপা করুন, যাতে ঘাড় ও কাঁধে বাতাস লাগতে পারে। তবে খোঁপা করে বেশিক্ষণ রাখবেন না। বেশিক্ষণ খোঁপা করে রাখলে টাইট চুলের ফাঁক দিয়ে মাথার ত্বকে বাতাস পৌঁছতে পারবে না।

 কম প্রসাধনী কম মাখুন :মহিলাদের বেলাতে প্রসাধন কম করুন। প্রসাধনে শরীরের লোমকূপ আটকে যায় বলে বাতাস ঢুকতে অসুবিধা হয়। তা ছাড়া শরীরের ঘামও বাতাসের সংস্পর্শে বেরিয়ে আসতে পারে না। কোনো কোনো প্রসাধনীতে তৈলাক্ত উপাদান থাকে বলে সেটা কারো ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দেয়।  একমাত্র সানস্ক্রিন ক্রিম ছাড়া আর কিছু না মাখাই শ্রেয়। তবে সানস্ক্রিন ক্রিম শুধু মুখে নয়, শরীরের উন্মুক্ত স্থানগুলোতেও মাখতে হবে। কড়া পারফিউম ব্যবহার করা যাবে না। হালকা করে পাউডারের প্রলেপ দিতে পারেন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা।

ছবিঃ গুগল