এই বিশবিষের বছরটা!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

জন্মেছিলাম উনিশ শতকে।যখন দুই হাজার সাল এলো তখন খুবই গর্ব হয়েছে এই ভেবে যে আমি দুইটা শতকই অবলোকন করতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো ভাবেই দুইহাজার সালে পা দিলাম। শুধু শুনছিলাম ২০০০ সাল যখন আসবে মানে ঠিক যখন বারোটা বাজবে তারপর সারা পৃথিবীর কম্পিউটার গুলো বন্ধ হতে পারে,হতে পারে যেখানে যেখানে ঘড়ি বসানো আছে সেইসব যন্ত্র।যদিও আমার তাতে কিছু অসুবিধা হওয়ার কথা না।কারণ তখন আমার কম্পিউটার দূরের কথা সামান্য মোবাইল ও নাই। যাইহোক, সেই দুইহাজার সাল খুবই আনন্দ নিয়ে এলো। এরপর যমুনা নদীতে অনেক জল প্রবাহিত হয়েছে।

পথ চলতে চলতে দুই হাজার বিশ সাল এসে গেলো।ভালোই চলছিলো। প্রচন্ড ঠান্ডায় ফেসবুকের বন্ধুদের সহায়তায় ও নিজের অর্থায়নে গরম কাপড় নিয়ে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ কাপড় বিলিয়ে চলে গেলাম বগুড়ার নানা জায়গাসহ গাইবান্ধার দুটো উপজেলায়, নিজ হাতে সেগুলো বিতরণ করলাম , এরপর বাকি কাপড় চলে গেলো কুড়িগ্রাম। এভাবেই আমার বছর শুরু হলো। কুমিল্লা সিলেট চিটাগং নারায়ণগঞ্জ গাজীপুর শিমুলতলি ও ঢাকা সহ অনেক অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার জন্য অংশগ্রহণ করছিলাম।ভালোই যাচ্ছিলো নতুন বিশ সাল। কিন্তু ভবিতব্য বলে কথা, আমরা ভাবলেই কি আর হয়?

আসমানের ফায়সালাই জমিনে ঘটে! সারা পৃথিবীর অনাচার অবিচার দেখতে দেখতে স্রষ্টা রাগান্বিত হয়ে গেলেন নাকি অতিরিক্ত জনগণের ভার কমাতে তিনি একটি কৌশল পাঠালেন তা একমাত্র তিনিই জানেন। মার্চ মাসে পুরো মার্চ এপ্রিল মে জুন এর শিডিউল তৈরি হলো। পাঁচটি স্কুলের একশো বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠান, ফ্লোরিডায় একটি ট্যালেন্ট হান্টের বিচারক হিসেবে নির্বাচিত হলাম, আমাদের আমেরিকার বিশিষ্ট আয়োজক আলমগীর খান আলম ভাই জানালেন আমেরিকা বিভিন্ন অংগরাজ্যে পাঁচটি অনুষ্ঠান, লন্ডনে দুইটি অনুষ্ঠান সব দিন তারিখ ঠিক হলো। লন্ডনের ভিসা নিতে হবে সেজন্য পাসপোর্ট রেডি করেছি। এরমধ্যে টিভিতে শুনি কোভিড কোভিড করোনা করোনা।ভাবলাম ওসব চায়নায় আছে,আমাদের কিচ্ছু হবেনা ইনশাআল্লাহ। আমি এভাবেই ভাবি।কখনো দুশ্চিন্তা আমাকে আচ্ছন্ন করেনা। কিন্তু এবার তা হলো না।হয়েই গেলো। বাংলাদেশ ও আক্রান্ত হলো, ঢাকা শহর সবচেয়ে বেশি। কিভাবে যে একে হ্যান্ডেল করা যায় কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিনা। বাসায় মেহমান আসা বন্ধ হয়ে গেলো। হাতে থাকা অনুষ্ঠান গুলো আপনা আপনিই বাদ হয়ে গেলো। বিদেশ ট্যুর গুলোও,বলাই বাহুল্য। ড্রাইভার বাইরে থেকে আসে,তাকে বিদায় করা হলো। মেয়ের বাসায় যাই কিন্তু তাও কতো সাবধানতা! মায়ের বাসায়, বোনের বাসায় কোথাও যাওয়া বন্ধু।

বাইরে থেকে বাজার এলে তা ড্রইংরুমে পড়ে থাকে কয়েকদিন।কাঁচাবাজার এলে বড় বালতিতে সিরকা পানিতে চুবিয়ে রেখে নির্দিষ্ট সময় পরে নিজে হাতে ধুয়ে টেবিলে বিছিয়ে শুকিয়ে তারপর ফ্রিজে ঢুকাই।এগুলো করতে করতে বিষন্ন হয়ে যাই।তারপর ও সাবধান থাকি।এভাবেই যেতে থাকে মাসের পর মাস। ব্যাংক থেকে প্রতিমাসে টাকা তুলে সংসার চালাই এই প্রথম। ছত্রিশ বছরের পেশাদার জীবনে এমন বেকার কখনো হইনি। এভাবে থাকতে থাকতে একদিন উপলব্ধি করি করোনা শুধু বিপদে ফেলেনি, করোনা অনেক কিছু শিখিয়েছে আমাকে। আমি দেখেছি কতকিছু ছাড়াই আমি চলতে পারি।সাধের সাজানো গোছানো ড্রইংরুম, আমার এক ঝুড়ি টয়লেট্রিজ, আমার আলমিরা উপচানো শাড়ি ব্লাউজ, কস্টিউম জুয়েলারি ওয়ারড্রোব ভরা সালোয়ার কামিজ সব কিভাবে নয়মাস ধরে পড়ে থাকলো! আমি বুঝে গেলাম জীবনে বাঁচতে সামান্য কিছু খাদ্য সামান্য পরিধেয়ই যথেষ্ট, আমরা শুধু শুধুই এতো কিছু কিনতে থাকি! অক্টোবর মাস,সারাবছর বন্দী থাকার ক্লান্তি! মা আমার অনেক বাঁধা থাকা সত্বেও আমার বাসায় এসেছেন। এসে যে নিয়মিত অভ্যাস বুকে জড়িয়ে ধরা, তিনি কেমন দ্বিধান্বিত, দরোজায় ঢুকে তিনি জিজ্ঞেস করেন ” বুকে জড়ানো যাবে কি মা?” এমন প্রশ্নে আমি ভয়াবহ বিপন্ন বোধ করে মাকে অনেক জোরে বুকে জড়িয়ে নিয়ে অস্রুতে ভাসতে ভাসতে মাকে বলেছি আম্মা,এতে যদি মৃত্যু আসে আসুক,কিছু করার নাই। তবুও জীবন কেটেই যাচ্ছিলো।

শেষ মেষ আমি ভয়াবহ কষ্টে পড়ে গেলাম।আমার হাজব্যান্ড অসুস্থ বোধ করছিলেন। উনার কেমন মাথা ঘুরছিলো।শরীরে অস্বস্তি হচ্ছিলো। তাঁকে মেডিসিন, ইএনটি,কার্ডিওলজিস্ট, নিউরোলজিস্ট মোট সাত জন ডক্টর দেখালাম। কোন ঔষধই স্যুট করছিলো না।উনার দিল্লির পুরাতন ডক্টর কে ভিডিও কল এ দেখানো হলো। অনেক কষ্ট করে ইন্ডিয়ান ঔষধ আনা হলো কিন্তু কোন ঔষধই স্যুট করছেনা। ব্যাংকক সিঙ্গাপুর এর ফ্লাইট বন্ধ। এখানে এমআরই করার মেশিনে সব করোনা রুগী সিটিস্ক্যান করে। উনি এতোটাই ভয় পেলেন যে উনি চট করে আমেরিকার টিকিট কেটে বসলেন। আমেরিকা গেলাম।ভক্ত ও ছোট ভাই ইমাদ জুয়েল আমাদের জন্য বাসা নিলো।তার ছত্রছায়ায় আমাদের থাকা খাওয়া চিকিৎসা চললো। খুবই ভালো একজন ডক্টর ওনাকে দেখলেন, এমআরই করা হলো, সব কিছু ভালো মতই শেষ হলো কিন্তু বিধি বাম হলে যা হয়! উনার ভয়ংকর দাঁত ব্যথা শুরু হলো। দাঁতের ব্যথায় উনি সারারাত বসে থাকেন।বাধ্য হয়ে দুটো দাঁত ফেলে দিতে হলো। তারপর বাধ্যতামূলক করোনা টেস্ট। যেদিন রাতে ফ্লাইট সেদিন দুপুরে টেস্ট এর রিপোর্ট আনতে গিয়ে জানলাম উনি কোভিড পজিটিভ! মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো! শুরু হলো কোয়ারেন্টাইন! চৌদ্দ দিন!

আমি উনার সেবা করছি।সবাই খোঁজ খবর রাখছে।রান্না করে পাঠাচ্ছে কিন্তু আমাদের বন্দী দশা আর কাটেনা।দোয়াদরুদ নামাজ কোরান পথ্যাদি করে করে উনার পাশে আছি যদিও উনার কোনই সিম্পটম নাই।নাই মানে একদমই নাই।কিন্তু ভয় যে উনি ভালো হলে নাকি আমি পজিটিভ হই! ভয়াবহ উৎকণ্ঠা নিয়ে দিনগুলো মাস নয়, বছর হয়ে যাচ্ছিলো! দেশে কথা বলি কিন্তু কিছু ভালো লাগেনা। মনে হয় আর যদি ফেরা না হয়! ওনার সিম্পটম নাই কিন্তু আমার যদি পজিটিভ হলে সিম্পটম হয়,আমাকে তাহলে সেবা করবে কে, এইরকম নানা চিন্তায় আধাপাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। নয় দিনের মাথায় বললাম চলো কাল টেস্ট করাই আবার। উনি বললেন চলো।সত্যিই টেস্ট করালাম। তেরো দিনের মাথায় রিপোর্ট পেলাম দুইজনই নেগেটিভ। আনন্দে, মুক্তির আনন্দে নিউইয়র্কের রাস্তায় হাসপাতালের পাশে লোকজনের মাঝেই উনি কেঁদে কেঁদে ছেলেমেয়েকে ফোন দিলেন। ওখানে দাঁড়িয়েই ফেরার টিকিট কনফার্ম করা হলো। তারপর অপূর্ব মাহেন্দ্রক্ষণ এ ফ্লাইট এ চড়ে বসলাম। জেলে না গিয়েও জেলের স্বাদ পাওয়া গেছে এই বিশবিশ সালে!

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, সারা পৃথিবীর মানুষকে আর কষ্ট দিওনা আল্লাহ, জানি আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য সবচেয়ে বড় জালিম তবুও আল্লাহ মাফ না করলে এই ভয়াবহ পৃথিবীতে বাস করা কঠিন হয়ে যাবে। এ বছরে কত আপনজন, কবি সাহিত্যিক সহ বড় বড় প্রোফাইল এর মানুষকে আমরা হারালাম তার ইয়ত্তা নেই! কতো মানুষ কর্মহীন হয়েছে, কতো মানুষ পথে বসেছে! কতো স্বপ্ন একেবারেই মরে গেছে তার হিসাব কে দিতে পারবে! তবুও আশা রাখি এ বছর আমাদের পৃথিবী আগের মতই করোনা মুক্ত হয়ে উঠবে।আমরা আর কাউকে হারাবো না।পৃথিবী সব বিপদকে পাশ কাটিয়ে আগের চেয়ে আরও কর্মচঞ্চল হয়ে উঠবে।শিশুরা আবার স্কুলে যাবে।শিক্ষকরা আবার চক ব্ল্যাক বোর্ড এ পড়াবেন ২০২০ সালে যে মহামারি হয়েছিলো তা আমরা পেরিয়ে আসতে পেরেছি এটা আমাদের সারা পৃথিবীর মানুষের সম্মিলিত সফলতা তাইনা? শিক্ষার্থীরা সম্মিলিত ভাবে জবাব দেবে হ্যাঁ। এই বিশবিষ বছরে বসে ২০২১ সালের জন্য আমার এটাই চাওয়া। আল্লাহ আমাদের

পৃথিবীকে আগের মতো মাস্কমুক্ত করে দিন।আমীন।

ছবি:লেখকের ফেইসবুক থেকে


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box