এই ❤ চিহ্নে ভালোবাসা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হৃদয়-চিহ্ন, হার্ট সিম্বল। লাল রঙের পাত পাতা আকৃতির একটি ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠলেই আমরা ধরে নিই সেটা হৃদয়ের চিহ্ন। এই পৃাথবীতে লক্ষ-কোটিবার মানুষ এই চিহ্নটি এঁকেছে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে, মুদ্রিত করেছে অসংখ্য কার্ডে, ভালোবাসার বার্তায়। কিন্তু এই চিহ্ন কবে থেকে মানুষের ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠলো? মজার ব্যাপার হচ্ছে এই প্রশ্নের জানা নেই গবেষকদেরও।গবেষণার কথা উঠছে এজন্য যে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয় এই চিহ্নের আদ্যোপান্ত জানতে গবেষকরা এখন মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন, উল্টে যাচ্ছেন ইতিহাস বইয়ের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। কিন্তু সঠিক উত্তরের দেখা মেলে নি।কেউ বলছেন, প্রায় তিন হাজার বছর আগে মানুষের তৈরী মাটির পাত্রের গায়ে এ ধরণের চিহ্নের নিদর্শন দেখা যায়। আবার কেউ বলছেন, চতুর্থ শতকে গ্রীক ও রোমান সভ্যতায় পতিতালয়কে নির্দিষ্ট করতে ব্যবহার হতো এ ধরণের চিহ্ন। তবে কোন তথ্য বা গবেষণা থেকে হৃদয় চিহ্নের সঙ্গে হৃদয় অথবা ভালোবাসার সম্পর্ক কবে থেকে শুরু হলো এমন তথ্য নির্দিষ্ট ভাবে বের হয়ে আসে নি।এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনের বিষয়ও সেই বহুল আলোচিত হৃদয়-চিহ্ন ও তার পেছনের কথা।

এই হৃদয়-চিহ্ন যে সেই হাজার তিনেক বছর আগে মাটির পাত্রের গায়ে দেখা গিয়েছিলো সে কথা শুরুতেই বলেছি। আজকের পৃথিবীতে এই চিহ্নটিকে বলা হচ্ছে সবচাইতে জনপ্রিয় এবং ব্যবহৃত প্রতীক। অনেক গবেষক বলছেন, আমাদের পরিচিত ডুমুর গাছের পাতা অথবা আইভি লতার পাতার মতো দেখতে এই চিহ্নটি গোড়া থেকেই ভালোবাসা অথবা হৃদয়-চিহ্ন হয়ে ওঠেনি। রোমান সভ্যতার বিকাশের সময়ও চিহ্নটিকে বিভিন্ন জায়গায় নকশা হিসেবেই ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। তখনও এই চিহ্নের সঙ্গে লাল রঙটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় নি। গ্রীক সভ্যতায় এই চিহ্নটি ব্যবহৃত হতো সুরার দেবতা ডায়ানোসাসের প্রতীক হিসেবে। পাশাপাশি উর্বরতা আর আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবেও এই চিহ্নের ব্যবহার দেখা গেছে। পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ ধর্মে ডুমুর পাতার চিহ্ন ব্যবহার হতো জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে। লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হচ্ছে ডুমুর পাতা দেখতে অবিকল এই হৃদয়-চিহ্নের মতো। ১৫৪৫ সালের দিকে জাপানে একটি বিশেষ সামুরাই সম্প্রদায় তাদের তীরন্দাজদের শিরোস্ত্রাণে এঁকে নিতো এই চিহ্নটি। তারা মনে করতো তীরন্দাজদের দেবী মারিশহিতেনের চিহ্ন এটি।এরকম চিহ্ন শিরোস্ত্রাণে ধারণ করলে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের মঙ্গল হবে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার স্টুয়ার্ট এই চিহ্নের বিষযে গবেষণা করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন ভালোবাসা বিষয়টির সঙ্গে এই চিহ্নের প্রথম সম্পর্ক স্থাপিত হয় ত্রয়োদশ শতকে। ওই সময়ে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক ফরাসী লেখক একটি প্রেমের উপন্যাস রচনা করেছিলেন। তার সেই উপন্যাসের প্রচ্ছদে এক প্রেমিকের ছবি আঁকা হয়েছিল যার হাতে ধরা ছিল এখনকার এই হৃদয় চিহ্নের মতো দেখতে মানুষের হৃদয়। পিটার মনে করছেন, এই প্রথম হৃদয়-চিহ্ন ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করলো। ওই একই সময়ে তৎকালীন ডেনমার্কের রাজার নির্দেশে তাদের পতাকায় সংযোজিত হয় এই চিহ্নটি। কিন্তু এতেও কিন্তু সঠিক উত্তর পাওয়া গেলো না।কারণ অন্য গবেষকরা বলছেন, পনেরো শতকে এই লাল চিহ্নটি প্রথম দেখা যায় তাসের গায়ে। এসব তথ্যের তর্ক বিতর্কের বাইরে হার্ট সিম্বল কিন্তু জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে প্রথম স্থানটি দখল করে নিয়েছে। এখন বহু হাসপাতাল, ক্লিনিকে হৃদয়-চিহ্ন ডাক্তারী পরিচর্যা এবং হার্ট চিকিৎসার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হতে দেখা যাচ্ছে। প্রায় সমস্ত ভিডিও গেমে এই চিহ্ন ব্যবহার হয় স্বাস্থ্য-চিহ্ন হিসেবে।
কার্ড অথবা প্রেমময় বার্তায় এই চিহ্নের যথেচ্ছ ব্যবহারের কথা আর না বলাই ভালো। প্রতি বছর বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে এরকম চিহ্নযুক্ত কত কার্ড যে মুদ্রিত হয় তার ইয়ত্তা নেই। আরেকজন লেখক পিয়েরে ভিনকেন এই ভালোবাসার চিহ্নের ওপর বই লিখে জানিয়েছেন ত্রয়োদশ শতকে খিবাউট নামে এক কবি প্রথম কবিতা লিখে দেখাতে চাইলেন ভালোবেসে একজন মানুষ তার নিজের হৃদয়ও তার প্রিয়তম মানুষটির হাতে তুলে দিতে পারে।কবির বইয়ের প্রচ্ছদে ব্যবহৃত হয়েছিল হৃদয়-চিহ্নের মতো দেখতে একটি ছবি। আবার চতুর্দশ শতকে ইতালির কবি ফ্রান্সিসকো বারবেরিনো তার বইতে ছবি আঁকলেন পাশ্চাত্যে প্রেমের দেবতা কিউপিডের ছবি। সেখানে দেখা যাচ্ছিলো একটি ঘোড়ার পিঠে চেপে আকাশ থেকে কিউপিড তার প্রণয় বাণ নিক্ষেপ করছে তার গলায় ঝুলছে হৃদয় চিহ্নের মালা। গবেষকরা বলছেন সেই প্রথম এই চিহ্নটি সরাসরি ভালোবাসা বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হলো।তবে আধুনিক পৃথিবীতে হৃদয়-চিহ্নকে বেশী জনপ্রিয় করে তুলেছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এর প্রভাবে এখন চকলেট, কেক আর আইসক্রীমও তৈরী হচেছ এই বিশেষ চিহ্নের কথা মাথায় রেখে।কফির কাপেও ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছে এই বিশেষ প্রতীক।
মানুষের দেহে সারাক্ষণ ধুকপুক করে যাওয়া হৃদযন্ত্রটির সঙ্গে এই বিশেষ চিহ্নের যে কোন মিল নেই সেটা দেখলই বোঝা যায়। কিন্তু তারপরেও হৃদয়, ভালোবাসা, আবেগ বোঝাতে এই চিহ্নটিকেই ব্যবহার করছে মানুষ। প্রতি বছর এ ধরণের আকৃতির লকেট আর আংটি বিক্রি করে ব্যবসায়ীরা তুলে নিচ্ছে বিশাল অঙ্কের টাকা।

হাফিজ রহমান
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]