একজন অনীতার গল্প

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

দুই.

নীলার দরজায় তালা দেখে কিছুটা পথ হেঁটে এসে ব্যস্ত ছিলো রিক্সা ধরার জন্য। যখন অচেনা লোক গুলো তাকে ঘেরাও করে ধরে তখনও সে বুঝতে পারেনি কিছু একটা হতে যাচ্ছে। শেষে মনে হলো বড় একটা কিছু হতে যাচ্ছে। কালো ধরনের লোকটা বুকে পিস্তল ধরেছিলো। মুহূর্তের মাঝে আরেকটা লোক সুন্দর গন্ধযুক্ত রুমালের মতো একটা কাপড় তার মুখে গুঁজে দিয়েছিলো। অথচ আশপাশের লোকগুলো কিছু বলেনি। মানুষ প্রতিবাদ করেনি। যেন তারা কোনো নোংরা সিনেমার দৃশ্য দেখছে। সিনেমায় দেখানো হয় নায়িকারা কখনও ধর্ষিত হয় না। কেননা ছবিতে দেখা যায় নায়ক এসে নায়িকাকে উদ্ধার করে ফেলেছে। অথচ বাস্তব আর সিনেমা তো এক কথা নয়। সিনেমার নায়কের কথা মনে হতেই অনীতার মনো হলো, এমন তো হতে পারতো লোকগুলো যখন তাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিলো একজন পুরুষ তখন ওকে উদ্ধার করার জন্যে এগিয়ে আসছে। তারপর দুর্বৃত্তদের পরাজিত করে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। শহরের যুবকরা সিনেমার নায়কদের মতো সাহসী হয় না কেন? শহরের যুবকরা যদি সাহসী হতো তাহলে তাকে আর এমন অবস্থায় পড়তে হতো না।
সে কি পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে ডেকে বলবে, দেখ তোমাদের ভীরুতার জন্যে আমার কি অবস্থা। আমি আজ কোথাও ফিরতে পারছি না। সবাই যখন জানবে শিয়াল গুলো আমাকে ছুঁয়ে গেছে, তখন আর কেউ আমার দিকে তাকাবে না। সবাই আমাকে তাড়িয়ে দেবে। যেভাবে অসুস্থ বিড়ালকে তাড়ানো হয়ে থাকে খাবার টেবিল থেকে।
এলোমেলো ভাবনার মাঝে ছেদ পড়লো। অনীতা এখন সেই খোলা মাঠের মাঝে পড়ে আছে। দুর্বৃত্তরা শুধু তার শরীর নিয়ে খেলেছিলো। কিছুই নেয়নি। এইতো সামনে পড়ে আছে তার হাতব্যাগটা। হাতের ঘড়িটাও ঠিক আছে। এখনও সেটা কাজ করে যাচ্ছে। অনীতা এবার হাত ঘড়িটার দিকে তাকালো। রাত হয়েছে অনেক। বারটা বেজে গেছে।

এখন সে কোথায় যাবে? নিয়ম অনুযায়ী এখন তাকে যেতে হবে কোনো পুলিশ স্টেশনে কিংবা রেলস্টেশনে। সে ভাবতে পারছে না কোথায় যাবে। যদি থানায় যায়, সেখানে তাকে মামলা দিতে হবে। অথচ আসামী কাউকেই চেনে না। পুলিশের লোকগুলো তার সব কথা রসিয়ে রসিয়ে শুনতে চাইবে। তাকে জিজ্ঞেস করবে- বলুন তো কিভাবে কি হলো? দুর্বৃত্তদের মধ্যে কি আপনার পরিচিত লোক ছিলো?
হয়তো এও বলতে পারে- আপনার প্রেমিক কি আপনার সঙ্গে প্রতারণা করে এমন কাজ করেছে? নাম বলুন। এখনই ধরে নিয়ে আসি।
অনীতা জানে সে এসবের জবাব দিতে পারবে না। অযথা পুলিশের লোকগুলো তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। বলবে বলুনতো, বদমাশরা আপনার শরীরের কোথায় কোথায় হাত দিয়েছে।
রেল-ষ্টেশনে যদি যায়, সবার অলক্ষ্যে দ্রুতগামী ট্রেনের নিচে ঝাপিয়ে পড়ে- হয়তো সবকিছুর হিসাব শেষ করা যাবে। পরদিন সংবাদপত্রে খবর বেরুবে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে একজন তরুনীর মৃত্যু। কিংবা লিখা হবে ট্রেনের নিচে পড়ে এক ব্যর্থ প্রেমিকার আত্মহত্যা। অনেকেই উৎসুক হয়ে খবরটা পড়বে। যারা তাকে ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর দিকে তারাও খবরটা পড়ে দুঃখ প্রকাশ করবে।
বাড়ীর কথা মনে হতেই অনীতার মনে হলো মৃণাল সেনের একটি ছবির কথা। সেখানে দেখানো হয়েছিলো অফিস থেকে বাড়ী ফিরছে না একটি মেয়ে। বাড়ীর সবাই চিন্তিত। এক সময় মেয়েটা বাড়ী ফেরে। আবার সবার মন ভালো হয়ে ওঠে। পরদিন সকালে আবার মাটির চুলায় বাড়ী বউ ঝিরা রান্না বসায়। এটাই যেন চলমান সময়ের স্বাভাবিক নিয়ম।

অনীতা সবকিছু ভুলে বাড়ী ফিরে যেতে চাইলো। বাড়ীতে গিয়ে বলতে পারবে রিক্সা ধরতে দেরি হয়েছিলো। যখন রিক্সা ধরা হলো তখন যানজটে পড়ে যায়। তাই বাড়ী ফিরতে দেরি হয়েছে।। অনীতা জানে সবাই তার কথা বিশ্বাস করবে। সবাই জানে অনিতা খুব ভাল মেয়ে। সে কোনো অন্যায় করতে পারে না। হয়তো প্রথম প্রথম সবাই এমন ভাবে তাকাবে, যা দেখে মনে হবে, সবাই যেন বলছে-অনীতা তুমি কোথায় ছিলে? তোমার বাড়ী ফিরতে দেরি হলো কেন? সে এসব না হয় সামলে নেবে। বাড়ীর লোকজনের সব অনিশ্চয়তা দূর করে দেবে সুন্দর একটা গল্প বলে। এসব ভাবতে ভাবতে অনীতা যেন একটা স্বপ্নের মাঝে ডুবে গেলো। সে কিছু একটা দেখছে। কিন্তু স্পষ্ট করে দেখছে না। অনীতা স্বপ্নটাকে আরো গভীর ভাবে দেখতে চাইলো।
নীরব রাত্রির এই নিস্তব্ধতার মাঝে জোর গলায় তার নাম ধরে যেন কে ডাকছে। তার মনে হলো পুলিশ স্টেশনের কোনো বড় অফিসার তাকে যেন ডাকছে। বলছে-অনীতা এসো। আমাদের কাছে অভিযোগ করো। আমরা দুর্বৃত্তদের ধরে ফাঁসিতে ঝুলাবো। তোমার ভয় নেই। আইন তোমার পক্ষে। রাষ্ট্র তোমার পক্ষে। রাষ্ট্রের সরকার তোমার পক্ষে। কেউ তোমাকে বারবার অশ্লীল প্রশ্ন করবে না। তোমাকে কেউ অযথা প্রশ্ন করে বিরক্ত করবে না।
অনীতা ঘোরের মাঝেই সবকিছু যেন শুনতে পায়। কিছুটা অস্পষ্ট সুরে যেন শুনতে পায়। রাত্রির ট্রেনের কোনো বৃদ্ধ ড্রাইভার তাকে ডাকছে বড় কাতর স্বরে। যেন তাকে বলছে- তুই কোথায় যাবি মা। তোর বিপক্ষে সবাই চলে যাবে। কেউ তোকে এতোটুকু আশ্রয় দেবে না। দেখবি সবাই তোর বিপক্ষে চলে যাচ্ছে। দেখবি তোর আপন মানুষগুলো তোর থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে। কেউ তোর সঙ্গে কথা বলছে না। ট্রেনেই তোর আশ্রয়। এখনই ট্রেন ছেড়ে দেবে। স্বপ্নের মাঝে এসব শুনতে শুনতে অনীতা আরেকটা স্বপ্নের মাঝে ডুব দেয়। দেখে সুন্দর একটি শ্রাবণের সকাল। রাতের বৃষ্টিতে ভিজা গাছপালা গুলো রোদের স্পর্শে ঝিলিক দিয়ে উঠেছে। চারদিকে নরম সুন্দর ফুলের সুভাষ নিয়ে শ্রাবনী বাতাস বইছে। তার মধ্যে দেখে আশোক আসছে। কাছে এসে অশোক বলছে-অনীতা এসো, তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।
অনীতা আশোকের দিকে তাকিয়ে বলে- তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম! তবু তুমি কেন এলে?
-তোমার এ অবস্থায় আমাকেই তো আসতে হয়।
-তুমি তো আমাকে ঘৃণা করতে পারতে। এতো কিছু শুনে।
-একদিন যাকে ভালোবেসেছি, তাকে কিভাবে এমন দিনে ফেলে দিই। আমি তো মানুষ অনীতা!
-সবাই তোমার মতো হয় না কেন?
অনীতা এক সময় দেখে অশোক তাকে নিয়ে যাচ্ছে হাত ধরে। যেন সূর্যের দিকে হেঁটে যাচ্ছে অনীতাকে নিয়ে। সূর্যের প্রখর আলোর তাপে, সে তাকে আবার পবিত্র করে তুলবে।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments