একজন অভিনেতার মৃত্যু

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বেলমন্দো

তাঁর হওয়ার কথা ছিলো বক্সার। ঘুষোঘুষির খেলায় নাক ভেঙেছিলেন। ১৯৪৯ সালে অ্যামেচার বক্সিংয়ের রিংয়ে খেলতে নেমে ধরাশায়ী করেন তখনকার অন্যতম সেরা ফরাসী এক বক্সারকে।কিন্তু শেষ পর্যন্ত বক্সার আর হওয়া হয়নি তার। তিনি হয়ে উঠলেন একজন দারুণ অভিনেতা। তাঁর নাম জাঁ পল বেলমন্দো। পৃথিবীর সিনেমা দর্শকরা তাকে চিনে নিয়েছিলেন আর এক খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার জাঁ লুক গদারের আলোচিত ‘ব্রেথলেস’ ছবি থেকে। যাত্রার শুরুটা ওই ছবি থেকেই। একটু খ্যাপাটে, কখনো গাড়ি চোর আবার কখনো ক্ষুধার জ্বালায় বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকা সরানোতে ওস্তাদ সেই মিশেল চরিত্রটা মিশে গিয়েছিলো বেলমন্দোর সঙ্গে। সিনেমার পর্দায় তিনি যখন উচ্চারণ করেন,‘আফটার অল আই অ্যাম স্টুপিড। আফটার অল, ইয়েস, আই মাস্ট।’ তখন ষাটের দশকে পৃথিবী জুড়ে নিউ ওয়েভ সিনেমা আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে যায় তাঁর নাম-ও।

গদার জীবনের ভেতর থেকে এই চরিত্রটিকে তুলে আনতে চেয়েছিলেন পর্দায়। আর বেলমন্দো ছাড়া অন্য কেউ এই চরিত্রে অভিনয় করতে পারতেন কি না সন্দেহ। নিউ ওয়েভ সিনেমার নতুন অধ্যায়ে তিনিই যেন হয়ে উঠেছিলেন পোস্টার-বয়।

‘ব্রেথলেস’-এর আগে পরে একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও, তিনি পরিচিত হয়ে গেছেন মিশেল হিসাবেই। সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের উপর এবার পর্দা নামলো। গত ৭ সেপ্টেম্বর ৮৮ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানালেন জাঁ পল বেলমন্দো। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত অসুখে ভোগার পর প্যারিসে নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন পর্দার মিশেল।

১৯৩৩ সাল। ফ্রান্সের নিউলি-সুর-সিনে শহরতলিতে জন্ম বেলমন্দোর। বাবা ছিলেন ফরাসি উপনিবেশ আলজিরিয়ার বাসিন্দা। পেশায় একজন ভাস্কর। কাজের সূত্রেই ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডে চলে আসেন তিনি। বেলমন্দো্ও শৈশবে বেড়ে ওঠেন অনেকটাই পরিচর্যাহীন ভাবেই। কাজের সূত্রে বাবা অধিকাংশ সময়ই দূরে থাকতেন। তাঁর বোহেমিয়ান জীবনের শুরু সেখান থেকেই। পড়াশোনা খুব একটা ভালো লাগেনি তাঁর। খেলাধূলার প্রতি ছিলো অমোঘ আকর্ষণ। আর সেজন্যই হয়তো ঢুকে পড়েছিলেন মুষ্টিযুদ্ধের ‍রিংয়ে। বকসিংয়ে নাক ভেঙে এসে আয়নায় নিজের চেহারা দেখে চমকে উঠে ঠিক করেছিলেন আর এ পথে হাঁটবেন না। কিন্তু যুদ্ধ তার জীবনের পিছু ছাড়েনি। তখনকার সময়ের বাধ্যবাধকতা মেনেই তাকে যোগ দিতে হয় সেনাবাহিনীতে। লড়াই করতে চলে যান সেই সময়ে উত্তাল আলজেরিয়ায়।

ফ্রান্সে ফিরে এসে কয়েক বছর পর অভিনয় জগতে প্রবেশ করেন। নাটক দেখার নেশা থেকেই তিনি ভর্তি  হয়েছিলেন একটি বেসরকারি ফরাসি ড্রামা স্কুলে। ১৯৫৩ সালে সেই স্কুলের সূত্র ধরেই প্রথম মঞ্চ অভিনয়। তারপর প্যারিস ট্যুর। সিনেমায় অভিনয় শুরু তারও বছর তিনেক পর। ‘মলিএর’ নামে একটি ছোট ছবিতে প্রথম দেখা যায় তাঁকে। তারপর ১৯৫৮ সালে মার্সেল অ্যালবার্ট কার্নির জোড়া ছবি ‘ইয়ং সিনার্স’ এবং ‘বি বিউটিফুল বাট শাট আপ’-এ।

তবে চলচ্চিত্রে তাঁর নবজন্ম হয়েছিলো গদারের হাত ধরেই। তাঁর ভেতরের সত্তাটাকেই যেন পর্দায় তুলে এনেছিলেন গদার। আর ক্যামেরার সামনে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন বেলমন্দো। আর তাতেই তৈরি হলো এক নতুন ইতিহাস। তারপর ‘লেটার বাই আ নভিস’, ‘সেভেন ডেজ, সেভেন নাইটস’, ‘লাভমেকারস’ ‘প্রিস্ট’… তালিকাটা দীর্ঘ। ভাঙা নাকের সেই ছেলেটাই কখন যে আইকন হয়ে উঠেছিলো ষাটের দশকে, তা প্রথমদিকে দর্শকরাও বুঝে উঠতে পারেনি।

তবে এই অভিনয় জীবনের খানিকটা পথ বদল ঘটে ১৯৮৭ সালে। বড়ো পর্দা ছেড়ে আবার মঞ্চকে বেছে নেন জঁ-পল। একাধিক উল্লেখযোগ্য নাটকের মঞ্চায়ন এবং প্রযোজনাও করেছেন তিনি অভিনয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে। প্রথম ফরাসি কল্পবিজ্ঞান-কমেডি নাটক ‘পুয়েত্রে’ যার মধ্যে অন্যতম।

বলা যায়, ফরাসি ও বিশ্ব চলচ্চিত্র নতুন মোড় নিয়েছিলো তাঁকে কেন্দ্র করেই। ব্রেথলেসের পরে মিশেলকে অনুকরণ করেই জন্ম নিয়েছিল হাজারো ভঙ্গুর, বিষণ্ণ চরিত্র।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ প্রহর, দ্য গার্ডিয়ান

ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box