একজন আজমত আলী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ মামুনুর রশীদ

আজমত আলী এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই এই লোকটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বেতন যা পান তা দিয়েই পাঁচ জনের সংসার সামাল দেন তিনি। ভেতরে নরম স্বভাবের, অথচ বাইরে তার শক্ত খোলস। লোকে কথা বলে প্রথম দফায় ধরেই নেবে আজমত আলী মানুষটা খুব একটা সুবিধার না। রাগি কিংবা বদ রাগি- যাই বলেন না কেনো আজমত আলী বাইরে থেকে ঠিক এমনই। দরাজ গলায় গান করেন। প্রাণ খুলে আড্ডা দেন। গল্পও করেন বেশ জমিয়ে। এটাই আজমত আলীর বৈশিষ্ট্য। একা চলা তার ধাতে নেই। একা জীবনে অভ্যস্তও নয়। বেশিরভাগ সময় পায়ে হেঁটে চলেন। দুরের পথ হলে বাধ্য হয়ে বাসে চড়েন। রিক্সায় ওঠেন না খুব একটা বাড়তি খরচের ভয়ে। বাজারে গেলে বড় বড় মাছগুলো খুব যত্ন নিয়ে দেখেন। দামাদামি করেন। কেনার ইচ্ছাও হয় আজমত আলীর। কিন্তু পকেটের দুরাবস্থার কথা ভেবে অবশেষে কম দামের মাছ কিনে ঘরে ফেরেন। এই যে অভাব-অনটন, এই যে সীমাবদ্ধতা- এ নিয়ে আজমত আলীর মনের ভেতরে কোনও কষ্ট নেই। হা হুতাশ নেই। দু:খবোধ নেই। আর থাকলেও তা কারো পক্ষে বোঝা সম্ভবও নয়। মৃদু হাসি দিয়ে আজমত আলী বুঝিয়ে দেন- বাজারে নানান রকম পণ্য থাকবে। সব কিছু সবার জন্য না। অথচ এই আজমত আলীই আবার মানুষের বিপদের সময় সবার আগে এগিয়ে আসেন। সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ান। সামর্থ্য যে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বেলায় বড় বাধা না- আজমত আলী তার সতীর্থদের বহুভাবে প্রমান দিয়েছেন। সেই আজমত আলীই রাতের বেলা বদলে যান। একেবারেই বদলে যান। দিনের আলোতে অনেক মানুষের ভীড়ে, অনেক মানুষের সঙ্গে গল্পে আড্ডায় যে মানুষটি প্রানবন্ত থাকেন। সবাইকে মাতিয়ে রাখেন। রাত গভীর হতেই সেই মানুষটি পুরোপুরি অন্যরকম বনে যান। চরম হতাশায় ডুবে থাকেন। একা বিছানায় এপাশ ওপাশ করে যখন ঘুমিয়ে পড়েন আজমত আলী- তখনই যেনো তার মুক্তি। এর আগে জীবনের সঙ্গে এক ভয়াবহ লড়াই চলে তার।

আজমত আলীর এই বদলে যাওয়ার পেছনেও একটি গল্প আছে। বাবা মায়ের অমতে, নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিলেন আজমত আলী। কম বেতনের চকরি। এ দিয়েই অভাবের সংসার শুরু। বছর ঘুরতেই সন্তান। অভাব বাড়তে থাকলো পালা করে আরও। সেই সঙ্গে সঙ্কটও তীব্র হতে শুরু করলো আজমত আলীর জীবনে। সুখের সংসার বদলে গেলো অশান্তির সংসারে। বাধ্য হয়ে একসময় পরাজয় মেনে নিলেন আজমত আলী। নিরবে নিভৃতে গুটিয়ে নিলেন। নিজের সবরকম আশা আকাঙ্খা বিসর্জন দিয়ে আজমত আলী এক ছাদের নীচে বেছে নিলেন আলাদা জীবন। আলাদা মানে একেবারেই আলাদা হয়ে গেলেন আজমত আলী। দেঢ় যুগের সংসার জীবনে আজমত আলী প্রায় এক যুগই একা বিছানায় কাটিয়ে দিচ্ছেন। দু’টো বালিশ আর একটি কোল বালিশ তার সঙ্গী। মাঝ রাতে গলা শুকিয়ে গেলে এক গ্লাস পানি খেয়ে আজমত আলী নিজেকে বোঝান- সবার জীবনে সবকিছু থাকতে নেই। নিজেকে বোঝাতে গিয়ে আজমত আলী বালিশ ভেজান চোখের পানিতে। দীর্ঘ নি:স্বাস ছাড়েন। দিন শুরু হলে আবার কাজে বের হন। সংসারের হাল ধরতে পায়ে হাটা জীবন শুরু হয় আজমত আলীর। সেই পুরণো ছকে আবার দিন শেষে রাতে, স‌ঙ্গে কিছু হা‌তে নি‌য়ে ঘরে ফেরা। গরীব কৃষকের ঘরে জন্ম নেয়া মাঝারী মেধার আজমত আলীর বড় কোনও স্বপ্ন কখনোই ছিলোনা। দেখেওনি তি‌নি কখনও বড় হবার স্বপ্ন। দেখার চেষ্টাও করেননি। কোনও রকমন দু‌’বেলা খে‌য়ে একটি সুখের জীবন স্বপ্ন ছিলো তার। হাসি-আনন্দ-আড্ডা- এই তিনের সমন্বয়ে একটি ছোট্ট, কিন্তু আনন্দের জীবন চেয়েছিলেন আজমত আলী। হয়ে উঠলোনা। ভুল কার- এই হিসাবও আর মেলাতে চাননা এখন তি‌নি। আজমত আলী জানেন- ভুল যারই হোক, সময় চলে গেছে শোধরাবার। খামাখা তাই নতুন ক‌রে অঙ্ক কষে লাভ নেই।
শুরুতেই বলেছিলাম, এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ আজমত আলী। দিনের আলোতে সবরকম দু:খ, কষ্ট চেপে রেখে অবলিলায় প্রাণ খুলে হাসতে পারেন এই মানুষটা। রাত গভীর হতেই খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি। নি‌জে‌কে নি‌জে আর ধ‌রে রাখ‌তে পা‌রেন না। নেশায় বুদ হ‌য়ে থা‌কেন। আর তখনই ধ্বংসের ভয়ানক নেশা চেপে বসে তার মাথায়। অন্য কাউকে না, আজমত আলী প্রতিনিয়ত ধ্বংস করতে চান নিজেকে। একজন পরাজিত মানুষ, একজন ব্যর্থ মানুষ, একজন সর্বহারা মানুষ, ঘ‌রে-বাই‌রে একজন উপ‌ে‌ক্ষিত মানুষ- যেমন নিজেকে রোজ শেষ করেন রাতের গভীরে। আজমত আলীরাও তাই। দিনের আজমত আলী আর রাতের আজমত আলীর মধ্যে কোনও মিল নেই। একদম মিল নেই। বিস্তর পার্থক্য দুই‌য়ে। এই পার্থক্য কেবল চাওয়া-পাওয়ায়, প্রা‌প্তি-অপ্রা‌প্তি আর আনন্দ বেদনার মাঝে। এই পার্থক্য কেবল জীবন ও মৃত্যুর।।

ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]