একজন চম্পা চাকমা ও তার স্বপ্ন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তন্দ্রা চাকমা
উন্নয়ন ও মানবাধিকার কর্মী

বিশ্ব অলিম্পিকের আসর যখন টোকিওতে বসেছিলো তখন বাংলাদেশ টিমে চম্পা চাকমাদের শূন্যতা আমাকে পীড়া দিচ্ছিলো। একজন চম্পা চাকমা যে মেরীকমের মত বিশ্ব মাতাতে পারে সেটা বোধ হয় নীতি নির্ধারকদের মাথায় ছিলো না। ভারতের মীরাবাঈ চানু যখন রৌপ্য জয় করেছিলো তখন গর্বে আমার বুক ভরে উঠেছিলো। হোক না ভারতীয় তবুওতো দক্ষিণ এশিয়া। মনে মনে ভাবছিলাম একাংশ আমাদের ফুটবল আর ক্রিকেট কাপানো জাতীয় নারী দলের চম্পা চাকমা এখন কোথাও? যেই ভাবা সেই কাজ তাকে খোঁজা শুরু করলাম। পরে আমার প্রবাসী ভাতিজি ত্রিমিতা চাকমার মাধ্যমে তার খোঁজ পেলাম এবং তার স্বপ্নগুলো কি তা জানার চেষ্টা করলাম।আমার এ লেখায় তার অতীত বর্তমান ভবিষ্যত আর তার স্বপ্নগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। যা অনেককে অনুপ্রাণিত করবে।

১৯৯৩ সালের ১৪ই  মার্চ চম্পা চাকমার জন্ম রাঙামাটির সাপছড়ির উপকন্ঠে। মায়ের নাম নিরজা চাকমা। আর পিতার নাম চিত্রমণি চাকমা, যিনি বর্তমানে মৃত। চম্পা চাকমারা ৫ ভাইবোন। চম্পা ভাই বোনদের মধ্যে তৃতীয়। বাবা মারা যাওয়ার পর মা সংসারের হাল ধরেন। সন্তানদের লেখাপড়া শেখান। চম্পার বড় দুইভাই যখন একটু বড় হলো তারা সংসারের হাল কিছুটা ধরলো। বড় দুই ভাই টুকটাক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ছোট দুই ভাই এর একজন অনার্স শেষ করেছে। সবচেয়ে ছোট ভাই ইন্টারমিডিয়েট পড়ছে।

চম্পার স্কুল জীবন শুরু হয় সাপছড়ি প্রাইমারী স্কুলে। পরে একই স্কুল থেকে ২০০৮ এ মেট্রিক শেষ করে রাঙামাটি সরকারী মহিলা কলেজে ইন্টামিডিয়েট শেষ হয় । এরপর চম্পা উত্তরা ইউনিভার্সিটি থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্স ও মাষ্টার্স করে। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিলেন  ক্রিকেটার রকিবুল হাসান। উল্লেখ্য যে রকিবুল হাসান ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের তদানীন্তন ক্যাপ্টেন।

আমি আমার লেখার শুরুতেই মীরাবাঈ চানুর কথা বলেছিলাম। মীরাবাঈ চানুর পথচলা যেমন সুখকর ছিলোনা তেমনি চম্পার খেলোয়াড় হওয়াও এ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা সম্পন্ন সমাজে এত সুখকর ছিলো না। একজন আদিবাসী তার উপর নারী হিসাবে তার পথচলা  ছিলো বন্ধুর। আর এ পর্যায়ে উঠে  আসতে অনেক কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়েছিলো। খেলার ব্যাপারে মা প্রথমদিকে সমর্থন করেননি কেবলমাত্র জেলা পর্যায়ে কিছু সাফল্য আসার পর মা অবশেষে খেলতে অনুমতি দেন।

পত্রিকার পাতায় যখন মীরাবাঈ এর কথা পড়ছিলাম তখন একেবারে মিডিয়া থেকে হারিয়ে যাওয়া চম্পার কথা মনে এসেছে। মীরাবাঈ আর চম্পার জীবন অনেক কাছাকাছি। চম্পা প্রথম জীবন ফুটবল দিয়ে শুরু।২০০৭ সালে হাটুতে চোট পাওয়ার কারণে ফুটবল খেলা আর হয়ে উঠেনি। চোট পাওয়ার আগে চম্পা জুনিয়র লেভেলে জেলা টিমে খেলতো। জেলা পর্যায়ে খেলতে গিয়ে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ফুটবল টিমের খেলোয়াড় বরুণ চাকমার নজরে আসে চম্পা। বরুণ চাকমার সহযোগিতায় চম্পা জাতীয় পর্যায়ে খেলে। এভাবে সে জাতীয় ফুটবল ক্যাম্পে ডাক পায় এরপর জাতীয় দলে খেলে। তার এ পর্যায়ে আসার পেছনে যাদের আবদান উল্লেখ না করলেই নয় তারা হলেন শ্রদ্ধেয় নিরুপা দেওয়ান, প্রাক্তন সদস্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং বীনা চাকমা সদস্য গার্লস গাইড এসোসিয়েশন। চম্পা যখন হাটুতে আঘাত পেয়ে ফুটবল মাঠ থেকে  ছিটকে পড়ে তখন  নিরুপা দেওয়ান দিদি ও বীণা দিদি প্রেরণায় ক্রিকেট খেলার কথা ভাবতে থাকে।  ছোটবেলা থেকেই চম্পা পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ফুটবলের ও ক্রিকেট খেলতো। বোলিং এ ঝোক ছিলো তার প্রবল। তাই একা একা বোলিং প্র্যাকটিস করতো, যাতে তার বোলিং অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়। কিছুদিন পর  জেলা ক্রিকেট টিমে নাম লেখায়।

এরপর তার খেলা দেখে জাতীয় দলের ক্রিকেট ক্যাম্পের ডাক পায় চম্পা। সেখানে একসপ্তাহ ধরে তার খেলার নৈপূন্য দেখে জাতীয় কোচ জাফরুল এহসান তাকে স্পীন বল করার পরামর্শ দেন। এই ক্যাম্পে তার এক্সট্রা অর্ডিনারী পারফের্মন্স দেখে জাতীয় নারী ক্রিকেট দল থেকে ডাক আসে। চম্পা জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের ১৪ জনের একজনে হয়ে যায়।তারপর জাতীয় টিমে ২০০৭ থেকে ২০১২ পর্যন্ত মাঠ দাপিয়ে বেড়ায়। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ AFC Cup চ্যাম্পিয়ান হয়। সেখানে চম্পা তার নৈপুণ্য দেখায়। ২০০৮ সালে সে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকা কে নিয়ে অনুষ্ঠিত ট্রায়াংগুলার ম্যাচে খেলে। এখানেও তার নৈপুণ্য ছিলো চোখে পরার মত। এ ম্যাচের খেলা হয়েছিলো ঢাকাতে। ২০১৩ সালে একবছর টানা বিরতি নেয় প্রাকটিস করার জন্য। সে বছর আবার আফ্রিকার টিমের সঙ্গে খেলার ডাক আসে। কিন্তু  খেলার পরিবর্তে তাকে সাইডলাইনেই বসে থাকতে হয়েছিলো এক্সট্রা প্লেয়ার হিসাবে। পরে যখন আবার ফিরে ODI টিম হয় চম্পা তখন ভেবেছিলো এবার বোধ হয় সুযোগ পাবে, কিন্ত বিধি বাম দলের কিছু খেলোয়াড়ের নেপোটিজমের কারণে সেবারও ডাক পায়নি। এরপর টি ২০ ম্যাচ থেকেও বাদ দেয়া হয়। এতে হতাশ হয়ে পরে চম্পা।সে লক্ষ্য করে সবসময় কেবল খুলনা এলাকার মেয়েরাই সুযোগ পেতো কিন্তু  যোগ্যতা থাকা স্বত্বেও তার মূল্যায়ন হয়নি।

এরপর খেলার মাঠ দাপানো বাদ দিয়ে চম্পা পড়াশোনায় মন দেয়। ইতিমধ্যে মোহাম্মদপূরে অবস্থিত ফিজিক্যাল এডুকেশন কলেজে লিপি নামের এক আপার পরামর্শে  ব্যাচেলার অফ ফিজিক্যাল এডুকেশনের উপর ডিগ্রি নেয়। তারপর দিল্লী পাবলিক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে স্পোর্টস টিচার হিসাবে যোগ দেয়। বর্তমানে  ওখানেই কর্মরত আছে।

চম্পার সঙ্গে আলাপচারিতায় উপরের বিষয়গুলি জানা যায়।আরও জানতে চেয়েছিলাম চম্পা ভবিষ্যতে কি করতে চায়।সে জানায় ভবিষ্যতে ক্রিকেট কোচিং ও আম্পয়ারিং করতে চায়। প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েদের দক্ষ ক্রিকেটার হিসাবে গড়ে তুলতে চায়। এছাড়া সুযোগ পেলে ইন্টারন্যাশনাল লেভেল এ স্পোর্টস নিয়ে কোর্স করতে চায় এ ব্যাপারে চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে চম্পা।সে মনে করে এ সুযোগ পেলে বাংলাদেশে অনেক দক্ষ আদিবাসী নারী খেলোয়াড় তৈরী করায় আত্ম নিবেদন করতে পারবে সে। আর তারা মীরাবাঈ চানুর মত বাংলাদেশকে অনেক দূর নিতে পারবে। জয় হোক চম্পার স্বপ্নযাত্রা।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box