একজন তাজিন আহমেদ

কাকলী আহমেদ

তাজিন আহমেদের লেখা পড়ি প্রথম আলো-তে একটি পাতায়। অল্প কলেবরে কি বিষয়ক লেখা ছিল মনে করতে পারছি না। সাল ১৯৯৯। অন্ত:স্বত্বা হবার কারণে কিছু জটিলতায় ভুগে ছুটিতে বাসায় থাকবার ফলে প্রতিদিন দুইটি দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলো ও Daily Star আদ্যোপান্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তাম। নিজের আগ্রহের খবর ছাড়াও অনেক চৌকশ খবর তখন নজর কাড়তো বৈ কি।

তাজিনের লেখাটি পড়ে আগ্রহভরে লেখকের সম্পর্কে জানার আগ্রহ জন্মালো। লেখার নীচে উঁকি মারতেই দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে( ভুল করে থাকলে যে কেউ ভুল শুধরে দিতে পারেন) পড়ুয়া একটি মেয়ে। খুব চোখা তার লেখা। টান টান একটা ভাব আছে শব্দ বুননে । বিষয় বৈচিত্রেও তার লেখা অনন্য। এমনি করেই ১৯৯৯ সালে তাজিন আহমেদ -এর লেখার সঙ্গে প্রথম পরিচয়।

দুই একদিন যেতেই দেখলাম সকাল সাড়ে আটটার একটি অনুষ্ঠানে খুব বর্ণিল হলুদ আর লালে শাড়ি পরিহিতা একটি মেয়ে ম্যাগী নুডুলসের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছে।খুব সুন্দর চেহারার মেয়েটির আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব আমাকে মোহিত করে । শুদ্ধ উচ্চারণ, সাবলীল উপস্থাপনা, উপস্থিত কথা বলার ক্ষমতা সর্বোপরি তাঁর বাচনভঙ্গি খুব অল্প দেখায় আকৃষ্ট করে তোলে। পরেরদিন একই সময় টিভি খুলে বসে থাকি। চার পাঁচটি অনুষ্ঠান দেখার পরেই আমি তার একনিষ্ঠ ফ্যান হয়ে উঠি।কি অভিনয়,কি উপস্থাপনা সব ক্ষেত্রেই মেয়েটাকে আমার ভীষণ চৌকিশ ও মেধাবী মনে হয়। মনে হয় অনেক রাস্তা একাই সে পাড়ি দিতে পারবে। এমন বুদ্ধিমত্তা তার আছে।সেই মেয়েটিই তাজিন।

নাটকে তাঁর অভিনয়শৈলীও আমাকে মুগ্ধ করে। পারিবারিক বলয় সম্পর্কে অতটা জানা ছিলো না আমার তবে এটুকু জানি অভিনেত্রী দিলারা জামান তাঁর আপন ফুপু।

কোন একটি অনুষ্ঠানে বিটিভি-র নাটকের প্রযোজক আতিকুল হক চৌধুরী -র একটি ইন্টারভিউ নিয়েছিলো তাজিন। প্রশ্নমালা এত গোছানো ছিল। এত সুন্দর শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রশ্নাবলী সে উপস্থাপন করছিলো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপস্থাপক বা উপস্থাপিকা এই মাত্রা জ্ঞান টেনে রাখতে হন অক্ষম। মন কেড়েছিল আমার। আতিকুল হক চৌধুরী ব্যক্তিটিও আমার বিশেষ পছন্দের। তিনি নিজেও ভূয়সী প্রশংসা করলেন তাজিনের স্পষ্ট ও শুদ্ধ উচ্চারণের। সাবলীল উপস্থাপনার কথাটিও বললেন।

উপস্থাপনার জগতে তেমন ভাল কোন মহিলা উপস্থাপক টেলিজগতে আমরা পাইনি। জ্ঞান গম্মি বিবেচনায় অনেকেই খুব ভাসা ভাসা অবস্থানে থাকেন। বিশেষ করে মহিলা উপস্থাপক সানজিদা খান ও  আবেদ খানে এর পরে কাউকে তেমনভাবে চোখে পড়ে না। সুবর্না মুস্তাফা হয়তো এ জায়গাটি নিতে পারতেন কিন্তু অভিনয় জগতে বেশি সময় দেবার কারণে তাও হয়ে ওঠেনি।

কেয়া চৌধুরী, প্রজ্ঞা লাবনী,নিমা আনাম যথেষ্ট সাবলীলতা ও জ্ঞানের পরিচয় দেখিয়েছেন বটে। কিন্তু উপস্থিতি নানা কারণে ছিল খুব কম। শারমীন লাকি -র উপস্থাপনায় অনেকেই চমক দেখেছেন বটে কিন্তু বরাবর আমার কাছে ঠেকেছে একঘেয়ে । অপি করিম ও মুনমুন চেহারা সর্বস্ব।
তাজিনের ব্যক্তিত্ব, পারঙ্গমতা, উচ্চারণ, সৌন্দর্য, মেধা সর্বোপরি সাংবাদিকতা পেশা হবার কারণে খবর পড়া, উপস্থাপনায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতো সে।
শহুরে , গ্রাম্য চরিত্রে চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাবার মত এক অপার শৈলী ছিল এই অভিনেত্রীর।

রুচিশীল পোশাকে একটি সুন্দর হাসি উপহার দিয়ে খুব সহজেই দর্শকের হৃদয়ে স্থান করে নিতো অকপটে।
১৯৯৯ সালের ২৩ শে জুলাই নাট্য জগতের এক নায়ক ও নায়িকার বিয়েতে আমিও ছিলাম আমন্ত্রিত।
অনুষ্ঠান শেষে গাড়ির জন্যে তাজিন ছিল অপেক্ষমাণ। আড়চোখে তাজিন-কে দেখে নিলাম প্রাণ ভরে। চোখে মুখে প্রতিভার দীপ্তি। পাশ থেকে হেঁটে যাচ্ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ও লেখক লুৎফর রহমান সরকার। খুব শ্রদ্ধাভরে দেখলাম তাজিন সালাম দিলো।
এক দুই মিনিট পরেই নিজের গাড়ির কাছে এগিয়ে গেলো।

আজ যে গাড়িতে চড়েছে তাজিন সে এক অন্তহীন যাত্রা। বিধাতার ইচ্ছায় খুব তাড়াতাড়িই মনে হয় এ যাত্রা হলো শুরু। ফেসবুকের পাতা খুলে গতকাল সকালে জেনেছি খবরটি। এমন অকাল প্রয়াণ অনেকেরই হয়। শিল্প সাহিত্যের জগতের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় এই নক্ষত্রটি খুব তাড়াতাড়িই যেন খসে পড়ল। আমার বাড়ির খুব কাছেই লেক ড্রাইভ রোডেই রাখা ছিল তাঁর শবদেহ।

ভাল থাকুন তাজিন আহমেদ। আপনার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাক।আপনি শান্তিতে ঘুমান।

ছবি: তাজিন আহমেদের ফেইসবুক থেকে