একজন পুরুষের গল্প …

আরিয়ান বিন জায়ান

আজান দিলে কিন্তু মেয়েদেরই মাথায় কাপড় দিতে হয়, ছেলেদের শার্টের খোলা বোতামটা লাগাতে হয় না, টি- শার্টের দাঁড়া করানো কলারটা নামাতে হয় না। ফুল ভলিউমে আজানের সময়ও গান চললে সেটা বন্ধ করে দিতে আসে মা কিংবা বোন নামের কোন এক নারী। ধর্ম মানা, ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা অনেক গুন এগিয়ে।

পৃথিবীর যাবতীয় শুদ্ধতা নারীতে। যাবতীয় অশুদ্ধতা পুরুষে(!)

নারী অশুদ্ধ হলে তার সমালোচনা সবার আগে করে তার আশেপাশে থাকা নারীরাই। পুরুষ অশুদ্ধ হলে আশপাশ তাকে বাহবা দেয়।

বিশুদ্ধ নারী হওয়া মানে নম্র হওয়া। আর খাঁটি পুরুষ হওয়া মানে বাঘের মত তেজী হওয়া। এখানেই মূল পার্থক্য। পুরুষ একদিকে শক্তির চর্চা করবে। নারীকে নরম হতে বলবে, ভদ্র হতে বলবে।

নিজের ফ্রক পরা মেয়েটার কামিজ পরার বয়স হওয়ার আগেই তার ওজনহীন বুকের উপর ওড়না চাপায়ে দেয় তার মা-ই। কারণ সে জানে, কলিং বেল টিপে কেউ একজন কোনো কাজে এসে যখন শোনে “আপনার ভাই তো বাসায় নাই”, তখন চোখে মুখে খারাপ ভাব দেখায় যে শুয়রটা সে দুইদিন পর বাসায় এসে ড্রয়িং রুমে বসে তার ছোট মেয়েটার দিকেও সেভাবে তাকাবে। এখানে মা- মেয়ে আলাদা কেউ না। তাদের একটাই পরিচয়, সেটা শুধুই শরীর।

বউ না থাকা পুরুষের দিকে এ সমাজ সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকায়। তার কষ্টে ব্যথিত হয়। কিন্তু স্বামী বিদেশে থাকা কিংবা স্বামী না থাকা সিংগেল মাদারদের দিকে এ সমাজ যে দৃষ্টিতে তাকায় সেটা শুধুই কামনার, শুধুই গিলে খাওয়ার।

গ্রামগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ। দুপুরের কাজ শেষে ঠাণ্ডা বিকেলে সেখানে তাগড়া জোওয়ানদের গরম আলাপের আসর বসে। গ্রামের প্রতিটা মেয়ের ফিজিক্যাল রিপোর্ট তাদের কাছে থাকে।

ওয়াজ মাহফিল আয়োজন করা ছেলেদের সে রাতেই মেয়ে ভাড়া করে এনে সেটা আবার গর্ব করে প্রচার করতে আমি শুনেছি। ধর্ম ধর্ম করে তারা শুধু মুখেই ফেনা তোলে। তাদের এক হাতে যৌনাঙ্গ, অন্যহাতে ধর্মের ঢাল। এভাবেই তারা ইহুদি নাসারাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

ফেসবুকে ধর্ম প্রচারক আবাল বৃদ্ধ বণিতাকে আপনি জিজ্ঞাসা করুন, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা মানে কি?
তারা বলবে, নারীদের পর্দা করানো।

আর কোন আইন তারা জানেও না।

মেয়েদের খোলা জায়গায় কাপড় শুকানো নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছে। পায়জামা দুই পা দুই দিকে দিয়ে শুকাতে দিলে সেটা দেখলে তারা নিজেদের নাকি কনট্রোল করতে পারে না। নারীর কাপড়কেও নাকি পর্দা করতে হবে।

অথচ ধর্ম তাকে নিজেদের ভালো হওয়ার জন্য যা যা বলেছে তারা সেটাতে কখনোই কান দেয় নাই।

আপনি ধর্ষণ নিয়ে যত কথাই বলুন। একটা ফাঁসি, সবার সামনে ঝুলায়া দেয়া ছাড়া পুরা জাতিকে ভালো বানানো সম্ভব না।

শিক্ষা দিবেন? মূল্যবোধ জাগাবেন?
তারা শিক্ষাটাই নেবে না। গোঁড়ামির সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছি আমরা। সঙ্গে আছে দুশ্চরিত্র ক্ষমতাওয়ালারা।

যৌনানুভূতি সবারই আছে। কিন্তু সেটা কোথায় ব্যবহার করা যাবে, কখন কীভাবে ব্যবহার করতে হবে না সেটা জানাই পুরুষত্ব।

তার বুকে কাপড় দিতে বলার আগে আপনি টাখনুর উপর প্যান্ট পরেছেন তো?

রাষ্ট্র যখন বিচার করা ছেড়ে দেয় তখন জনগণ নিজেদের রক্ষায় সবার বিবেকবোধ জাগানোর জন্য চেষ্টা করে। বিবেকবোধের দিক দিয়ে সম্ভবত আমরা এখন সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে আছি। একটা দেশ বিবেকশূন্য হয়ে গেছে।

একটা ফাঁকা রাস্তা, বাসের ভীড়ে, কোলাহলে কিংবা খুব নির্জনতায় আমি আপনি নিজের মানিব্যাগ হারানোর ভয় পাই, পকেটের মোবাইলটা হারানোর ভয় পাই।

অথচ একজন নারী ভয় পায় শরীর হারানোর। ভয় পায় বেঁচে থাকার। ভয় পায় একজন রূপা হয়ে ঘরে না ফেরা কোন গল্প হতে।

৭/৮ বছরের বাচ্চা ছেলেটা বিকেল বেলা মিশে যায় খেলার মাঠের সঙ্গে। তার কোন দুশ্চিন্তা থাকে না। একটা ৭ বছরের মেয়ে খেলতে গিয়ে ঘরে ফিরে ধর্ষিত হয়ে, বস্তাবন্দী লাশ হয়ে।

সব পুরুষ খারাপ কখনোই না। এসবের বাইরেও প্রচুর সুস্থ পুরুষ আছে যারা পুরুষ হওয়ার আগে মানুষ হতে পেরেছে।

একজন প্রকৃত পুরুষের গল্প শোনায়া যাই,

আমার খুব কাছের এক ভাই। চমৎকার মানুষ সে। রক্ত নিয়ে কাজ করে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে কলম ধরে। একদিন এক মেয়ে সহ আমার সঙ্গে তার দেখা হলো, আড্ডা দেয়া হলো। তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন, মেয়েটা তার প্রেমিকা।

তো এরপর অন্য একদিন সেই ভাই আমাকে বললেন, ভাই, ওই মেয়েটাকে কেন আমি এত ভালোবাসি জানেন?
আমি বললাম, না ভাই। আপনি বলেন, আমার শুনতে আগ্রহ আছে।
মানুষটা চোখের মধ্যে কেমন একটা প্রশান্তির ভাব এনে বললেন, মেয়েটা একবার ধর্ষিত হইছিলো। এজন্যই আমি ওকে এত ভালোবাসি।

আমি সেদিন সিগারেট ফেলে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম…।

ছবি: গুগল