একজন সঞ্জীব চৌধুরী…

লুৎফুল কবির রনি

‘নতুন মৃতদের জন্য পুরনো মৃতদের কবর ছেড়ে দিতে হয়। ভীড় । কবরেরও ব্যবসা হয় । হয় লাশ চুরি।

মাটি দিয়ে তাই লেখ নাম ।’

– সঞ্জীব চৌধুরী

অবরুদ্ধ সময়েও তার গান থামে না। চারদিকে যখন বেয়নেট আর জলপাই রঙের ওড়াওড়ি তখনও তিনি বুক চিতিয়ে বলেন, ‘ওরা বলে, ঐ গাড়িতে করে আমাদের জন্য খাদ্য আর পানীয় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন বন্ধুগণ, আমি জানি ঐ গাড়িতে আমাদের জন্য কোন খাদ্য ছিল না, আমাদের জন্য কোন পানীয় ছিল না। ৩০০ লাশ…। ৩০০ টি লাশ ঠাণ্ডা, হিম! যাদের খুন করে ফেলা হবে। আমি বলতে চেয়েছিলাম সেই সত্য কথা। আর তখনই আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্ধত রাইফেল। আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্ধত বেয়োনেট। ওরা বলে খামোশ…। তবুও বন্ধুগণ, আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই, আমার অন্তরের কথা বলতে চাই…’

স্বপ্নের কথা বলতে চেয়েছিলেন তিনি, মনের কথা বলতে চেয়েছিলেন। সবটা বলা হয়নি, বড় অবেলায় চলে গিয়েছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী।

‘বুক জুড়ে এই বেজান শহর

হা হা শুন্য আকাশ কাঁপাও

আকাশ ঘিরে শঙ্খচিলের শরীরচেরা কান্না থামাও

সমুদ্র কি তোমার ছেলে, আদর দিয়ে চোখে মাখাও।’

এই নগর যাদের নাগরিক করতে পারে নি , মানুষের স্বপ্ন বুকে নিয়ে এই নষ্ট শহরে স্বপ্নবাজি রাখা পাগল সঞ্জীব চৌধুরী কি অভিমান বুকে নিয়ে চলে গেলো… আর ফেরার নামটি নেয় না ?

তোমার মাতাল শব্দেরা কি ভীষণ জড়িয়ে রাখে আমায়,  তোমার গানের স্বরলিপি ছুঁয়ে থাকে আমার আঙ্গুল….প্রতিদিন কত কথা হয় তাদের সঙ্গে , তুমি জান তা সঞ্জীব দা ?

‘ ঐ কান্না ভেজা আকাশ আমার ভালো লাগে না,

থমকে থাকা বাতাস আমার ভালো লাগে না

তুড়ির তালে নাচতে থাকা ভালো লাগে না,

এই মরে মরে বেঁচে থাকা ভালো লাগেনা ….’

মরে মরে বেঁচে থাকি তবু আমাদের সবপ্নের, ভালোবাসার কথা বলার মানুষেরা নেই । তোমার মত স্পর্ধিত গলায় কি করে বলবে

‘সব নিষিদ্ধ, কষ্ট নিষিদ্ধ, কষ্ট নাই;

দুঃখ নিষিদ্ধ, দুঃখ নাই;

আমাদের কষ্ট থাকতে নাই, দুঃখ পাওয়ার আদেশ নাই’

তোমার গানে নষ্ট হতে ইচ্ছে করে ‘নষ্ট শহরের নাম না জানা এক মাস্তানের মতন’। রিক্সায় দুরন্ত বেগে ছুটে যাওয়া প্রিয়তমা নারীকে দেখে গাইতে ইচ্ছে করে ‘রিক্সা কেন আস্তে চলে না’। হৃদয়ের দাবী নিয়ে বলতে ইচ্ছে করে ‘হঠাৎ তোমায় মন দিয়েছি, ফে

কন্যা কিংবদন্তীর সঙ্গে

রত চাইনি কোনদিন, মন কি তোমার হাতের নাটাই, তোমার কাছে আমার ঋণ, মন হারালেও মনের মানুষ হারেনা’।

সঞ্জীব’দা আমি জানি কোন এক বাঁধ ভাঙা জোছনা রাতে একলা বিষন্নতায় ডুবে যাওয়া আমি যখন বিরান পথে হাঁটবো তখন সেই পথ ধরে গেয়ে উঠবে

‘আমি তোমাকেই বলে দেবো …. ছুঁয়ে কান্নার রঙ … ছুঁয়ে জোছনার ছায়া’।

তোমার আত্মজা কিংবদন্তী একদিন শুনতে পারবে, বাতাসে রঙ্গীন সুর ছড়িয়ে আছে, কারন তার বাবাই গান গাইতো । ভয়াল নৈঃশব্দে শব্দ ছড়িয়ে সঞ্জীব চৌধুরী চলে গেছে । শাদা শূন্যতায় মধুবনের রঙ ছড়িয়ে গেছে, আলাপের মধ্যে কবিতা পুঁতে রেখে গেছে । রাত্রি গভীর হলেও, যে- রাতে কিংবদন্তীর ঘুম আসবেনা, যখন সে খুলে খুলে দেখবে অ্যালবাম- জানবে এই ঠাঠা- মরার দেশে তার বাবাই বড় বেশি অপরাধী, কারন তার ভালোবাসার ক্ষমতা ছিলো । কারন, সে ভালোবাসতো । কারন এই পোশাকি সিস্টেমের দেশে সঞ্জীব চৌধুরী আপন অস্তিত্বের স্বাধীনতা ঘোষনা করেছে । এই ফাঁকা-ফাঁকা মন্দির-মসজিদ-গির্জার দেশে , সঞ্জীব চৌধুরী ছিন্নমুল মানুষের বাসস্থানের ভাবনা মাথায় রেখেছে । নিরন্নের, অন্ন ও পানীয়ের অধিকারের কথা বলার জন্য, সাহসে, বুক টানটান করে রাজপথে দাঁড়িয়ে থেকেছে ।

কিংবদন্তী একদিন জানবে, তার বাবাই শিক্ষা, প্রতিষ্ঠাকে পায়ে দলিয়ে রাস্তায় নেমে এসে মানুষের কথা বলেছে।বলেছে যখনই

তখনই আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্যত রাইফেল, উদ্যত বেয়নেট!

ওরা বলে…

খামোশ!

স্ত্রী কন্যার সঙ্গে

পৃথিবীতে শান্তি রক্ষিত হোক!

আকাশে শান্তি, বাতাসে শান্তি… ওহো, শান্তি রক্ষিত হোক!

‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীকে ধরিয়ে দিন’

আমাকে চুপ করতে হয়… আমাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়!

তবু, তবুও বন্ধুগন…

আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই,

আমার অন্তরের কথা বলতে চাই!

– সঞ্জীব

কি অদ্ভুত, দারুণ গতিতেই না সময় এগিয়ে যায়।

বলছি, আজ থেকে এক যুগের বেশি ১৯ নভেম্বর ২০০৭। সেদিন এক স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছিলো, এই নগরীতে। কেউ একজন চলে গিয়েছিলেন না ফেরার দেশে। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে পৃথিবী তাকে ধরে রাখতে পারেনি।

সঞ্জীব চৌধুরী চলে গেলে রাষ্ট্র হাঁফ ছেড়ে বাঁচে । তাঁর স্বপ্নের কথা যে জাগিয়ে তুলতে পারে খামোশ জনগণকে।

এই কংক্রিটের কাঠামো যখন হাঁপিয়ে উঠি মনে পড়ে সঞ্জীব’দা তোমায়। মনে পড়ে যায় সামাজিক শেকলগুলো কি স্পর্ধায় তুমি ছিঁড়েছিলে।

যে শহর হৃদয় চেনে না, চেনে শুধু পাকস্থলির গল্প সেই শহরে খুব গোপনে দীর্ঘশ্বাস লুকাতে গিয়ে মনে পড়ে সঞ্জীব’দা তোমায়। তোমার শব্দগুলো সময়ের দেয়ালে পেরেক হয়ে ফুটে আছে লাল রক্তজবার মতো!

কষ্ট , অভিমান চেপে চলে যাওয়া বাউল তোমার প্রয়াণকে অস্বীকার করবো চিরকাল।

যেখানেই থাকো জেনে রাখো আমার কষ্ট অভিমান তোমার কাছ থেকেই পাওয়া …।

‘ একি বেহুলা রাত!

চারদিকে ক্ষয়ে যাওয়া সময়

গুলি ফুটে বাসন্তী ফুলের মতো

মানুষের রক্ত,

নদী-সাগর-মহাসাগরে মিশে

সভ্যতার কপালে ঘষা দিয়ে

সিকি-আধুলি পকেটে পুরে

ঘুমের ওষুধ-এক ঢোক পানি,

তুমিও কি ঘুমাও

এই বেহুলা রাতে! ‘

শুভ জন্মদিন সঞ্জীব চৌধুরী

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box