একটা কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল করে ফুটবে কবে

‘‘একটা কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল করে ফুটবে কবে

একটি শহর উথাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে’’।

লড়াইটা নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতার মতো করে নয়।নিছক প্রশ্নপত্রে ঝামেলা আর পরীক্ষা পেছানোর দাবিতেও নয়। লড়াইটা মানুষের প্রাণ বাঁচানোর দাবিতে, লড়াইটা এই শহরের রাস্তায় তাজা প্রাণ বাসের চাকায় পিষ্ট হওয়ার প্রতিবাদে, লড়াইটা সব ভণ্ডামী আর স্বেচ্ছাচারীতার বিরুদ্ধে।

রাস্তায় রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ভয় আর চোখ রাঙানীকে উপেক্ষা করে লড়াই করার শক্তিটা এই স্কুল কলেজের কিশোর-কিশোরীরা পেলো কোথায়?আবারো ফিরে যাই নবারুণের কবিতায়।

‘‘একটি কথার ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে?’’ সেই ফুলকি কখন, কবে উড়ে এসে পড়ে আর শুকনো ঘাসের বনে আগুর ধরে যায় কেউ তা আঁচও করতে পারে না। গত কয়েকদিন  ছাত্ররা ঢাকার রাজপথ অচল করে দিয়েছিলো দাবি আদায়ের জন্য। তখন দুপুরের রোদ চকচকে ছুরির মতো চারপাশে ঝলসে উঠে ফালাফালা করে দিচ্ছে সবকিছু। লম্বা একটা পথ হেঁটে বাড়ি ফিরছি। হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যানবাহনের সারি। ছাত্ররা জায়গায় জায়গায় জমা হয়ে শ্লোগান দিচ্ছে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। রাজপথকে নিরাপদ করার দাবি তুলেছে এরা। কথা বলছে লাইসেন্সবিহীন গাড়ি আর চালকদের বিরুদ্ধে। কবেকার পুরনো স্মৃতি ফিরে এলো মনের মধ্যে। তরুণবেলায় আমিও মিছিলের সঙ্গে হেঁটে পার হয়েছি দীর্ঘ পথ। পথ চলার ক্লান্তিটা ঝট করে কেটে গেলো। মনে হলো, না, আমি একটুও বিরক্ত হচ্ছি না তো! রাস্তায় কষ্ট করে হেঁটে চলা মানুষও ছাত্রদের এই সংগ্রামে বিরক্ত নয়। সবারই কষ্ট হচ্ছে কিন্তু ন্যায্য দাবি আদায় করে নিচ্ছে তাদের সমর্থন। মনের মধ্যে ফিরে আসে নবারুণের কবিতার লাইন-

‘‘ভাঙ্গবে গরাদ তীব্র সাহস

অনেক ছবি টুকরো কাচে’’।

শহরের রাজপথ ওরা অবরোধ করেছে। স্কুলের ইউনিফর্ম পড়ে, প্রকাশ্যে নির্ভয়ে করেছে। পথ হাঁটতে হাঁটতে খণ্ড খণ্ড ছবি দেখলাম। ওরা রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে ভাঙ্গা কাচ পরিস্কার করছে, এলোমেলো রিকশাকে এক লেনে চলতে বাধ্য করছে, অসুস্থ মানুষকে নির্দিষ্ট স্থানে যেতে সাহায্য করছে, যাবার পথ দিয়েছে অ্যাম্বুলেন্স আর লাশবাহী গাড়িকে। তারা বাসস্ট্যাণ্ডে গিয়ে লাইসেন্স ছাড়া বাস আর ট্রাকের লাইসেন্স পরীক্ষা করে গাড়ির গায়ে রঙ দিয়ে লিখে দিচ্ছে এই বাসের লাইসেন্স নেই, যাত্রিদের বাস থেকে নামিয়ে দিয়ে বলছে-এটাতে চড়বেন না, নিরাপদ নয়।ভবিষ্যত প্রজন্মের এই সাহস ও শক্তি দেখে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে এখনো পথ হারায়নি বাংলাদেশ। তাই তারাও বিনা প্রতিবাদে মেনে নিচ্ছেন কিছুটা কষ্ট। কথা বলতে গিয়ে দেখেছি কারো চোখে আনন্দের কান্না।

স্কুলের বাচ্চারা দাবির হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছে। হয়তো তাদের দাবি মেনে নেয়া হবে, হয়তো হবে না। মেনে নেয়া হলেও সে দাবির অর্ধেকটাই বাস্তবায়িত হবে না। ওরাও হয়তো ফিরে যাবে ঘরে। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা দেয়া হবে। বলপ্রয়োগের শক্তি স্তব্ধ করে দেবে প্রতিবাদের ভাষা। কিন্তু আবারো কবিতার ভাষায় বলতেই হয়,

‘‘একটা কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল করে ফুটবে কবে

সারা শহর উথাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে’’।

বাংলাদেশের মানুষ কিশোর-কিশোরীদের এই যুদ্ধকে মনে রাখবে। কারণ আমরা এতোকালেও যা করে দেখাতে পারিনি তা ওরা করেছে। দিনের পর দিন চলতে থাকা একটা বিশাল অন্যায়কে না বলেছে, কুৎসিত উপেক্ষার হাসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। ওরা যুদ্ধের ডাক দিয়ে গেছে।দেখিয়ে দিতে চেয়েছে এভাবেই প্রতিবাদ করতে হয়। জানান দিয়েছে-প্রতিদিন মরে যাবার চাইতে একদিন মরে যাওয়া শ্রেয়।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ সংগ্রহ