একটি বইয়ের গল্পের সঙ্গে…

নিজের জীবনের যন্ত্রণার গল্পগুলো মাথার ভেতরে লেখা হয়ে যাচ্ছিলো খুব যন্ত্রণাকাতর সময়ে। মনের ভারসাম্য হারিয়ে যাবার মতো যৌন নিপীড়নের ঘটনার আঘাত তাকে যেমন ঠেলে দিয়েছিলো এক ধরণের আড়ালে তেমনি কথাগুলো টুকে রাখার প্রবণতাও তাড়া করছিলো ভেতর থেকে। কথাগুলো লিখে রাখার শুরু তখন থেকেই। ডায়েরির পৃষ্ঠা ভরে উঠছিলো নিপীড়ন আর জীবনের নানা ভাঙচুরের ঘটনায়। আর সেই রোজনামচা অথবা খণ্ড ভাবনা থেকেই বই প্রকাশ।   

মাকসুদা আক্তার প্রিয়তী। জীবনের নানান ঘটনা, দূর্ঘটনাকে হাতের মুঠোয় পুরে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর ইউরোপে। একাকী এক নারী পায়ের তলা থেকে সরে যাওয়া মাটিকে আবার একটু একটু করে জোড়া দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করেছেন। সে যুদ্ধে জিতে নিয়েছেন হারানো অনেক কিছু। আয়ারল্যান্ডের অচেনা এক পরিবেশে বসবাস করে শুরু করেছিলেন যুদ্ধ। সেখানেও জীবনের নেতিবাচক ঢেউ তোলপাড় করে দিয়েছিলো তার জীবন। কিন্তু থেমে থাকেননি দুই সন্তানের ‘সিঙ্গেল মাদার’ প্রিয়তী। থামেনি মিস আয়ারল্যান্ড হিসাবে প্রিয়তীর যুদ্ধ, থামেনি সে দেশের রাজনীতির ময়দানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তার একরোখা চেষ্টা। এই চেষ্টাটাই হয়তো তাকে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছে বৈমানিকের আসনে। এই যুদ্ধের গল্পটা এই সমাজের একজন নাসরিন অথবা সামিয়া অথবা একজন লাবণ্যর বেলায় হয়তো হতো ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট। সেই অজানা নারীদের জানা গল্পগুলো হয়তো একটু আলাদাও। প্রিয়তীর বেলায় আক্রমণগুলোর অবয়ব ভিন্ন। ভিন্ন আঘাত সামলানোর পথটাও। প্রিয়তী তার সেই রক্তাক্ত পথ আর জীবনের গল্প নিয়ে বই লিখেছেন ‘প্রিয়তীর আয়না’। বইটির পৃষ্ঠা উল্টাতে গিয়ে মনে হলো এই একবিংশ শতাব্দীর অস্থির সময়ের প্রবাহে প্রিয়তীর গল্প নাসরিন, সামিয়া অথবা লাবণ্যের গল্পের সঙ্গে মিশে গেছে। কোথাও গিয়ে একলা নারীর জীবনযুদ্ধ নানা অবয়বে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে প্রিয়তীর আয়নায়। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো প্রিয়তীর সঙ্গে কথোপকথন।

বইয়ের উৎসর্গপত্রে প্রিয়তি লিখেছেন, ‘আমি আমার বইটি পৃথিবীর সকল ‘সিঙ্গেল মা’দের, উৎসর্গ করলাম যারা সমাজযুদ্ধে অশ্রুহীন যোদ্ধা, প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছেন নিজের অস্তিত্বের জন্য, আত্নসম্মান এবং আত্নমর্যাদার জন্য।’ বইটি পড়তে পড়তে জানা হলো একজন নারীর লড়াইয়ের কথা। জানা হলো একজন মায়ের সংগ্রামের কথাও।যথারীতি ঢাকায় প্রিয়তীর মুখোমুখি কফির কাপ সামনে নিয়ে। কথায় এবং পোশাকে স্মার্ট প্রিয়তী ঠোঁটে হাসি ধরে রেখেই উত্তর দিলেন প্রাণের বাংলার অনেক প্রশ্নবোধক চিহ্নের। তখন কোথাও কি বেদনার ছাইরঙ সাজিয়েছিলো তার মুখশ্রী? উত্তরটা খুব সহজ। পুরুষ শাসিত সমাজের নানা প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে যে নারী যুদ্ধ ঘোষণা করেন তার মুখ তো কিছুটা বেদনায় ছাপানো থাকবেই।কারণ লড়াইট সহজ নয়।

সম্পর্কে জড়াতে এখনো ভয় কাজ করে প্রিয়তীর মনে। মনে হয়, হয়তো সম্পর্ক ভাঙ্গার আঘাত আর সহ্য করা কঠিন হবে। আর সেই আঘাত তাকে আবার পিছিয়ে দেবে জীবনের চলার পথে। তাহলে কি ঘরের স্বপ্নটা মন থেকে বিদায় নিয়েছে? প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিতেই সামান্য হেসে উত্তর দিলেন প্রিয়তী, ‘মরে যায়নি ঘরের স্বপ্ন। ঘর খুঁজি। কিন্তু একটা ভয় তাড়া করে। সে ভয় আবারও গৃহহীন হবার। মানুষ সঙ্গী হতে চেয়ে কাছে আসে। একটা পর্যায় পর্যন্ত সে মানুষটির আসল চেহারা আড়ালেই থাকে। তারপর নিজের স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেলে সে বের হয়ে আসে তার আসল চেহারায়। সেই চেহারাটা দেখতে ভয় পাই।’

তাহলে কি সবাই খারাপ মানুষ? ভালোবাসার ক্ষমতা নেই? উত্তরে মাথা নাড়লেন প্রিয়তী। বললেন, সবাইকে আমি নেগেটিভ বলে ভাবি না।আমি খুর পজেটিভ একটা মানুষ। তাই নিজের জীবনে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারি। আমি জানি সমাজে পজেটিভ মানুষ আছেন। তারা আছেন বলেই আমার লড়াইটা শক্তি পায়, সাহস পায়।

বইয়ের শুরুতে প্রিয়তী লিখছেন, ‘পালিয়ে এসে একটি সাইবার ক্যাফের স্টোররুমের মেঝেতে শুয়ে আছি। ভোরবেলা ফ্লাইট। আয়ারল্যান্ডে পাড়ি জমাবো। অনেকটা পালিয়ে যাওয়ার মতো। পাশে মা-ও শুয়ে আছেন। সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি, এ ভাবেই কেনো আমাকে লুকিয়ে, পালিয়ে সবাইকে ছেড়ে দেশ ছাড়তে হচ্ছে আমাকে? অন্য ভাবেও তো হতে পারতো বা অন্য কিছু? এই মুহূর্তগুলো আজ যখন সতেরো বছর পর লিখছি, মনে হচ্ছে টাইম মেশিন দিয়ে আমি ওই মুহূর্তে ফিরে গিয়েছি, স্পর্শ করতে পারছি প্রতিটি মুহূর্ত।নতুন জীবনের যাত্রা কেবল শুরু করতে যাচ্ছি। খুলে দিচ্ছি দরজা বইয়ের পাতায় পাতায়।’

বইতে কয়েকটা পরিচ্ছেদ। সেখানে প্রিয়তী বলে গেছেন নিজের জীবনের গল্প। বেড়ে ওঠার গল্প, ভালোবাসার গল্প, জীবনে আঘাত আসার গল্প, জেদ ধরে রেখে জয়ী হবার গল্প।তারা লেখার ভাষা খুব অসাধারণ নয়। কিন্তু লেখাটা আটকে রাখে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। পাঠকমন জানতে চায় একজন মানুষকে, তার যুদ্ধটাকে।

ব্লগ লেখার অভ্যাস ছিলো প্রিয়তীর আগে থেকেই। তাই লেখা বিষয়টা অচেনা নয় তার কাছে। প্রিয়তী বলেন, ‘অনেকেই জানতে চাইতো আমার জীবনের কথা। তাদের সেই জানতে চাওয়াতেই হয়তো আমার মাথায় বই লেখার ভাবনার শুরু। অনেক মানুষ উৎসাহও দিচ্ছিলেন বই লিখতে। তাই ২০১৫ সালে প্রথম পরিকল্পনা করি বই লিখবো। কিন্তু সে বছরই আমার সঙ্গে ঘটে গেলো সেই ভয়ংকর ঘটনা। কাজ করতে গিয়ে শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হলাম। মনে হলো নিজের মন, শরীর সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি। হতাশা ছেয়ে ফেললো আমাকে। আমাকে হাত ধরে সেই হতাশা থেকে টেনে তোলার মতো কেউ ছিলো না আশপাশে। কেউ সামান্য সমব্যথী হয়েও পাশে দাঁড়ায়নি। আমি তখন একা। চিকিৎসকের কাছে চলছে কাউন্সেলিং। ভাবিনি মুক্তি মিলবে। কিন্তু আমার সন্তানরাই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে এলো।ওদের জন্যই আমার আবার জীবনের পথে ফিরে আসা।’

শেষবার কবে কাউকে বলেছেন ভালোবাসি? প্রশ্নটা শুনে প্রিয়তীর কথার তোড় থমকে গেলো। একটু ভেবে বললেন, ‘রিসেন্টলি বলেছি।’ উত্তরের শেষাংশ অবশ্য থমকে রইলো নীরবতা হয়ে তার রহস্যময় হাসির আড়ালে।

ছেলে-মেয়ের সঙ্গে

বাংলাদেশে #MeToo আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে প্রিয়তী বড় ভূমিকা পালন করেছেন। নিজের উপর যৌন নিপীড়নের কাহিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন তিনি। চিহ্নিত করেছেন অপরাধীকেও। আর তাতেই বাংলাদেশে উঠেছিলো এই আন্দোলনের ঝড়। অনেক নারী সাহসী হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন তাদের নিজেদের বেদনার কথা, যন্ত্রণার আখ্যান প্রকাশ করতে। এই আন্দোলন নিয়ে প্রিয়তী বলেন, ‘বাংলাদেশে সময় লাগবে এই আন্দোলনের সুফল ঘরে উঠতে। এখন তো আন্দোলনের একটা কাঠামো তৈরি হয়েছে। মেয়েদের কেউ কেউ সাহসী হয়ে সামনে এগিয়ে আসছেন। হয়তো আরো ১০-১৫ বছর পর পরিস্থিতি বদলাবে। তখন নারীরা এই আন্দোলনের সুফল পাবেন।

প্রিয়তীর কথা হলো, ‘শরীরের সঙ্গে মন বলে একটি বস্তু আছে।কাউকে ভালোবাসতে না পারলে তার সঙ্গে বিছানায় যাবার কথা আমি কল্পনাও করতে পারি না। ‘সেক্স ফর ফান’ এই কালচারে আমার বিশ্বাস নেই। কারণ সম্মতি বলে শব্দটা আমার কাছে মূল্যবান।’

আইরিশ ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী সাইমন কউভনির সঙ্গে

প্রিয়তীর বই লেখা রাতজেগে। সারাদিন নানান কাজের ফাঁকে ফাঁকেও লিখেছেন। এমনও হয়েছে বইটা এবারের বইমেলা ধরাতে প্রিয়তী ছুটি নিয়ে ডাবলিন ছেড়ে চলে গেছেন অন্য জায়গায়। সেখানে হোটেলের রুমে নিজেকে বন্দী করে ছয় দিনে শেষ করেছেন বইয়ের কাজ। বই লেখার কথা বলতে গিয়ে জানালেন, ‘ এমনও সময় গেছে বইতে নিজের কাহিনি লিখতে লিখতে ভয় পেয়েছি ভীষণ। কখনো কেঁদেছি অঝোরে। কারণ সেইসব স্মৃতি আমার কাছে ভয়ের মতোই। কিন্তু তারপরেও সাহস করে লিখে গেছি। কারণ বইটা লেখার একটি বড় উদ্দেশ্য হলো-ওতে আমি কিছু মেসেজ দিতে চেয়েছি যেমন, শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে মেসেজ দিয়েছি। এতে সাবধান করে দিয়েছি শিশুদের বাবা মায়েদের। বলেছি শিশু-সন্তানদের দিকে তাদের মনোযোগী হতে।

সামনের দিনগুলো কেমন করে কাটাতে চান প্রিয়তী? জানালেন আয়ারল্যান্ডে বসে রাজনীতিকেই ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চান। সঙ্গে বাচ্চাদের বড় করাটাও একটা দায়িত্ব। ওদের মানুষ ও মানবিকগুন  সম্পন্ন করে গড়ে তুলবো। পাশাপাশি ওখানকার সিনেমায় অভিনয় করবো। ইতিমধ্যে আয়ারল্যান্ডের তিনটি ছবিতে অভিনয় করেছেন। ছবিগুলো এখনও রিলিজ হয়নি। তবে একটা ছবি প্রিয়তীর নিজের জীবনের কাহিনি নিয়ে।

বাংলাদেশে নাটকে কাজ করতে চান? উত্তরে মাথা নাড়লেন প্রিয়তী। ‘নাটকে কাজ করার খুব একটা আগ্রহ নেই। ভালো সিনেমায় ভালো চরিত্রের অফার এলে অবশ্যই করবো।’

প্রিয়তী ভাবেন, একজন মানুষ এক জীবনে সবাইকে সুখী করতে পারে না। তাহলে সবচাইতে অসুখী হয়ে যায় সেই মানুষটা নিজেই। নিজের জীবনের কাছেও তো তার কিছু চাওয়া আছে।সেই চাওয়াটাও পূর্ণ হতে হয় জীবনে।

প্রশ্নের পালা শেষ হয়ে আসে এক সময়। ওঠার আগে প্রশ্ন ছিলো, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে কী দেখতে সবচাইতে ভালো লাগে? প্রিয়তীর সোজা উত্তর, ‘কফির কাপ’ তবে পাশাপাশি ম্লান হেসে যোগ করলেন, ‘কেউ কফিটা বানিয়ে দিলে ভালো লাগে। কিন্তু নিজেকে-ই তো বানাতে হয়। কিন্তু ছুটির দিনগুলোতে আমার মেয়ে সকালের কফির কাপটা আমার হাতে তুলে দেয়। তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচাইতে সুখি মনে হয়।

প্রিয়তী কাছে জানার ছিলো আজকের এই প্রিয়তীর যে জীবন সেই জীবনটাই কি বরাবর চেয়েছেন নাকি জীবনে অন্য কিছু হতে চেয়েছিলেন? প্রশ্ন শুনে আবারো হাসি ঠোঁটে। বললেন, ‘ ছোটবেলাতে সবার মতোই ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম তারপর একটা  সময় ব্যাংকের মালিক হতে চেয়েছিলাম।’ ইচ্ছেটা মরে গিয়ে না থাকলে ভবিষ্যতে হতেও তো পারেন একজন ব্যাংকমালিক? প্রিয়তী হেসে বলেন,হলেও  হতে পারি বলা তো যায় না কিছু।

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ প্রাণের বাংলা ও প্রিয়তীর ফেইসবুক থেকে