একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড: সেলিম জাহান

ড.সেলিম জাহান। আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যাগত অধ্যাপক হিসেবে পড়িয়েছেন, পড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজ করেছেন জাতিসংঘেও। লেখাপড়ার বিষয় অর্থনীতি হলেও লেখালেখি, আর তাঁর চিন্তার দিগন্ত একেবারেই ভিন্ন এক পৃথিবীর গল্প। প্রাণের বাংলার জন্য এবার সেই ভিন্ন পৃথিবীর গল্প ধারাবাহিক ভাবে লিখবেন তিনি। শোনাবেন পাঠকদের নিউইয়র্কের একটি দ্বীপে তার বসবাসের স্মৃতি।

‘একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে,
থাকবে না সাথে কোন ছাতা,
শুধু দেখা হয়ে যাবে মাঝ রাস্তায়,
ভিজে যাবে চটি, জামা, মাথা।
থাকবে না রাস্তায় গাড়ী-ঘোড়া,
দোকান-পাট সব বন্ধ।
শুধু তোমার আমার হৃদয়ের
ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ।।’

রুজভেল্ট দ্বীপে বন্ধু বাড়ী থেকে যখন বেরিয়েছিলো তারা – মেয়েটি ও ছেলেটি। তখনই তাদের মনে হয়েছে যে বর্ষা নামতে পারে। তাই ঘর থেকে বেরিয়েই ছেলেটি আকাশের দিকে তাকায়, আর মেয়েটি ছেলেটির মুখের দিকে একটি দুষ্টু হাসি হেসে হাতের সুদৃশ্য ছাতাটি দুলিয়ে দেয়। স্কটিশ নকশার ছাতাটি দুলে ওঠে এক ‘মায়াবী পর্দার’ মতো। ছেলেটি হেসে ওঠে, তারপর মেয়েটির নরম ছোট্ট হাতটি ধরে বড় মায়ায় – খুব প্রিয় তার মেয়েটির হাত দু’টো।

পূর্বী নদীর পাড়ের রাস্তায় পা দিয়েই দু’জনেই বুঝতে পারলো, এ বাদলার দিনে জল ফুলে উঠেছে নদীর – উত্তুঙ্গ জলপ্রবাহ বলা চলে। মেয়েটি ছাতা খুলে দেয়, তারপর ঘন হয়ে সরে আসে ছেলেটির দিকে। মৃদুকণ্ঠে গল্প করতে করতে এগোয় দু’জনে, মাঝে মাঝে শোনা যায় তাদের উচ্চকিত হাসির শব্দ। সে হাসিতে চাপা পড়ে যায় পাড়ে ভেঙ্গে পড়া ঢেউয়ের শব্দ, গাঙচিলদের ডাক, পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষের কথা।পথের একটি বাঁকে এসে মেয়েটি আবদার করে, তার ছবি তুলতে হবে। মুঠোফোনে উঠে আসে একের পর এক ছবি – মেয়েটি পাশ ফিরে তাকিয়ে আছে, ঝুঁকে পড়ে নদী দেখছে, গভীর মায়ায় তাকাচ্ছে ছেলেটির দিকে, ছাতা খুলে ছত্রপতি সেজেছে। পেছনে দুলতে থাকে ম্যানহ্যাটেনের হর্মরাজি, আকাশরেখা, পেছনের ব্রুকলীন সেতু। ছেলেটির হাত থেকে মুঠো ফোন কেড়ে নিয়ে মেয়েটি ছবি তোলে ছেলেটির নানান ভঙ্গিতে। সবই মুঠোফোন বন্দী হয়।আর তখনই হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামে। দৌড় … দৌড় … দৌড়! দু’জনে একে অন্যের হাত ধরে দু’টো আনন্দিত শিশুর মতো দৌড় দেয় তারা – ছাতার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা দু’জনার মাথায়, জামা-জুতো ভিজে একশা, পিঠের ব্যাগও অক্ষত নেই। হঠাৎ দেখা যায়, পূর্বী নদীর পাড়ে বড় বড় ঝোপ চাঁদোয়ার মতো চারদিক ঘিরে রয়েছে, আর তার নীচে? অবিশ্বাস্য ! তার নীচে একটি কাঠের হেলান দেয়া বেঞ্চি! কোথায় লাগে এর কাছে স্বর্গ!

ঝোপের নীচে ঢুকে পড়ে দু’জনে। ছোট ছোট ডাল, পাতা নাকে-মুখে এসে লাগে তাদের। মেয়েটি তার ব্যাগ খুলে টিস্যু বার করে, ছেলেটি তার মাথা নোয়ায় আর মেয়েটি ছেলেটির মাথা মুছে দেয় এক পরম মমতায় – একজন মা যেমন একটি ছোট বাচ্চার মাথা মুছে দেয়। ছেলেটির বড্ড ঠান্ডা লাগার ভয়। বসে পড়ে দু’জনেই বেঞ্চিতে।ছেলেটি তার পিঠের ব্যাগ খুলতে থাকে। মেয়েটি ছেলেটির হাতের ওপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ে পরম ঔৎসুক্যে তাকায়। কি বার করবে ছেলেটি? কি আর বেরুবে? বেরুলো একটি বোতলে তরমুজের রস, একটি ঢাকা দেয়া বাটিতে কাটা ফল, যত্ন করে গোছানো ন্যাপকিন আর কাঁটা চামচ। মেয়েটির চোখে-মুখে একটি নরম ভালোবাসার ছায়া নামে – এতো ভেবে চিন্তে এতো সব কিছু করেছে ছেলেটি? কেন জানি, তার চোখ ভিজে আসে।

তারপর এ বাদলা দিনে ঐ ঝোপের নীচে শুরু হয়ে যায় তাদের পিকনিক। খেতে খেতে কত গল্প। মেয়েটি খাবার তুলে দেয় ছেলেটির মুখে – তার ভারী ভালো লাগে ছেলেটিকে খাইয়ে দিতে। ছেলেটি একসময় মায়াময়ভাবে কাছে টানে মেয়েটিকে। মেয়েটি তার মাথাটি নামিয়ে দেয় ছেলেটির ঘাড়ে। ছেলেটি তার অতি প্রিয় মেয়েটির ছোট্ট নরম হাত দু’টো তুলে নেয় নিজের হাতে। ‘এমন বিকেল আমি কখনো ভুলবো না। বড় সাধ ছিল, তোর সঙ্গে বর্ষায় বেড়াই’, মৃদুস্বরে মেয়েটি বলে। ছেলেটি কিছু বলে না – শুধু মেয়েটিকে টেনে নেয় বুকের মধ্যে।

তারপর এক সময় কথা থামে তাদের। টুপ টুপ করে জল পড়ার শব্দ শোনা যায় ঝোপের পাতায়-পাতায়। বৃষ্টি ভেজা দু’টো শালিক তাদের পায়ের কাছে হুটোপুটি করে খাদ্যদানার আশায়। ছেলেটি আকাশের দিকে তাকায়। মেয়েটির দৃষ্টি নদীর দিকে। মেয়েটির মনে পড়ে যায়, গত বছর কোন এক গ্রীষ্মের রাতে তারা দু’জনে বেরিয়েছিল নদীর তীরে হাঁটতে। মন খারাপ ছিলো দু’জনারই। পরের দিন দূরে কোথায় যেন চলে যাওয়ার কথা ছিলো তার। শরীরও ভালো ছিলো না। তাই বেশী দূর হেঁটে যায় নি তারা। ঐ পর্যন্তই যেখানে জাহাজের মতো একটি স্থাপত্য করা হয়েছে নদী তীরে। ছেলেটি হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে বুকের মাঝে ধরে ছিলো। মেয়েটির মনে পড়ে, ছেলেটি একের পর এক তাকে গান শুনিয়েছিলো।

আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ছেলেটির মনে পড়ে ক’দিন আগেও এ নদী তীর ধরে দু’জনে হেঁটে গেছে – তারপর বসেছে নদীর মধ্যে পাটাতন দেয়া মঞ্চটির মধ্যে। সন্ধ্যার বাতি জ্বলেছিলো – সে নিয়ে এসেছিল কাছের দোকান থেকে দু’মগ কফি। ঘনায়মান সন্ধ্যা, নদীতীরের বাতি, অন্ধকারে জলের ঢেউয়ের শব্দ – কি যে ভালো লেগেছিলো তাদের। তাকিয়েছিলো সে এক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে – তার শুধু মনে হয়েছিলো, এতো সুন্দরও মানুষ হয়। বহুক্ষন তারা সেখানে বসে ছিলো এক অদ্ভুত আবেশে।

বিভোর হয়ে ছিলো দু’জনাই দু’জনার চিন্তায়। এক সময়ে দু’জনেই হঠাৎ করে খেয়াল করে, কখন যেন বর্ষা থেমে গেছে। এবার ফেরার পালা। ধীর পায়ে উঠে পড়ে তারা – নরম চোখে তাকায় একে অন্যের দিকে। মৃদু হাসে। হাতে হাত রাখে। কাল মেয়েটি আবার চলে যাবে দূরে। মেয়েটির মনে হয়, ‘আবার কি কখনো আসবে তারা এখানে’? ছেলেটি ভাবে, ‘এমন সন্ধ্যা আর কি কখনো হবে’? পা বাড়ায় তারা সামনের দিকে।

লেখক:ভূতপূর্ব পরিচালক

মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং 

দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী

নিউইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box