একদিন লাবণ্য অমিত…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আহমেদ মুশেফিকা নাজনিন

শিলং, জলপাইগুড়ির চা বাগান, সঙ্গে মাধবী, অমিত, অনিমেষ, লাবণ্য, অনিকেত, সুকান্ত, সমরেশ আর সুনীল। কিশোর বেলায় এই নাম গুলো খুব প্রভাব ফেলেছিলো মনে। লেখক বুদ্ধদেব বসু যখন গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত আর ঘি দিয়ে আলু ভর্তার বর্ণনা দিতেন । মনে হতো আহা মরি মরি! কি অমৃত খাবার! এখনই বসে পরি না কেন পাটি পেড়ে। নাক ডুবিয়ে গন্ধ নেই ধোঁয়া ওঠা গরম জুই ফুলের মতো সাদা ভাতের! সাথে পাহাড়ী বুনো মোরগের ঝাল তরকারী, একটু সুগন্ধি কাগজী লেবু আর করমচার আচার। এসব খেতে বিষন্ন দুপুরে মন ছুটে যেতো জলপাইগুড়ির চা বাগানে। একা একা খালি পায়ে ধুলো উড়িয়ে হাঁটি সেখানে। শুনি পাতা ঝরার শব্দ। মনে মনে কথা হতো উত্তরাধিকারের অনিমেষের সঙ্গে। মাধবীলতার মাধবী কত কথা বলতো যে আমায়। আবার মন কেমন করতো শেষের কবিতার লাবন্য অমিতের জন্য। লাবণ্য যে অমিতকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো। তার জন্য কিশোর বেলায় কিছুটা কষ্ট, কিছুটা অভিমান, কিছুটা রাগ হলেও পরে বুঝেছি লাবণ্যই ঠিক। প্রতিদিনকার জীবন যাপনে তেল নুন বাজারের চাপে ভালবাসি আর ভালবাসা শব্দটা কেমন চাপা পরে যায়। ইট চাপা হলুদ ঘাস হয়ে যায় সে। ঝলমলে গাঢ় সবুজ ভালবাসা হারিয়ে ঘরে ঘরে চলে নিরব যুদ্ধ। কখনো বা ফেনিয়ে ওঠে অভিমানের নীল পাহাড়। গুমড়ে গুমড়ে কাঁদে যেন শ্যামা মন। কে বুঝবে কাকে। মন যে বড়ই জটিল। বাড়ে ব্যাক্তিত্বের সংঘাত। মন হারিয়ে সব হারিয়ে ভালবাসা তখন ছটফট করে মরে। বেলী ফুলেরা একা একা ঝরে যায়। খোঁপায় আর ওঠেনা সে। বড় হয়ে বুঝেছি অনিমেষ, অমিত, লাবণ্যরা শুধু বইয়েই থাকে। সবার জীবন যাপনে আসেনা তারা। যারাও বা পান, খয়েরী চোখে অবহেলায় হারান অমুল্য সে রতন। সারাজীবন পাশে থেকেও মন চেনেনা কারও মন। সাদা ছাদ হয়না আপন। অনেকেই করতলে ভার বইতে পারেন না মুক্তোর মতো কান্নার এক ফোঁটা নোনা জল। মন যে তার ভাসে নকল কাঁচের ভাঁজে। এক হৃদয় কস্ট নিয়ে মনে তখন পাহাড়ের মতো বোঝা। কান্না চেপে এরই মাঝে ছুটে চলা নাগরিক জীবনে। তেপান্তরের মাঠে বধু হে, একা বসে থাকি। তুমি যে পথ দিয়ে গেছ চলে তারি ধুলা মাখি হে।
মনে মনে তখনও শিলং ভাবনা। আমার চাইতেও বেশী যাওযার ইচ্ছে বড় বোনের। কিন্তু ও যেতে পারলনা। ওর অভিমানী ইচ্ছেকে পেছনে ফেলে সাদা মেঘকে সঙ্গে নিয়ে আমরা যাই শিলংয়ে। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে খুঁজি লাবন্য অমিতকে। দেখা মেলে না। পাশে পাই খাসিয়া গারোদের।
এক রোদ ঝলমলে সকালে গেলাম রবি ঠাকুরের বাড়ি। এখানেই জন্ম নেয় লাবন্য অমিত। ১৯১৯ সালে ব্রুকসাইড এই বাংলোয় তিনি লিখেছিলেন শেষের কবিতা। প্রথম দিন দেখা হয়না । ঈদের জন্য বাড়ি বন্ধ। অভিমানে অতিথিদের মন ভার। এখানে ওখানে বসে ছবি তুলি। শ্বাস নেই সাদা মেঘে । শুনতে যেন পাই অমিতের স্বর। কি চাও আমার কাছে। বাতাসে দোল খায় সবুজ পাতা। লাবণ্যকে খুঁজি। দেখা মেলে না। মনে কষ্ট নিয়ে ফিরে আসি। পরদিন আবার যাই। ঘরে ঘরে খুঁজি, হাতরে বেড়াই। কি যে খুঁজি। প্রেম ভালবাসা, মমতা নির্ভরতা নাকি বিশ্বাস। জানিনা। অপি ততক্ষণে বসে গেছে কবির টেবিলে রাখা খাতায় কিছু লিখতে। আমি ছুঁয়ে দেখি টেবিল, কবি নাকি অপি। বুঝলাম না।
ঘর জুড়ে নানা পেইটিং। বাইরে তখন বাতাস ডাকে। অবশেষে কি এসে পৌছেলে আমার জীবনে-। শুনে আমার মন কেমন করে। অপি উদাস। জুয়েল ভাই সিগারেট টানে। মেজ বোন দেবদারু গাছের নীচে একা দাঁড়িয়ে। ওর মনের মধ্যেও কি তখন উথাল পাথাল, কোনো এক কবির জন্য ? নাকি কবিতার জন্য ?
এখানে বসেই কবি লিখেছিলেন বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা। বিপদে আমি না যেন করি ভয়। দুখ তাপে ব্যাথিত চিতে নাইবা দিলে সান্তনা। দু;খ যেন করিতে পারি জয়।
মুগ্ধতা নিয়ে গেস্ট হাউজে ফিরলাম। মন এখন বড় শান্ত স্থির। অনুভবে তখন শুধু রবীন্দ্রনাথ। গেলাম কবিগুরুর আরেক বাড়ি, জিতভুমিতে। ১৯২৩ সালে এখানে তিনি লিখেছিলেন রক্ত করবী, শিলঙের চিঠি।
ছোটবেলায় আববাকে দেখেছিলাম কলেজে ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে নাটক করেছিলেন, রক্ত করবী । হা করে গিলেছিলাম। বুঝিনি কিছুই। শুধু মনে ছিলো অভিমানী নন্দিনী, কিশোর বিশু আর রাজার কথা। আবছা মনে আছে বিটিভিতে দিলশাদ নামে এক অভিনেত্রী নন্দিনী হয়েছিলেন। গোলাম মোস্তফা রাজা। এখনো চোখে ভাসে সাদা কালো টিভিতে নন্দিনীর সেই মায়াময় মুখ। আহা ! মাঠের বাঁশি শুনে শুনে আকাশ খুশী হলো। ঘরেতে আজ কে রবে গো। খোলো, খোলো দুয়ার খোলো খোলো, খোলো দুয়ার খোলো। কি করে পারেন কবি। জানা হয়না। ছুটে চলি । কে জানে কাহার তরে আমার মন কেমন করে।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]