একাকী যখন আমি মুখোমুখি হয়েছি নিজেই

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

ডনের এই চুক্তির পর শুরু হলো নতুন জীবনের ছন্দ।রুটিন বদলে গেলো। প্রায় অফিসের মত করে রোজ ডন স্টুডিও তে যাই।রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ার বা মাস্টার রাজা ভাই গান রেকর্ড করেন। উনি নিজেও ভালো গান করেন রেডিও টিভিতে। এবং উনার শ্রুতি অসম্ভব পারফেক্ট। আমি যে গানগুলো গাইবো তা বাসা থেকে মোটামুটি কন্ঠে তুলে নিয়ে খাতায় লিখে গোছগাছ করে যাই স্টুডিওতে।প্রায় দিনই একসঙ্গে ছয়টা গান গেয়ে দেই।রাজা ভাই প্যানেলে বসেন, সঙ্গে মইনুল ইসলাম খান সাহেব। দুইজন কাটাকম্পাস টাইপ মানুষ বসেন প্যানেলের চেয়ারে।আমি আরেক মেশিন মাইক্রোফোনের সামনে পয়লা যন্ত্রের মতো দাঁড়িয়ে স্রষ্টা কে স্মরণ করি।তারপর কন্ঠ খুলি।শুরু হয় রেকর্ড করা।আমি ভুল একটা নিঃস্বাস নিলেও একসঙ্গে রেকর্ডিং আটকে রাজা ভাই ও ইসলাম খান সাহেব বলেন ‘উঁহু হয়নি’ আমিও বুঝি হয়নি।আবার। আমি আমার গানে প্রাণ আনি, দু’জনেই বলে ওঠেন ওকে! একটা শব্দ হয়তো ভুল ভাবে প্রক্ষেপণ করি, দুজনেই বলেন উঁহু, আমি ধরার চেষ্টা করি কি ঘটলো, ভেবে নিয়ে আবার সঠিক প্রক্ষেপণ করি, উনারা বলেন ওকে।আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।এভাবেই চলতে থাকে ডনের রেকর্ডিং। ডন কোম্পানির রেকর্ডিং। ডনের স্টুডিও আমার বাসাবাড়ির মত হয়ে ওঠে। কাজের মাঝে লাঞ্চের সময় হলে ওখানেই খাই।স্বাভাবিক আড়ষ্টভাব কাটিয়ে স্টুডিও কে আপন করে নেই।এই মাইক্রোফোনে নিজেকে আয়নায় খুঁটিয়ে দেখার অভ্যাস শুরু হয়েছে আমার ডন স্টুডিওতে।আমি আমার কন্ঠকে চিনতে পেরেছি ডন স্টুডিওতে। কখনো সামান্য নাক ধরা থাকলেও মাইক্রোফোনে ধরা পরে। জ্বর আসার দুই দিন আগেই মাইক্রোফোনে ধরা পড়ে কন্ঠের মাখন মসৃণতা উধাও। তখন কারণ না বুঝলেও দুইদিন পর জ্বর আসলে বোঝা যায় মসৃণতা উধাওয়ের গল্পের গোড়া কোথায়! প্রায় পাঁচ বছর আমি একটানা ডনে কাজ করেছি।আবার এটাও বলা যায় যে আমার সঙ্গে ডন কোম্পানি কাজ করেছে। কারণ দিলরুবা আপার মেগা হিট পাগলমন ক্যাসেটের পর আমার গান ছাড়া ডনের আর কোন উল্লেখযোগ্য কাজ ছিলো না।আমি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করার ক্ষমতা হাতে নিয়েছিলাম কিন্তু তা ওই সময় একদমই বুঝতে পারিনি। আমি শ্রমিকের মতই কাজ করে গেছি।এবং আমার স্বামী জনাব খান সাহেব যে গান রেকর্ড করতেন তিনিও ভলান্টিয়ারদের মত দিনের পর দিন বছরের পর বছর শুধুই তার স্ত্রীকে সাহায্য করার মত করে কাজ করে গেছেন। অবশ্য ক্যাসেটের গায়ে কৃতজ্ঞতা মইনুল ইসলাম খান লেখা থাকতো। আর প্রতিটি রেকর্ডিং এ এক প্যাকেট বেনসন এন্ড হেজেস বরাদ্দ থাকতো। কাজের মাঝখানে কোন এক সময় ডনের মালিক (আমরা সে সময় এভাবেই বলতে অভ্যস্ত ছিলাম) আমাদের দামী দামী পারফিউম টয়লেট্রিজ উপহার পাঠালেন উনার স্টুডিও হেলপার আবুল ভাইকে দিয়ে। আমি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে পরের রেকর্ডিং এ সাক্ষাৎ এ বাবুল ভাইকে বললাম ভাই আমি উপহার চাইনা এবং এমন পার্সোনাল সামগ্রী উপহার নেইও না আপনি ব্যবসা ভালো হলে বরং আমার পারিশ্রমিক বাড়িয়ে দেন,সেটাই ভালো দেখায়।উপহার স্থগিত হলেও পারিশ্রমিক বাড়ানোর ব্যাপারে আর কোন সুরাহা হয়নি।

হারানো দিনের গান গাওয়ার জন্য আমাকে অনেক উল্টাপাল্টা কথা শুনতে হয়েছে। শ্রোতাদের কাছে ভালবাসার সঙ্গে সঙ্গে উষ্মা ও পেয়েছি এই বলে যে, এতো প্রতিভা থাকা সত্বেও অন্যের গান গাওয়া কেন? অন্যের গান গেয়ে এনার্জি নষ্ট না করে নিজের গান দাঁড় করানো যেতো না কি? সেই পঁচিশ ছাব্বিশ বছর আগের প্রশ্নের উত্তর আজ যখন সুযোগ পেলাম তো দিয়েই দেই।সেই উত্তর টা পরিষ্কার ভাবে বলতে চাই যে এই হারানো দিনের গান আমাকে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা দিয়েছিল যা আমাকে বস্তুজগৎ এ বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছিলো। সে সাহায্য এমন সাহায্য যে চাল ডাল বাচ্চার দুধ কিনতে আমাকে জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাঠকর্মীর চাকরি নিতে হয়নি। মাঠকর্মী হলে বাংলাদেশ একজন কন্ঠশ্রমিক পেতোনা।আর জগন্ময় মিত্র থেকে আরতি ধর হৈমন্তী শুক্লা থেকে লতা মুঙ্গেশকর এতো কণ্ঠকে বুকে এবং হৃদয়ে ধারণ করে নিঃশ্বাসে মিশিয়ে নেয়ার অনুশীলন ও আপনাদের কনকচাঁপা কে পানির মত তরল হতে, বয়ে চলতে সাহায্য করেছে বলেই কনকচাঁপা এতো সহজেই কনকচাঁপা হয়েছে।আমি আমার হারানো দিনের গানের কাছে, সেই গানের শিল্পীদের কাছে, ডন কোম্পানির কাছে, রেকর্ডিস্ট রাজা ভাইয়ের ও খান সাহেবের কাছে কৃতজ্ঞ। তাঁরা আমাকে অবয়ব পেতে সাহায্য করেছেন। সাহায্য করেছেন প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে সচল রাখতে।তাঁদের কাছে এবং এই গল্পের ছক এর লেখক স্রষ্টার কাছে চিরকৃতজ্ঞ, আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখক