একাত্তরের ভয়াবহ দিনটি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

গত কিস্তিতে বলেছিলাম, খুলনায় আমাদের জীবনে ২৫শে মার্চ ছিলো না, সে রাতে ঢাকা শহরের মানুষের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা আমরা পরে জেনেছি। আমাদের জীবনে পাক-সেনার আগমন ঘটে ২৭শে মার্চ। আমরা নিশ্চিন্তে আমাদের কোকূনে বসবাস করছিলাম। নিউজপ্রিন্ট মিলের কলোনীর ছেলেমেয়েরা আড্ডা ও কি ঘটছে-কি ঘটতে পারে, সেকথা আলোচনা করে কাটাচ্ছিলাম। ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাহেদ ও তার বোন শিখা ছিলো প্রায় নিত্য সঙ্গী। আমাদের ব্যাডমিন্টন খেলা বা গান-বাজনা বন্ধ, একমাত্র আড্ডাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিলো। আমাদের সেই প্রায় বন্দী জীবনে শহর থেকে সাংবাদিক শাহাবুদ্দিন ভাই মাঝে মাঝে মহার্ঘ্য বন্তু, যেমন চিনি ইত্যাদি পৌঁছে দিয়ে যেতেন। কলোনীর অনেকেই অন্য কোথাও চলে গেছে। বাকীরা দূর্ভাবনা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। ঢাকার টুকরো খবর যা পাই, তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরো বেড়ে যাচ্ছিলো। তার মধ্যে এলো ২৭শে মার্চের সেই ভয়াবহ দিন। খবর পেলাম পাক-সেনারা নিউজপ্রিন্ট মিলে হামলা চালিয়েছে। আমাদের মধ্যে অনেকেই নদীর পাড়ে ম্যানেজারের নতুন বাংলোতে চলে গেলাম। ম্যানেজার ছিলেন মোজাম্মেল হক। তাঁর স্ত্রী ডলি আপা চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী পেপার মিলে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের প্রধানের (নাম ছিলো সম্ভবতঃ ইদ্রিস সাহেব) কন্যা। আব্বা-মায়ের পূর্ব পরিচিত। তাঁর বাংলোর বারান্দায় শাহেদ, আমি ও অন্য কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম, প্রচুর মানুষ নদীর দিকে ছুটছে, হাতে কিছু সামগ্রী। একজনের হাতে দেখি ভাতের হাড়ি। হয়তো ভাত রান্না করেছিলেন, সেটা নিয়েই যাত্রা করেছিন। তাঁরা সবাই ভৈরব কিংবা রূপসা নদী পার হয়ে ওপাড়ে গিয়ে কোনো গ্রামে আশ্রয় নেবেন। আমাদের আড্ডা জমছিলো না। এক অজানা আতঙ্কে সবাই প্রায় চুপ। ঘরে পুরুষরা আলোচনা করছেন। হয়ত রাজনীতি অথবা পরবর্তী রণ কৌশল, আজ আর সেটা মনে নেই। বেশ অনেকক্ষণ পর সেই ভয়াবহ খবরের সত্যতা খানিকটা জানা গেলো। পারভেজ নামে একটা অবাঙালি ছেলের চোখের সামনে পাক সেনারা ভয়াবহ হত্যাকা- চালিয়েছে। সে ফিরে এসে পাগলের মত আচরণ করতে শুরু করলো। জানা গেলো, পাকবাহিনী কয়েকজন অফিসার/কর্মচারীকে হত্যা করেছে। পরে জেনেছিলাম, তাঁদের মধ্যে আলমচাচা একজন। শুনেছিলাম, তিনি নাকি প্রতিরোধ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন, তাঁর কাছে যে বন্দুক ছিলো, সেটা দিয়েই। তাঁকে পাকিস্তানী হার্মাদরা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। আলমচাচা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টেই আব্বার সঙ্গে কাজ করতেন। বয়স তেমন ছিলো না, সুগঠিত দেহের অধিকারী ছিলেন। আমাদের মধ্যে দু’জন পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসার ছিলেন, হামজা সাহেব ও কাজমী সাহেব। তাঁরা তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলেন, পাকসেনারা সিনিয়র কলোনীর দিকে আসছে শুনে। পরে শুনেছি, তাঁরা পাকসেনাদের নিবৃত্ত করতে ও ফিরে যেতে বাধ্য করেন। আমরা সাময়িকভাবে বিপদ মুক্ত হলাম। এই ঘটনার পর অনেকেই কলোনীর বাসস্থান ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন খুলনা বা অন্য কোনো শহরে কোনো আত্মীয়-পরিজনের বাড়ি কিংবা সোজা গ্রামে। সেসব জায়গাও হয়তো নিরাপদ ছিলো না। তবু মানুষ তো বিপদে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে। আমরা রয়ে গেলাম। এরপর আর একটা ধাক্কা এলো এপ্রিল মাসে। এবারের ভয়াবহ দিনের হোতা ছিলো নিউজপ্রিন্ট মিলের ঠিক বাইরের বিশাল বিহারী কলোনীর লোকজন। বলা বাহুল্য তাদের সহানুভূতি পাক সরকারের প্রতি ছিলো। এবার তারা মুক্ত কৃপাণ হাতে জুনিয়র কলোনীতে ঢুকে সাতাশজনকে জবাই করে রেখে যায়। পরে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের বর্ণনা একজন প্রত্যক্ষদর্শী দিয়েছিলেন – তিনি দেখেছিলেন, মৃত মায়ের বুকের ওপর পড়ে একটি বছরখানেক বয়সের শিশু মাকে ডেকে ডেকে কেঁদে চলেছে। শুনে আমরা কেউ চোখের পানি আটকাতে পারিনি। তখনো জানি না, গোটা দেশে এরকম অনেক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিলো। কি কারণে বিহারীরা তার পরে আর অগ্রসর হয়নি, সেটা আজ এতদিন পর মনে করতে পারছি না। আমাদের ভাগ্য সুপ্রসণœ ছিলো, নাকি আমাদের দূর্ভোগ আরো বাকী ছিলো, বলতে পারবো না। এরপর মিলের অফিসার ও কর্মীদের অধিকাংশ সেখানে থাকতে সাহস পাননি। আমরা কোথায় যাবো জানতাম না। মা বিশেষ করে চিন্তিত ছিলেন ‘পরের মেয়ে’ আমার সহপাঠিনী মঞ্জুকে নিয়ে, যে তার বাবার বদলীর কারণে আমাদের বাড়িতে থেকে গিয়েছিলো। শাহেদরা খুলনা শহরে ওর এক মামার বাড়ি চলে গেলো। কলোনীর রাস্তা দিয়ে হাঁটলে জায়গাটাকে শ্মশানপুরী মনে হতো। অধিকাংশ বাড়ি খালি, যতেœ রাখা বাগানে লম্বা ঘাস ও আগাছা জন্মেছে। রাস্তা সুনসান। আমরাও পরে শাহেদের সেই মামা গিয়াসুদ্দিন, যাঁকে আমরা ডাকতাম পুতুল মামা বলে, তাঁর বাড়ি চলে গেলাম। তিনি আমাদের তাঁর বাড়ি নিয়ে গেলেন। তিনি খুলনায় পাকিস্তান ম্যাচ ফ্যাক্টরীর ম্যানেজার ছিলেন, আব্বার বিশেষ পরিচিত-বন্ধু। আবার আমাদের আড্ডা শুরু হলো। এভাবে বেশ কিছু অলস দিন কাটার পর পাক সরকার নিউজপ্রিন্ট মিল চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয় এবং অফিসার-কর্মীদের খুঁজে খুঁজে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যায়। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের একমাত্র নিউজপ্রিন্ট মিল ছিলো সেটি। আব্বা বললেন, ‘আমি একা পালাতে পারবো। কিন্তু তোমাদের নিয়ে কোথায় পালাবো!’ ঠিক হলো আমরা রকেট স্টিমারে চড়ে ঢাকায় বড় চাচার কাছে চলে যাবো। রকেটে যাবার কারণ মঞ্জুকে বরিশাল ওর আব্বার কাছে রেখে যেতে পারবো। তাঁর পোস্টিং ছিলো সেখানে। আমরা কাউকে কিছু না বলে চলে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকলাম।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]