একাত্তর: ঢাকা পর্বের শুরু

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক, সাংবাদিক উর্মি রহমান প্রাণের বাংলার জন্য লিখছেন দূরের হাওয়া বিভাগে জীবনস্মৃতি; ‘মনে পড়ে’। তার শৈশব, কৈশোর জীবনের বয়ে চলা পথের গল্পগুলো এই ধারাবাহিক জুড়ে থাকবে। উর্মি রহমান দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করেছেন। কাজ করেছেন বিবিসি বাংলা বিভাগেও। এখন বসবাস করেন কলকাতায়।

ঊর্মি রহমান

আমরা ঢাকা যাত্রা করলাম। রকেটে যাওয়াই সাব্যস্ত হয়েছিলো, কারণ আমার সহপাঠী-বন্ধু মঞ্জুকে বরিশালে ওর বাবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। প্রথম একটু ভয় ভয় করছিলো। দেখলাম ভয়টা সমস্ত যাত্রীর মধ্যেই আছে। গোটা দেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে। তাদের নির্যাতনের কথা তখন দেশের সমস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। কিন্তু স্টীমার ছাড়ার কিছুক্ষণ পর নদীর বাতাস, নদীতে ভেসে থাকা নৌকা আর দু’পাশের সবুজ, শ্যামল অপরূপ দৃশ্যে মন থেকে ভয়ের মেঘ কেটে গেলো। রকেটের খাবার বরাবরই আমাদের খুব প্রিয়। তার ওপর মঞ্জু থাকায় আড্ডাও চলছিলো। মা অবশ্য একটু উদ্বিগ্ন ছিলেন, মঞ্জুকে তার বাবার হাতে তুলে না দেওয়া পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। আমরা রূপসা নদী ছাড়িয়ে মধুমতীতে পড়লাম, আমার নানাবাড়ি মোল্লাহাটও পেরিয়ে গেলাম; অবশেষে আমরা বরিশাল পৌঁছলাম। ঘাটে যথারীতি উদ্বিগ্ন মুখে মঞ্জুর বাবা ছিলেন। তিনি আব্বা-মাকে অনেক ধন্যবাদ জানালেন এই দুঃসময়ে তাঁর মেয়ের দেখাশোনা করার জন্য। মঞ্জু এক পশলা কেঁদে নেমে গেলো। আমাদের দুই বন্ধুর দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ হলো। আব্বা-মায়েরও নিশ্চয়ই নিউজপ্রিন্ট মিলের বন্ধুদের কথা মনে পড়ছে – লুৎফর রহমান চাচার সঙ্গে আব্বার তাস খেলা কিংবা পাড়ার চাচীদের সঙ্গে মায়ের আড্ডা, রান্না শেয়ার করা বা এর-ওর বাড়িতে দাওয়াত খাওয়া। যেমন রব্বানী ভাই আর মঞ্জু আপার কথা আমাদেরও মনে পড়ছিলো। কিন্তু তাঁরা সবাই তো তখন আর নিউজপ্রিন্টে মিলে নেই। কে কোথায় ছিটকে পড়েছেন, তাঁদের সঙ্গে আবার কবে-কখন দেখা হবে সেটাও জানি না। সেই অনিশ্চিত যাত্রায় এক সময় আমরা ঢাকা পৌঁছে গেলাম। সেখানে পৌঁছে আব্বা-মায়ের মুখে স্বস্তি দেখলাম। বড় চাচার বাসায় পৌঁছবার পর ভাইবোনদের সঙ্গে দেখা হয়েও খুব ভালো লাগলো। আশৈশব আব্বা ও চাচা আলাদা শহরে চাকরি করলেও এক পরিবার হিসেবে আমাদের বন্ধন অটুট থেকেছে। আমার সমবয়সী বোন পিউ, বড় ভাইরা – বাবুল ও টুবুল বাড়িতেই ছিলো। বড় দুই বোন নীনা ও রিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে থাকতো। দু’জনেই ডাক্তার। পরে জেনেছিলাম, সেনা হামলায় জখম লোকজন ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করার উদ্দেশ্যে ওরা সেখানে থাকছিলো। শুধু বাড়ির ছোট দুই যমজ ভাই মিঠুল (মিজান) ও টুটুলকে (মুনিব) দেখতে পেলাম না। সে রহস্য ক্রমে উন্মোচিত হলো। ওরা দুই ভাই আর ওদের এক বন্ধু দিদার(পরে যার সঙ্গে আমার ছোটবোন তনুর বিয়ে হয়) চিরকূট লিখে এক কাপড়ে বাড়ি ছেড়েছে, দেশের জন্য লড়বে বলে। অথচ ওরা কখনো রাজনীতি করেনি। বাড়ির ছোট ছেলে বলে খুব আদরে মানুষ। যাহোক, পরে জেনেছিলাম, রাজনীতি করা মানুষ যত যুেদ্ধ যোগ দিয়েছে, তার চেয়ে অরাজনৈতিক সাধারন মানুষই যুদ্ধে যোগ দিয়েছে বেশী – ছাত্র ছাড়াও শ্রমিক, কৃষক, তরুণ, কিশোর, নারী অনেক সাধারন মানুষই এভাবে কেউ বাড়িতে বলে, কেউ না বলে চিরকূট রেখে চলে গেছে। আমরা তাদের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছি, কিন্তু গর্ব অনুভব করেছি। সে গর্ব আজ এত বছর পরও অনুভব করি। আব্বা কয়েক দিন পর খুলনা ফিরে গেলেন। আমরা নিজেদের এক লকডাউনে আটকে ফেললাম। তখন এই শব্দটা জানতাম না। কেউ আমাদের ওপর লকডাউনের নির্দেশ দেয়নি। কিন্তু নিজেরাই আমরা সেই জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। কেউ স্কুল-কলেজে যাচ্ছিলাম না। আমি তো তখন খুলনায় বাংলা সাহিত্যে অনার্স নিয়ে পড়ছিলাম। পিউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে পড়ছিলো। কেউ কেউ গেলেও কিন্তু ঢাকায় আমাদের যেসব আত্মীয়-বন্ধু ছিলো, তারাও কেউ শিক্ষায়তনে যাচ্ছিলো না। অলস সময় কাটছিলো, উদ্বেগ, উত্তেজনা ছিলো, ভয়ও ছিলো। আবার এক ধরনের উদ্দীপনাও ছিলো। আমি আর পিউ বেড কভার, টেবিল ক্লথে নক্সা তুলছিলাম। বড় বোনরা এলে হাসপাতালে আসা আহত মুক্তিযোদ্ধা এবং সেই সঙ্গে দেশদ্রোহীদের গল্প শুনতাম। আমাদের মনে হতো আমরা অযথা সময় ব্যয় করছি। পরে অবশ্য কিছু কাজের সুযোগ পাই। সেকথা পরেই বলবো। ঢাকায় থাকা বন্ধুদের বেশীরভাগের সঙ্গেই যোগাযোগ হয়নি। কিন্তু একজন ছিলো আজমিরি, মীরু – তার সঙ্গে যোগাযোগ হলো। মীরুর সঙ্গে অবশ্য আত্মীয়তাও আছে, যার ধরন বোঝা কঠিন ছিলো। ও আব্বাকে ‘মণিভাই’ ডাকতো আর আমি ওর আব্বাকে ‘মাওলাভাই’ ডাকতাম। আমার সঙ্গে স্কুলে পড়তো। ও তখন বাংলা সাহিত্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ওরা থাকতো পিলখানার কাছে। মাঝে মাঝে ওদের বাড়ি যেতাম। ও আসতো। আত্মীয়-স্বজনের কেউ কেউ আসতেন। চাচী কাজ করতেন মে অ্যান্ড বেকার কোম্পানীতে। তাঁর এক সহকর্মী ছিলেন ড. শফিউল্লাহ। চাচীকে ‘আপা’ ডাকতেন এবং খুব শ্রদ্ধা করতেন। আমরা তাঁকে শফিমামা ডাকতাম। তাঁর স্ত্রী ছিলেন চমৎকার মানুষ। তিন সন্তান ছিলো তাঁদের, তার মধ্যে তাঁর মেয়ে শেলীর সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে। শফিমামার সূত্রেই দেশের ভেতরে থেকে আমরা দেশের জন্য কাজ করার সুযোগ পাই। আগেই বলেছি, সেকথা পরে বলবো। আজ এই পর্যন্ত।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]