একা এবং চারপাশ

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

শেষ কবে একা হয়েছিলেন? পুরোপুরি একা? সময় কঠিন হয়ে গেছে। মানুষ এখন একা হলেও একা হয় না। হাতে কোন ডিভাইস থাকে। স্ক্রীন জুড়ে ভারচুয়াল জগৎ থাকে। সেখানে অন্য মানুষ গিজ গিজ করে। মানুষ আর একা হয় না। একা হতে চায় না। নাকি পারে না? জানি না। চেষ্টা করা যায়। সব কিছু ছেড়ে….ঘরটা অন্ধকার করা যায়। চোখটা বন্ধ করা যায়। তারপর…চোখের পাতা বন্ধ রেখে…..চোখদুটো খোলা যায়। তখন অনেক কিছু দেখা যায়।

শব্দহীন অন্ধকার এক ক্যানভাসে কিছুক্ষন…..কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকা যায়। চিন্তাকে ছেড়ে দেয়া যায়। আসলে কোন চিন্তাই না রাখা যায়। যা খুশি ভেসে আসুক….ছবির মতো…সিনেমার মতো। বন্ধ পাপড়ীর কালো ক্যানভাসে…খোলা চোখের সামনে ভেসে আসুক যা খুশী।

মাতৃগর্ভের অন্ধকার নেমে আসুক। আমরা সেই আদিতে ফিরে যাই। স্থবির বৃক্ষের মতো বাতাসের শো শো শব্দ শুনি। সেই যে…প্রথম কাল বৈশাখী দেখলাম। কি দৈত্যের মতো বাতাস বইছিলো। আমি বারান্দায় একা দাড়িয়ে ছিলাম। আমার গা বেয়ে বেয়ে আছড়ে পড়ছিলো ভেঙ্গে-চুড়ে দেয়া বাতাস। বৃষ্টির ঝাপটা আসছিলো। আমি পরিষ্কার দেখছিলাম নিকষ কালো আকাশে পাহাড়ের মতো মেঘ উড়ে উড়ে যাচ্ছিলো। কোথায় যেন গান বাজছিলো। কথা বোঝা যাচ্ছিলো না। শুধু সুর কানে আসছিলো। মনে আছে। সব মনে আছে।

এক বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে ঝিনাই নদীর তীরে। বিকেল পড়ে এসেছিলো। আমি নদীর তীরে একা বসে ছিলাম। শীত কালের ক্ষীন নদী। ওপারে বিস্তির্ন ধানক্ষেত…গ্রাম। একটা খেয়া নৌকা। নৌকায় মাঝি। কয়েকজন মানুষ। একজন শাড়ী পড়ে বসে আছে। দূরে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে কি নিদারুন বিষাদ। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। অচেনা সেই মানবীর জন্য কষ্ট পাচ্ছিলাম।

ট্রেন চলছিলো রাতের বেলা। চলতে চলতে ভোর হতে থাকলো। বাইরে কুয়াশা। ভোরের ঠান্ডা বাতাস। আহ্‌! জানালার কাঁচ তুলে দিলাম। ঘোলা ঘোলা সকাল আর চলমান জনপদ এসে সামনে দাড়ালো। চলতে থাকলো। দু-একটা দোকান খুলেছে। দু-একজন মানুষ মাঠে এসে দাড়িয়েছে। চাদর জড়িয়ে আছে। মাফলার। একজন কিশোর স্থির দাড়িয়ে ভোরের ট্রেন দেখছে। পরিষ্কার মনে আছে। তার চোখের বিস্ময় পরিষ্কার মনে আছে। তার সেই মুখ ছবির মতো ভেসে ভেসে যাচ্ছে।

হাঁটতে হাঁটতে কোন এক ছোট শহর পেরিয়ে এলাম একদিন। ছোট্ট টিলার উপর উঠে দাড়ালাম। সন্ধ্যা নামছে। পায়ের নিচে বিছিয়ে আছে জনপদ। ঘরে ঘরে বাতি জ্বলে উঠছে। একটা-দুটো করে। একটা গাড়ী আস্তে আস্তে বাড়ী ফিরছে। জানালায় কেউ একজন। দুর থেকে বোঝা যায় না। ঘরে ফেরার আনন্দে আছে। চোখে যায় না। বোঝা যায়। দিন শেষে প্রিয় মানুষদের প্রতিক্ষায় আছে।

আম্মা রাতের রান্না বসিয়েছে। চুলার আঁচে তার মুখ লাল আর উজ্জল হয়ে আছে। আমি দুর থেকে দেখছি। হঠাৎ সে বুঝে ফেললো। আমার দিকে ঘুরে তাকালো। হেসে দিলো। দিলো কি? বোঝা গেল না। মায়ের হাসি সব সময় ধরা যায় না।

আমার পুত্রের সামনে দাড়ালাম। সবে অপারেশন থিয়েটার থেকে আনা হয়েছে। হাত-পা নাড়ছে। একজন নতুন মানুষ! পৃথিবীতে এসেছে। আমার ঘরে এসেছে। আমি স্পর্শ করলাম। কেমন শান্তির মতো ঠান্ডা ঠান্ডা গা। হাত শির শির করছিলো। স্পষ্ট মনে আছে।

“Is this the real life?
Is this just fantasy?”

বারোয়ারী এ জীবন। ভীড়ে ভরা এ জীবন। অন্য কন্ঠ আর অন্য দৃষ্টির সামনে এ জীবন। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই একা হওয়া যায়। একা একা হাঁটা যায়। খালি পায়ে। ভেজা মাটিতে।

জীবনের প্রতিটা দিন দিয়ে দিতে হয় না। প্রতিটা মুহুর্ত শেয়ার করতে হয় না। প্রতিটা সেকেন্ড ভরিয়ে ফেলতে হয় না। খালি রাখতে হয়। নিজের জন্য কিছু রাখতে হয়। না-ভাবার জন্য কিছু রাখতে হয়। চোখ বন্ধ করে নিজেকেই নিজে দেখার জন্য কিছু রাখতে হয়।

নাহলে একদিন নি:স্ব হয়ে যেতে হয়।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে