একুরিয়াম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাদিকুর রহমান পরাগ

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

মোটরের আওয়াজ ঘুমাতে দেয় না। অক্সিজেনের জন্য একটা ফিল্টার আছে। ওটা চালাতে মোটরটা লাগে।
ওহো, আসল কথাটাই বলা হয়নি। আমি আছি একটা একুরিয়ামের ভেতর। আর মাছগুলো একুরিয়ামের বাইরে মানে আমি যে ঘরটায় থাকতাম সেখানে।
এই ঘটনা কবে ঘটলো কিংবা কখন ঘটলো, সে আমার জানা নাই। আমার কোন অতীত মনে পড়ে না। আসলে অতীত বলে কিছু ছিল কীনা তাও জানি না। আমার আছে শুধু বর্তমান। বর্তমানের মধ্যেই আমার বাস। তাই যা ঘটে যায়, সেটি পরে আর মনে থাকে না।
একুরিয়ামের উপর একটা ঢাকনি আছে। বাইরে থেকে বন্ধ। চেষ্টা করেছি, তবে বের হতে পারিনি।
অগত্যা মেনে নিতে হয়েছে এ-জীবন। এখন আমি আর মাছ দেখি না, মাছরাই আমাকে দেখে। আমার দেহের তুলনায় একুরিয়ামটা ছোট। হাত-পা মেলে ধরা যায় না। শরীরটাকে কায়দা করে বাকিয়ে রাখতে হয়।
একুরিয়ামের পানি সাপ্লাইয়ের। তাই নাকে একটু গন্ধ গন্ধ লাগে। তারপরও এর মধ্যে বাস করতে শিখে গেছি। কানকুয়া ছাড়াই বেশ শ্বাস নিতে পারি। নাকে-মুখে জল ঢুকলেও কোন অসুবিধা হয় না। মাঝে মাঝে কারেন্ট চলে যায়। তখন একটু-আধটু অসুবিধা হয় বৈকি। দম কেমন আটকে আসে। কীভাবে এসব সম্ভব হচ্ছে আমার মাথায় কিছুই ঢুকে না। তবে সব কিছুতেই মানিয়ে নেওয়ার একটা অভ্যাস হয়ে গেছে।
এঞ্জেল ফিশ, গোল্ড ফিশ, মলি, টাইগার বার্ব, সাকার, গাপ্পি, নিওন টেটরা, অসকার, কিলিফিশ, , ব্ল-গোরামি, কমেট, রেইনবো ফিশ, ক্যাটফিশ – নানান রকমের রংবেরং-য়ের মাছ। ঘুরে বেড়ায় আমার ঘর জুড়ে। একুরিয়ামের বাইরে কোন জল নেই। জল ছাড়াই মাছগুলো দিব্যি বেঁচে আছে। বাতাসে ওরা কী সুন্দর ঘুরে বেড়ায়। ঘুরে ঘুরে কাছে আসে। একুরিয়ামের ভেতর আমাকে দেখে। ওদের চোখে করুণার দৃষ্টি। আমিও ওদের দেখি নির্বোধ দৃষ্টিতে।
আমাকে দেখে হয়তো ওদের সময় কেটে যায়। ওদের দেখে আমারও সময় কেটে যায়।
একটা এঞ্জেল ফিশ প্রতিদিন এসে আমাকে দেখে যায়। একুরিয়াম বন্দি আমাকে দেখে হয়তো তার মায়া কিংবা করুণা হয়। হয়তো করুণাবশতঃই সে আমার সঙ্গে কথা বলে। কথায় কথায় আমি ওর কাছে জানতে চাই আমার এই একুরিয়াম বাসের কারণ সে জানে কিনা। কারণটা সে-ও ভালোভাবে জানে না। তবে উড়ো কথায় সে শুনেছে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই, সহিত্বের বড়াই নাকি পৃথিবীর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে-ই নাকি মানুষকে একুরিয়ামে রাখা হয়েছে।
বলে কী?
ওর কথা শুনে আমি অবাক হই। তবে কথাটা তো খুব একটা ভুলও বলেনি। সভ্যতার নামে মানুষ-ই তো প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে চলেছে। মাছের কথার জেরে মাথায় চিন্তার ঝড়। ভাবতে থাকি, কেমন গোলমেলে একটা পৃথিবী তৈরি করেছে মানুষ। ভাবতে থাকি, কবে থেকে পৃথিবীটা এমন গোলমেলে হলো। ভাবতে থাকি, পৃথিবীটা কি বরাবর-ই এ রকম গোলমেলে ছিলো? ভাবতে থাকি, ভাবতে থাকি…শুধু ভাবতেই থাকি। ভাবনার আর কোন উত্তর মেলে না।
মাঝে মাঝে একটা পাখি আসতো। ও এসে বসতো একুরিয়ামের উপর। অল্পদিনে ওর সঙ্গে আমার ভাব হয়ে যায়। ও এলে-ই আমার মন ভালো হয়ে যেতো। তার সঙ্গে কথা বলে সময় যে কোন দিক দিয়ে বয়ে যেতো টের-ই পেতাম না। দেশ-বিদেশের নানা রকম গল্প বলতো সে। আর কত যে গল্প, সে জানতো! বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে এইসব গল্প সংগ্রহ করতো সে। আমি ওর নাম দিয়েছিলাম কিচ্ছা পাখি। গানও গাইতে পারতো কিচ্ছা পাখি। আহা! কী সুন্দর সেই গান। এভাবেই আমি কিচ্ছা পাখির চোখে পৃথিবীকে দেখতে শুরু করলাম।
কিছুদিন থেকে না-বলে উধাও হয়ে যেত কিচ্ছা পাখি। আবার হঠাৎ এসে হাজির। এভাবে আসা যাওয়ার মধ্যে থাকতো সে। এ-রকম একবার গিয়ে সে আর ফিরে আসে না। আমি তার প্রতীক্ষায় থাকি। কিন্তু কিচ্ছা পাখি আর ফিরে  আসে না। আমি তবুও প্রতীক্ষায় থাকি।
এঞ্জেল ফিশটা একদিন এসে জানালো যে কিচ্ছা পাখি আর কোনদিন আসবে না। কালবৃক্ষের কাছে সে শুনেছে পাখিটা নাকি মারা গেছে কোন এক শিকারির গুলিতে। আমার মনে হলো আমি যেন দৃষ্টি হারালাম। আমি যেন অন্ধ হয়ে গেলাম।  
কালবৃক্ষের কথা তো বলা হয় নাই। একুরিয়ামের বাইরে ঘরের ভেতরে একটা গাছ আছে। ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে গাছটা। অই গাছটার নাম কাল বৃক্ষ। মাছেরা বলাবলি করে, সৃষ্টির আদি থেকেই নাকি আছে এই বৃক্ষ। এর পাতায় পাতায় লেখা আছে সৃষ্টির ইতিহাস। এমনও জনশ্রুতি রয়েছে যে রাজা যায়-রাজা আসে, দিন যায়-দিন আসে, কিন্তু কালবৃক্ষ একই রয়ে যায়।
অথচ সেই কালবৃক্ষটিও এখন ধুঁকছে যক্ষারোগীর মতো। বাতাসে সীসার প্রতাপ। দিনের আলোতেও আকাশ ধূসর। পাতাগুলো হারিয়েছে সবুজ পেলবতা। বিবর্ণ পাতার ক্লোরোফিল আগের মতো সূর্যের আলো ভেঙ্গে শক্তি তৈরি করতে পারে পারে না। ফলে ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়েছে কালবৃক্ষ।
মাঝে মাঝে পিরানহা, সিলভার শার্ক, টাইগার শার্ক, অ্যারোনায়া, আফ্রিকান মাগুরের মতো রাক্ষুসে মাছও এসে উঁকি মারে। তখন ছোট ছোট মাছগুলো কালবৃক্ষের কাছে দৌড়ে যায়। পাতারা আড়াল করে রাখে ভয়ার্ত মাছগুলোকে। কিছু মাছ আবার লুকোয় বৃক্ষের খোড়লের মধ্যে। কখনো-সখনো দুয়েকটা ধরাও পড়ে। অসহায় মাছগুলোর জন্য আমার খুব খারাপ লাগে।  এভাবেই কেটে যাচ্ছিলো আমার একুরিয়াম-জীবন। হঠাৎ একদিন ছন্দপতন ঘটে। ঘুম ভেঙ্গে দেখি বাইরে ধ্বংসযজ্ঞ। ভেসে যাচ্ছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সব। মরে পড়ে আছে সব মাছগুলো। কারা যেন মেরে ফেলেছে।
কান্নায় আমার গলা ধরে আসে। কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে।
কারা? কারা এই পাষণ্ড? কারা এই সুন্দর নিষ্পাপ মাছগুলোকে মেরে ফেলতে পারলো?
দেশ-বিদেশের নিউজ মিডিয়া ভীড় করে। তুমুল প্রতিযোগিতা রক্ত মাড়িয়ে কে, কার আগে লাইভে খবর দিবে, কে আর আগে ব্রেকিং দিবে। তুমুল প্রতিযোগিতা বীভৎসতা তুলে ধরার। সবাই যেন উৎসবের একটা উপলক্ষ খুঁজছিল। আর মাছগুলোর এই নির্মম মৃত্যু হয়ে ওঠে তাদের উৎসবের উপলক্ষ।
এর মধ্যে অশ্লীলভাবে সাইরেন বাজিয়ে এসে হাজির চারটে তাসের টেক্কা। টেক্কাগুলোতে কোন রাজার ছবি নাই। একটাতে আছে পাদ্রি, একটা ইমাম, একটাতে পুরোহিত আর একটাতে বৌদ্ধ ভিক্ষুর ছবি।
টেক্কাদের দেখে চারিদিকে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। সবাই সরে গিয়ে ওদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়। মরা মাছগুলোকে চার ভাগ করা হয়। তারপর টেক্কারা একেক জন একেক ভাগ নিয়ে চলে যায়।
মাছগুলো মরে যাবার পর বদলে যায় বাইরের দৃশ্যপট। ঘরটি আর নাই। তবে পথের ধারে ধূঁকতে থাকা কালবৃক্ষটি এখনো আছে। বদলে গেছে তার পাতার রং। পাতাগুলো এখন রক্তবর্ণ।
খোলা আকাশের নীচে একটা বিরান পথের উপরে পড়ে থাকে একুরিয়ামটি। অন্তহীন পথটি জুড়ে নিঃসীম শূন্যতা। আর সেই শূন্যতায় একুরিয়ামের ভেতরে আমি। এক সময় স্বপ্ন দেখতাম একুরিয়াম থেকে বের হবার। এখন আর দেখি না। বাইরের দুনিয়াতে আমার আর বের হতে ইচ্ছে করে না। যত দিন যায়, ততই আমি গুটিয়ে যাই একুরিয়ামের ভেতর…।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]