এক কাপ চা

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

ওমর ফারুক দোলা

ওমর ফারুক দোলা

দূরের স্ট্রীট লাইটের আলোয় দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলা ব্যক্তিকে ছায়ার মতো মনে হচ্ছে। ছায়াটাকে পরিচিত মনে হওয়ায় একদৃষ্টিতে চেয়ে আছি! এক পা দু ‘পা করে যখন চলমান ছায়াটা কাছে আসে, তখন বুঝতে পারলাম আমার অনুমান ভুল নয়। হ্যাঁ, তিনি সঞ্জীব দা। উনাকে কেমন জানি ইতস্তত মনে হচ্ছে। এলোমেলো চুল, দু ‘চোখে রাজ্যের ভয়। ডানহাত দিয়ে চেপে রেখেছেন বামহাতের উপরের অংশ। মাঝেমধ্যে আলতোভাবে ম্যাসাজ করছেন। বাংলামটর মোড়ের দোকানগুলোর ঝলমলে আলোর কাছে আসতেই দাদার কাছে গিয়ে সালাম দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম ‘ কেমন আছেন ‘?
তিনি হকচকিয়ে উঠলেন। যেন কোনো শংকিত সাধকের. ধ্যান ভাঙলো। কপালের রেখা বলে দিচ্ছে তিনি এই নগন্য পুলিশ অফিসারকে চেনেন না।

ভোরের কাগজের পাঠক ফোরাম যখন হৃদয়ের মধ্যমণিতে তখন প্রায়ই হৃদয়ের টানে (সঞ্জীব দা’র
ভাষায় – নাড়ির টানে!) সেই ময়মনসিংহ থেকে চলে আসতাম বাংলামটর ভোরের কাগজ অফিসে। সেখানকার গল্প বা আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন ঝাঁকড়া চুলের একজন মানুষ। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে দিতেন লেখালেখির অমূল্য টিপস্। যা উঠতি লেখকদের ভীষণরকম কাজে আসতো। মাঝে মাঝে টেবিলটাকে তবলা বানিয়ে দরাজ গলায় গেয়ে উঠতেন তিনি। আহা, কী জাদুমাখা কন্ঠ! বন্ধু আতিক দর্জির কাছে জানতে পারি, তিনি সঞ্জীব চৌধুরী।
পত্রিকার সঙ্গে পাঠকদের যে সম্পৃক্ত করা যায়, পত্রিকার পাতায় পাঠকের প্রতিভাকে বের করে আনা যায় এগুলো তাঁরই মস্তিষ্ক প্রসূত আইডিয়া। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় ভোরের কাগজের ‘মেলা’ পাতার ফিচারগুলো পেয়েছিল ভিন্নমাত্রা। তুখোড় মেধাবী এ মানুষটি প্রিন্ট মিডিয়াকে ভালোবেসে অনেক লাভজনক চাকরির প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

তারপর কিছুদিনের গ্যাপ। পড়ালেখার ব্যস্ততার কারণে খুব একটা ঢাকামুখো হইনি। একদিন বিটিভির ‘ইত্যাদি ‘ অনুষ্ঠানে তাঁর সেই বিখ্যাত গানটি প্রচারিত হয়। “গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে…”! গায়ক সঞ্জীব দা ‘কে দেখে আমি আপ্লুত হই। মনে হয়েছে টিভি পর্দায় যেন আমার যেন আমার খুব কাছের একজন মানুযকে দেখছি। পরবর্তীতে তাঁর ‘দলছুট ‘ ব্যান্ড গঠন, যায়যায়দিনে যোগদান সবই শুনেছি দূর থেকে। আজ এভাবে সঞ্জীব দা ‘কে পেয়ে যাবো তা স্বপ্নেও ভাবিনি। দিনক্ষণ মনে নেই। তবে সময়টা ২০০৭সালের জুলাইয়ের কোনো একদিন।sanjib

“দাদা, আমাকে আপনি হয়তো চিনবেন না। আমি একসময় ভোরের কাগজ পাঠক ফোরামে যুক্ত ছিলাম। আপনার সম্পাদিত ‘মেলা ‘ পাতাতেও লিখেছি। ইদানিং আপনার গান শুনে মুগ্ধ হই। আমি আপনাকে চিনি। ”
আমার কথা শেষ হলে তিনি তাঁর মোবাইল ফোন, টাকাপয়সা সব ছিনতাই হওয়ার কথা জানান। ছিনতাইকারীদের সাথে ধস্তাধস্তিতে বাম হাতের কনুইয়ের দিকে কিছুটা কেটে গেছে। আমাকে কেটে যাওয়ার জায়গাটা দেখাতে গিয়ে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠেন। এ অবস্থায় রাস্তার পাশের চায়ের দোকান থেকে একটা টোল এনে তাঁকে বসতে দিই। আমি তাঁকে বাইকে নিয়ে ছিনতাইকৃত স্থানে যেতে চাইলে তিনি বাধা দেন। বলেন “এতক্ষণে ওরা হয়তো কেটে পড়েছে। ”
পরক্ষণেই অবুঝ শিশুর মতো বলে উঠেন, “আমিও সহজে ছাড়িনি। ওরা সংখ্যায় চার পাঁচজন না হলে দেখিয়ে দিতাম।”
চলুন আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিই।
না, না আপনি ডিউটি করছেন।
মাত্র আমার ডিউটি শেষ হয়েছে। পরের শিফটের অফিসার ফোর্স এসে গেছে। এখন আমার বিদায়ের সময়।
তবুও। আপনাদের ট্রাফিক ডিউটি যে কতো পরিশ্রমের তা বুঝি। আপনি বরং আমাকে একটা সিএনজি ঠিক করে দিন। সঞ্জীব দা ‘র চোখে শংকার ছাপ দেখে বলি, “এতো রাতে অটোরিক্সা বা ট্যাক্সি পাওয়া খুবই কঠিন
অনেক বলার পর আমার বাইকে চড়ে বাসায় যেতে তিনি রাজি হন।

বাসায় কলিং বেল বাজতেই উপর তলা থেকে দাদার একমাত্র মেয়ে কিংবদন্তীকে কোলে নিয়ে এসে বৌদি গেইট খুলেন। দাদাকে দেখে উৎকন্ঠিত হয়ে দাদার মোবাইল ফোন বন্ধের কারণ জানতে চান। দাদা সব ঘটনার বিবরণ দিতে থাকেন।
বৌদি আমাকে চা খাওয়ার জন্য ভেতরে যেতে বলেন। সঞ্জীব দা-ও চা খাওয়ার জন্য পিড়াপিড়ি করেন।
: দাদা, বাসা তো চিনে গেলাম। অন্য সময় এসে খেয়ে যাব। এখন চা খেলে রাতের খাবারে অরুচি চলে আসবে। বলেই বিদায় নিই।
এর দুদিন পর সঞ্জীব দা ফোন করে আবারও চায়ের কথা মনে করিয়ে দেন। আমার কাজের ব্যস্ততায় যাওয়া হয়নি।
আজ তিনি বেঁচে নেই। এটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এমন হওয়ার তো কথা ছিলো না।
সঞ্জীব দা, আমাদের কাঁদিয়ে এভাবে চলে যেতে পারলেন?
আপনার নতুন গান আর কোনোদিন শুনতে পারবো না ভাবলে এতো বিমর্ষ লাগে কেন?
আমাকে এককাপ চা পাওনা রেখে আপনি এভাবে চলে যেতে পারলেন?