এক জীবনে সবকিছু বুঝতে পারাটা খুব জরুরি কিছু নয়

ডা. এম আল মামুন

(আল-ওয়াজ, তাবুক থেকে): বসে আছি সমুদ্র সৈকতে। চোখের সামনে দু’হাত দূরেই সাগরের স্বচ্ছ জল। শান্ত সাগর। এই সাগরের জল লাল নয়, তবুও এটির নাম লোহিত সাগর। জায়গাটার নাম আল-ওয়াজ। তাবুক প্রদেশের একটি জেলা শহর। এই আরব্য মরুভূমির দেশে ‘জেলা’কে জেলা বলা হয় না, বলা হয় ‘সেক্টর’। আজ সকালে এই সেক্টর শহরে এসেছি। ভ্রমণের উদ্দেশ্য এখানকার প্রধান সরকারী হাসপাতাল পরিদর্শন। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সার্টিফাইড ‘ইনফেকশন কন্ট্রোল অডিটর’ হিসেবে আমাকে এই হাসপাতালটির ইনফেকশন কন্ট্রোল বিষয়ক অর্ধ-বার্ষিক মুল্যায়নের জন্য এখানে পাঠানো হয়েছে। আমার সফরসঙ্গী আরেকজন জর্ডানিয়ান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আর আমাদের টয়োটা ল্যাণ্ড ক্র্যুজার জীপের সৌদি গাড়িচালক। এই মুহূর্তে আমরা তিনজনই বসে আছি লোহিত সাগরের তীর ঘেষে, বালু আর নূড়িকণার ওপরে ফরাশ বিছিয়ে।

সময়টা শেষ বিকেল। লোহিত সাগরের মিশরপ্রান্তের ওই দূর দিগন্তে হেলে পড়েছে অস্তগামী সূর্য। সমুদ্রের স্বচ্ছ জলে অস্তগামী সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। আমাদের করিৎকর্মা গাড়ীচালক ইতোমধ্যেই ‘ক্যাম্প স্টোভ’ জ্বালিয়ে আরব্য কফি তৈরির আয়োজন করে ফেলেছে। সুমিষ্ট খেজুরে ক্রিম মাখিয়ে খেতে খেতে আরব্য কফির ছোট্ট কাপে চুমুক দেয়ার মজাই আলাদা। আর যদি সেটি হয় সমুদ্র সৈকতে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে, তাহলে তো কথাই নেই। আরবিভাষী জর্ডানি চিকিৎসক আর সৌদি গাড়িচালক নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা বলছে। আমি চুপচাপ তাকিয়ে আছি অস্তগামী সূর্যের দিকে।

সমুদ্র তীরে এলে কেন জানি মনটা খুব স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠে। নিকট কিংবা দূর অতীতের কোনও কোনও প্রিয়মুখ মনের পর্দায় ভেসে ওঠে। সমুদ্রের ওপার থেকে বয়ে আসছে এলেবেলে ঠাণ্ডা বাতাস। এই বাতাস আমাকে করে দিচ্ছে আরও বেশি স্মৃতিকাতর, আরও বেশি এলেমেলো। সেলফোনের এই যুগে চাইলে, মুহূর্তেই যে কোনও প্রিয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। পকেট থেকে আমি সেলফোন বের করি। না, কারও নাম্বারে ডায়াল করি না। কাউকে টেক্সটও পাঠাই না। বরং সেলফোনের ইউটিউব হাতড়ে বের করি সেই প্রিয় গান-
“সাগরের সৈকতে কে যেন দূর হতে
আমারে ডেকে ডেকে যায়…
আয় আয় আয়…
পারি না তবু যেতে শিকল বাঁধা এই দু’টি পায়…।”

এক জীবনে মানুষ সর্বদাই কোনও না কোনও শেকলে বাঁধা থাকে। মাঝে মাঝে মানুষের মধ্যে এই শেকল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার ইচ্ছে খুব প্রবল হয়। একমাত্র হুমায়ুন আহমেদের হিমু কিংবা মিসির আলিই পারে এই শেকল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে। আমার মধ্যে কি আজকাল ‘হিমু’ কিংবা ‘মিসির আলি’ ভাব প্রবল হচ্ছে? আমি বুঝতে পারি না।

এক জীবনে সবকিছু বুঝতে পারাটা খুব জরুরি কিছু নয়।

 

লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ছবি: লেখকের সেলফোনে ধারণকৃত ও গুগল।