এক টুকরো বাংলাদেশ  আমরা আমাদের হৃদয়ে বহন করি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.সেলিম জাহান

( লন্ডন থেকে): গত ৩০শে জুন লন্ডনে বসেছিলো বৈশাখী মেলা। প্রতি বছরের মতো ২০১৯ এর মেলাও ছিল বর্ণাঢ্য। লন্ডনের বৈশাখী মেলা শুধু তো মেলা নয়, এ ছিল বাঙ্গালীর মিলনক্ষেত্র, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অঙ্গীকার, মানবতার এক প্রতীক। বাংলাদেশের বাইরে বাংলা সংস্কৃতির এতো বড় সমাবেশ আর নেই। গতবারেই এ অনুষ্ঠানে আমি প্রথম যোগ দিয়েছিলাম এবং অভিভূত হয়েছিলাম।

লন্ডন মহিলা পুলিশ শাড়ী পরিহিতা কলসী কাঁখে

লন্ডনের এবারের বৈশাখী মেলার পাঁচটি বৈশিষ্ট্য আমার দৃষ্টি কেড়েছে। প্রথমত: প্রায় দু’দশক আগে শুরু করা ক্ষুদ্র এক প্রচেষ্টা আজ এক বিরাট আনন্দযজ্ঞের মহীরুহে পরিনত হয়েছে।শুধুমাত্র মেলায় দর্শক ও অংশগ্রহনকারীদের ব্যাপ্তিতে এবং বৈচিত্র্যে এ মেলা পেয়েছে এক ঈর্ষনীয় স্বকীয়তা। দ্বিতীয়ত: লন্ডনের বৈশাখী মেলায় শুধুমাত্র বাঙ্গালীরা আসেন না, বিদেশীদের উপস্হিতিও সেখানে লক্ষ্যনীয়, আসেন সেখানে বিদেশীরাও। সে পরিপ্রেক্ষিতে এ মেলা একটি বহুমাত্রিক স্বত্ত্বা লাভ করেছে।

তৃতীয়ত: এ মেলা তো শুধু একটি সন্মিলনী নয়, এ হচ্ছে এক মিলনমেলা। এ মেলা কোন বিশেষ ধর্মগোষ্ঠীর নয়, নয় কোন বিশেষ জাতি বা ভাষাভাষীর, এ মেলা সার্বজনীন। এ মেলায় মিলিত হচ্ছেন বৃহত্তর পরিবারের সদস্যেরা, মিলিত মিলিত হচ্ছে বন্ধু- পরিচিতেরা। এ মিলনমেলায় শিশু- কিশোরদের উপস্হিতি এবং তাদের কার্যক্রম লক্ষ্যনীয়। ‘দেবে আর নেবে, মিলিবে, মেলাবে, এই যেন মনে হয়, এ মেলার মূলমন্ত্র’। চতুর্থত: বৈশাখী মেলার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে প্রবাসে বাঙ্লা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে জিইয়ে রাখা। তাই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে, রঙ্গীন উজ্জ্বল পোশাক পরিধানের মাধ্যমে, নানান ছবি, নকশা তৈরীর মাধ্যমে এ ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়, বিশেষত: নতুন প্রজন্মের কাছে। পঞ্চমত: লন্ডনের বৈশাখী মেলা এখন মূলধারায় চলে এসেছে, লাভ করেছে স্হানীয় প্রশাসনের সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে এ মেলার গ্রহনযোগ্যতা ও বজায়ক্ষমতা বেড়ে গেছে বহুগুন।

লন্ডন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সদস্যদের সঙ্গে

লন্ডনের বৈশাখী মেলার মূল আকর্ষণ হচ্ছে নানান অনুষ্ঠান। সারাদিনব্যপী একই সঙ্গে চলে নানান কার্যক্রম। বিশাল মেলা প্রাঙ্গনের একদিকে যখন চলছে কবিতা পাঠ, অন্য কোনে তখন চলছে শিশুদের জন্যে নানান খেলা ও গল্পপাঠ। মূল মঞ্চে সারাদিন ধরে চলে নানান গোষ্ঠীর আয়োজিত বাংলাদেশের গান। তারমধ্যে ভিড় জমে যায় বিদেশিনীদের শাড়ী পড়ার প্রশিক্ষন। বৃটেনের কর্তব্যরত মহিলা পুলিশও তা থেকে বাদ পড়ছেন না। তারই মধ্যে পড়ে গেছে মাঠের নানান কোনে কিশোরদের ক্রিকেট খেলার ধূম। হবেই বা না কেন? বিশ্বকাপ চলছে যে। আর সবকিছু ছাপিয়ে চোখে পড়ে নানান রকমের দেশী-বিদেশী খাবারের ব্যবস্হা।

২০১৯ লন্ডন বৈশাখী মেলায় অংশগ্রহন করেছি British-Bangladeshi Poetry Collective এর একটি অনুষ্ঠানে – ‘শেকসপীয়ারের অনুবাদ’। এ প্রতিষ্ঠানটি সুধীজনের দৃষ্টি কেড়েছে তাদের কার্যক্রমের দ্বারা। বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ কবিদের কাজ এবং সেই সঙ্গে বাংলা কবিতার ইংরেজী অনুবাদকে ইংরেজ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজে প্রতিষ্ঠানটি নিরন্তর সচেষ্ট। এরই মধ্যে এরা বিট্রিশ বাংলাদেশী কবিদের একটি কাব্যসঙ্কলন প্রকাশ করেছে। শেকশপীয়ারের অনুবাদ প্রসঙ্গে মনে পড়ল, বিলেতেরই আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘Diaspora Shakespeare’ উদ্যোগে করা হয়েছিলো শেকসপীয়ারের ‘Taming of the Shrew’ এর সিলেটি অনুবাদ।

পল, সেইফ ও শামীম শিশুদের গল্প বলার অনুষ্ঠানে

আমার অতি প্রিয়জন ফারাহ নাজের উপস্হাপনায় ‘শেকসপীয়ারের অনুবাদ’ শীর্ষক আলোচনায় আমার সঙ্গে কথা বলেছে মানসী কায়েস – আমার পরম স্নেহভাজন প্রয়াত রাষ্ট্রদূত মিজারুল কায়েসের কন্যা এবং আমার এককালের শিক্ষার্থী আজকের অধ্যাপক শাকিল কায়েসের ভ্রাতুষ্পুত্রী। বহু শ্রোতা-দর্শকের উপস্হিতিতে ভারী প্রানবন্ত একটি আলোচনা সঞ্চালন করল মানসী – তার বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন এবং স্বত:স্ফূর্ততায় আমি মুগ্ধ। কিন্তু যতবারই আমি মানসীর দিকে তাকিয়েছি, ততবারই আমার মনের আরশীতে ভেসে উঠেছে মিজারুলের মুখ!

আনন্দের ভাগেএ কমতি পড়ে নি কেন। দেখা হয়েছে বহু জনের সঙ্গে, যার মধ্যে ঢাকা থেকে আগত রুবাইয়াৎ ফেরদৌস, লাভলী দেব ও পুনম প্রিয়াও আছেন। খুব মিষ্টি সময় কেটেছে লন্ডন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সদস্যদের সঙ্গে। এরা সবাই আমার স্নেহভাজন। নাচ-গান, খাওয়া-দাওয়া আর ছবি তোলার কমতি ছিল না তাদের সঙ্গে।

পড়ন্ত বিকেলে যখন মেলা ভাঙ্গল, তখন চারদিকে মানুষের স্রোত দেখে কি যে ভালো লাগছিলো। নানান রঙ্গীন পোশাকে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছিলো শিশুর দল, অট্টহাসিতে চারদিক মুখরিত করে দ্রুত হাঁটছিলো তরুন-তরুনীরা, মৃদু পায়ে গল্প করতে করতে এগুচ্ছিলেন প্রৌঢ়-বৃদ্ধেরা। চারদিকে বাংলা কথা, চটুল গান আর আনন্দ। দেখতে দেখতে মনে হলো, প্রবাসী এ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে, কে বলেছে? এর প্রতিটি মানুষের ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ – যেখানেই থাকি, এক টুকরো বাংলাদেশ তো আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের হৃদয়ে বহন করি

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]