এক টুকরো স্বর্গ দর্শন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নার্গিস আক্তার

এক শীতভোরে সূর্য উঠারও আগে আমরা লামার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। লং ড্রাইভ। আমি, এক বোন (ননাস)আর ভাগ্নিসহ তিনজনের গ্রুপ। সঙ্গে চালক তো আছেই। লামার নৈসর্গিক সৌন্দর্য দেখবার বাসনা আমাদের অনেকদিনের। সে বাসনা পূর্ণ হ’তে চলেছে, তাই ভিতরে বাহিরে বইছে আনন্দের ঝর্নাধারা! ভোরবেলা ঢাকার ফাঁকা পথ পার হ’বার খানিকক্ষণ পরেই পুব আকাশ আলোকিত করে সূর্য উঠি উঠি করছে।

কুমিল্লার মিয়ামি রেস্টুরেন্টে নাস্তা খেয়ে আবার শুরু হলো পথচলা। দীর্ঘ পথ। চলছি তো চলছিই। অচেনা পথের দিক নির্দেশনা দিচ্ছিল জিপিএস ম্যাপ। চাটগাঁ হয়ে চকোরিয়া ঘেষেই লামা যাবার পথ। যখন লামায় পৌঁছেছি তখন বিকেল প্রায়। “ছায়া ঘনাইছে বনে বনে”..। স্বর্গের প্রবেশ পথ কেমন জানা নেই কিন্তু এ পথে প্রবেশের পর মনে হচ্ছিলো আমরা স্বর্গেই যাচ্ছি। কিন্তু পথের মাঝে পথ হারিয়ে চ’লে গেছি অন্য পথে। অনেকদূর চলে যাবার পরও পথের শেষ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যেনো অনন্ত যাত্রা। ‘সজল মেঘের ছায়া ঘনাইছে বনে বনে পথ হারানোর বাজিছে বেদনা সমীরণে’… সময় কিছুটা বেশি লাগলেও আক্ষেপ ছিলো না মোটেই; কেননা ভুল পথটা ছিলো অসাধারণ!

লামায় রাত্রি যাপনের জন্য তেমন কোনো হোটেল অথবা রিসোর্ট নেই। আমরা কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের গেস্ট হাউসেই থাকবো, ঢাকা থেকে সেভাবেই বুকিং দিয়ে গেছিলাম। সূর্য ডোবার ঠিক আগ মুহুর্তে আমরা গেস্ট হাউসে পৌঁছালাম। সবকিছু মিলিয়ে বিশাল ক্যাম্পাস। থাকা-খাওয়ার সাধারণ ব্যবস্থাই অসাধারণ মনে হলো। একেবারেই অন্যরকম। আমরা খুব উচ্ছসিত হলাম, বিষ্মিতও হয়েছি বৈচিত্র্যময়তা দেখে। কেননা এই রাজ্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা স্পষ্ট ছিলো না।

ঢাকা থেকে বড় একটা গ্রুপ সে সময় গিয়েছিলো সাফারি কোয়ান্টামে। ঘোরাঘুরিতে আমরাও তাদের সঙ্গী হলাম। প্রথমদিন নারী-পুরুষ আলাদা করে দুটো গ্রুপ করে দেয়া হলো, দুটি আলাদা ঝর্না দেখবার জন্য। প্রথম দিন হাইকিং ট্রেকিং করে পাহাড়ের নীচে ব’য়ে যাওয়া ঝর্নার কাছে গিয়ে সময় কাটানোর অনুভূতি অসামান্য। অবিরাম ঝর্নার পানি পতনের শব্দ ভীষণভাবেই শিহরণ জাগানিয়া।

দ্বিতীয় দিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সাড়ে চার ঘন্টার এক অ্যাডভেঞ্চার। আগ্রহীরাই কেবল এই দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় অংশ নেবেন আয়োজকদের পক্ষ থেকে সে কথাই ব’লে দেয়া হলো। সাহসে ভর করে চলা যাদের স্বভাব, তাদের আর ভয় কী! ভোরবেলা চা বিস্কুট খেয়ে শুরু হলো রোমাঞ্চকর এক অভিযাত্রা। হাইকিং। ট্রেকিং। পাহাড় পেরিয়ে পাহাড়! কখনো উপরে উঠছি, কখনো নামছি নীচে। আবার কিছুটা সমতলও পাচ্ছি। এক পাহাড়ের সঙ্গে আরেক পাহাড়ের সংযুক্ততা যেনো বিনিসূতায় মালা গাঁথার মতো। চলার পথেই মাঝখানে নাস্তা খেলাম তাদের আয়োজনে। দু-আড়াই ঘন্টায় কতো কিছু যে দেখা হলো।

ফেরার পথে মনে হলো কেউ যেনো আমাকে বলছে, “মেঘে মেঘে বেলা কিন্তু বেড়েছে বেশ”! আমি বললাম,তাইতো! পা দুটিও বলছিলো, “শেষবারের মতো পাহাড় পর্বত ঘুরে নাও। আমরা কিন্তু আর পারবো না”। আমি সান্ত্বনা দিলাম পা দুটিকে। বললাম, এবারের মতো ফিরাও মোরে। আর কখনোই তোমাদেরকে এমন ভয়ংকর অ্যাডভেঞ্চারে নিয়ে আসবো না!

একেকটা পাহাড় অতিক্রম করতে গিয়ে সুবীর নন্দীর সেই গানটি মনে জেগেছে, ‘ পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা যাকে ঝর্না বলো”.. অসংখ্য পাহাড়ের বুকে গড়ে উঠা প্রকল্পগুলি যেনো একেকটা বড় বড় ক্ষত! আহা প্রকৃতি! মানুষ এভাবেই তাকে আহত করছে প্রতিদিন। যা হোক, সাড়ে চারঘন্টার অভিযাত্রা শেষ করে রুমে ফিরলাম। পায়ের ওপর দিয়ে কতোটা চাপ গেছে এই দীর্ঘ সময়ের পাহাড় অভিযানে, তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।

এবার বাড়ি ফেরার পালা। ভোরে আবার যাত্রা শুরু করলাম, ঢাকার উদ্দেশ্যে। পাহাড়ঘেরা লামার নৈসর্গিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। পুরো পথটা এতো সুন্দর! এতো সবুজ চারপাশ। এতো মনোরম। এক বিন্দু ক্লান্তিও ভর করেনি এ দীর্ঘ পথযাত্রায়। এঁকেবেঁকে চলা পাহাড়ি নদী মাতামুহুরির পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে গাড়ি। কিছুক্ষণ মুগ্ধতা নিয়ে নদীকে দেখলাম। ছবি তুললাম। আবার গাড়ি চলছে। বিভোর হয়ে আছি অনন্ত মুগ্ধতায়। গান বাজছে। আর আমরা বিমুগ্ধ বিষ্ময় নিয়ে চলছি আঁকা বাঁকা পথ ধ’রে। “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ খেলে যায় রৌদ্রছায়া বর্ষা নামে বসন্ত”…

সঙ্গে ছিলো ফ্লাস্কে চা-কফি। টুকটাক খাবার দাবার। আমাদের ইচ্ছে কোথাও নেমে চা কফি খাবো। দু’ধারে ঘন সবুজে আবৃত পাহাড়। নির্জন স্নিগ্ধ বনভূমি। গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লাম আমরা। ঘাসে চাদর বিছিয়ে বসেছি। আহা! “আমার মুক্তি ধূলায় ধূলায়, ঘাসে ঘাসে’…

আয়েশ করে চা খেতে শুরু করেছি মাত্র তখন দেখছি একটা বাইক আসছে, দুজন লোক আমাদের দিকে ইশারা করে কী যেনো বলছে! কাছে আসতেই বুঝলাম তারা বলছে, এ পথে মামা আসা যাওয়া করে। গাড়িতে উঠে যান। ভয়ে হুড়মুড় করে গাড়িতে উঠে বসলাম আমরা। গাড়ি ছাড়ার পর দেখলাম একটা সাইনবোর্ড। লেখা আছে, “সাবধানে চলুন। হাতি চলাচলের পথ’। সে যাত্রায় হাতি মামার হাত থেকে রক্ষা পেলাম।

দু-ধারে সবুজ পাহাড়। মাঝখান দিয়ে এঁকে বেঁকে ছুটছে গাড়ি; বিপুলা পৃথিবীর এক টুকরো স্বর্গের ভিতর দিয়ে!

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]