এক পরীর জন্মকথা…

শেখ রানা

শেখ রানা

(এডিনবার্গ, ইউ.কে থেকে ): ‘পরী’ গানটা আমি লিখেছিলাম নাটোরে বসে। সে এক অদ্ভুত সময় আমার জীবনে। বই খাতা বাদ দিয়ে কবিতায় আনন্দ খুঁজি। গীতিকার হব-এতটুকুই জানি। আগে পরে কিচ্ছু জানিনা, বুঝি না, বুঝতে চাইও না। ভেতরের কথাগুলো কারো কাছে বলে নির্ভার হতে পারিনা, আবার এমন ভাবনাও আসে, ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি আর লিখতে পারছি না! তখন কি হবে?

সেই ওলট-পালোট সময়ে একদিন রিকশায় ঘুরতে ঘুরতে রাজশাহী রেল স্টেশনের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। আমার সাথে অনুজ রুপম। হঠাৎ দেখি দুলকি চালে ট্রেন যায়। গম্ভীর মুখে নেমে আমি ট্রেনের পিছে ছুটি। রুপম খানিক অবাক হয়ে আমার দিকে তাকায়। তারপর সেও আমার পিছে। একসময় আমি ট্রেনে উঠে পড়ি। রুপম আর রাজশাহী দূরে সরে যায় ধীরে।

নাটোরের লালপুরে ঘুরে বেড়াই। ছোট্ট এক চিলতে শহর। এখন ফিরে তাকালে টুকরো কিছু দৃশ্য চোখে ভাসে কেবল। হাইকোর্টের পরিচিত এক আপার বাসায় ডেরা বাঁধি কিছুদিনের জন্য। সাথে ছিল জয় গোস্বামীর কবিতার বই। ততদিনে পাগলী তোর সঙ্গে, ঈশ্বর ও প্রেমিকার কথোপকথন, যদি মেঘ থেকে নামে মৃত্যু সকল গাছ …হৃদয়ঙ্গম করতে শুরু করেছি।

আমার আশে পাশে কিছু দেব-শিশু ঘুরে বেড়ায়। চোখের কালোয় তাকিয়ে দেখি টলটল করছে অপাপবিদ্ধ শৈশব। আমি একজনকে লিটিল এঞ্জেল নাম দেই। একদিন রাতে ব্যালকনিতে বসে, যবাই যখন গভীর ঘুমে, লিখে ফেলি-

আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে
তুমি আনমনে বসে আছো
আকাশপানে দৃষ্টি উদাস, inside b.bangla_3
আমি তোমার জন্য এনে দেব,
মেঘ থেকে বৃষ্টির ঝিরিঝিরি হাওয়া
সে হাওয়ায় ভেসে যাবে তুমি।

জয় গোস্বামীর বই এর একটা সাদা পাতায় লেখা শেষ হয়। প্রথম অন্তরাটুকু পর্যন্ত, মুখ আর অন্তরা না ভেবে।

আমি তোমার জন্য এনে দেব
রোদেলা সে ক্ষণ,
পাখিকে করে দেব তোমার আপনজন
পরী তুমি ভাসবে মেঘের ভাঁজে।

এই পংতিগুলো লিখে অদ্ভুত অনুভুতি হয়। লিটিল এঞ্জেল এর কথা ভাবি। ওর চারপাশে অনেক পাখি ওরাউড়ি করছে আপনজন হয়ে, আর ও খুশিতে হাসছে এমন দৃশ্য কল্পনা করি। বাকিটা আর লেখা হয় না তখন।

রাজশাহী ফিরে আসি। পড়া শেষ না করে ঢাকায় ফিরে যাই। একটু একটু করে গীতিকার হই বা হই না। এই স্টুডিও-ঐ স্টুডিও ঘুরি। কিছু আপনজন পাই আর অনেক ক্লিশে হাসিমুখ আমাকে আপন করার ভান করে। তারপর একদিন ফুসমন্তরে সবকিছু হাওয়ায় মিলায়। আমি দেশান্তরি হই। অন্তরে সুন্দর মুহুর্তগুলো ধরে রাখি।

বছর চলে যায় বিবিধ। ছোট্ট পরী সময়ের নিয়মে বড় হয়ে ওঠে। আয়না আমাকেও বয়সের ত্রিকোনোমিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। একদিন শুনি সেই ছোট্ট পরীর শরীরে কর্কট রোগ বাসা বেঁধেছে। খবরটা শুনে কেমন লাগে আমার! মানুষের ভালোবাসা, অহম, স্বার্থপরতা, একইসাথে মমতা আর স্নেহ-এইসব অনুভূতির পরশে আমি নির্লিপ্ত হয়ে আড়াল থেকে আরো অন্তরালে চলে যাই।

আমার খুব ইচ্ছে করে খুঁজে পেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে বলি, ‘ছোট্ট পরী, চল তোকে আমি তোর শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। আমি আজ সেই অলৌকিক ক্ষমতা পেয়েছি। তুই নির্ভার শৈশবে ছুটে বেড়াবি, আর পাখিরা তোর আপনজন হয়ে আকাশ থেকে নেমে আসবে। তোকে শৈশবে ফিরিয়ে দিয়ে আমি ফিরে আসবো। নিজের ভুলগুলোকেও রেখে আসব হয়ত। ফিরে আসবো অনেক বৈষয়িক হয়ে। কষ্ট দেয়া প্রিয়জনদের ঠিকঠাক পাশ কাটিয়ে হেঁটে বেড়াবো শান্ত মুখে। মন খারাপের গান আর লিখবো না একটাও।’

আমি মন খারাপ করে অন্য লেখায় হাত দেই। ছোট্ট পরীর জন্য, পরী গানটার জন্য, জয় গোস্বামির বই এর সেই সাদা পাতার জন্য আমার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে তবু।

ছবি: লেখক