এখনও চায় হে, এখনও বাড়ি ফিরতে মন চায়

মৌসুমী দাশগুপ্তা

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

ঠিক চৌদ্দ বছর আগে কনকনে ঠান্ডা, ঘোলাটে এক বিকেলে আমি মন খারাপ করে রিজেন্ট পার্কে বসেছিলাম, সাদা শার্ট, কালো ট্রাউজার্স, কালো পাতলা ওভারকোট আর কালো স্কার্ফ মোড়ানো, নিতান্তই রঙবিহীন। সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট দেখে অনেক সময় বাসচালক স্কুলের বাচ্চা ভেবে চাইল্ড টিকেট ধরিয়ে দেয়। তার মাস তিনেক আগে দেশ ছেড়ে একা একা এসেছি। পুর্ব লন্ডনের একটি বাড়িতে গাদাগাদি করে আরও অনেক ডাক্তারের সাথে থাকি, টাকাপয়সার হিসেব ঠিকমত করে উঠতে পারি না বলে প্রায়ই এক দিদির বকুনি খাই, তিনি অবশ্য আদর ও করতেন খুব। সেই ঠান্ডা, মার্চের কোন এক দিনে ভীষণ ভয়ে ভয়ে গ্রেট পোর্টল্যান্ড স্ট্রিটে এসেছি জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিলের শেষ পরীক্ষাটি দিতে। পরীক্ষা শেষে মনে হচ্ছে কিচ্ছু হয়নি, ফেল করব ঠিক। মন খারাপ নিয়ে বেরিয়ে পায়ে পায়ে রিজেন্ট পার্কে এসে চুপচাপ বসেছিলাম অনেকক্ষণ। মন চাইছিল সব ছেড়েছুড়ে বাড়ি চলে যাই। কিন্তু too proud to quit বলে যেতে পারছি না। পার্কটা দেখতে সেদিন একটুও ভাল লাগেনি।

পরে কয়েকবার এসেছি বিশাল এই সবুজের মাঝে, পুরোটা হেঁটে ঘুরতে প্রায় আধ বেলা চলে যায়। ইদানিং মাঝেমধ্যে Royal College of Physicians এ আসা হয়, তাদের ভবনটিও রিজেন্ট পার্কের কোল ঘেঁষে। এখানে আসলেই রিজেন্ট পার্ক আমাকে আয় আয় করে ডাকতে থাকে। মধ্যাহ্নবিরতিতে সবাই যখন সুস্বাদু সব খাবার আর কফিতে ব্যস্ত থাকে, আমি তখন চুপিসারে বেরিয়ে রিজেন্ট পার্কে ঢুকে পড়ি।

এবার বসন্ত অনেক আগেই এসেছে, দুপুর বেলায় বেশ চড়া রোদ। ভাল আবহাওয়া পেয়ে ফুল গাছগুলোও রূপের ডালি মেলে দিয়েছে। পার্কটা ঝিকমিক করে বলে, ‘এখনও কি বাড়ি চলে যেতে মন চায়?’ আমি তার ফোয়ারার পাশে পা ছড়িয়ে বসে বলি, ‘এখনও চায় হে, এখনও বাড়ি ফিরতে মন চায়। তুমি না হয় রঙ বদলে ঝলমলে হয়ে উঠেছ, আমি তো এখনও সেই সাদা কালোতেই রয়ে গেছি…’।

ছবি: লেখক