এখন সহস্র নক্ষত্রের ভীড়ে আপনিও একজন…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবিদা নাসরীন কলি

খুব কি ক্ষতি ছিলো

আপনাকে কাছে টেনে না নিলে?

পৃথিবী রোষ কাটিয়ে সুন্দর হতো

আপনি থাকতেন একজন হয়ে

আমাদের মাঝে।

কিছুই কি পৌছেনা তোমার কাছে?

অনেক তো ছোট ছোট চাওয়া

সেটুকু দিতেও কেনো কার্পণ্য ঈশ্বর?

পৃথিবীর সংকটকাল। প্রতিদিন জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কতো সুহৃদ-স্বজন।এমনি মন খারাপের খবর দিয়ে শুরু হয় আমাদের প্রতিদিন।ক্ষরণ বেড়েই চলছে। তারপরও আপনার মৃত্যু মুহুর্তের জন্য হলেও আমাকে স্বার্থপর করে দেয়।ভুলেই যাই কত হাজার- লক্ষ মৃত্যুর ভেতর দাঁড়িয়ে আমরা। সব মৃত্যুই কি  সমান কষ্টের হয়? হয় না।

আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি কখনো।তবুও অনেক স্মৃতি আপনাকে ঘিরে। সিলভারস্ক্রিনে আপনাকে দেখতাম। সে সব স্মৃতির একেকটা গন্ধ একেক রকমের। একেক রঙের। আসলেই কি আপনি অভিনয় করতেন নাকি বোকা বানাতেন আমাদের ??? সব চরিত্রেই একেকজন আপনি কতোটা সজীব! আমি আপনাকে দেখতাম। কোথায় অভিনয়! এ যে আপনিই। এতো দেখেও আরও দেখতে চাইতাম অনেক চরিত্রের মধ্যে আপনাকে। তাইতো ঈশ্বরের কাছে ছোট্ট চাওয়া ছিলো আপনার জীবনটা আরেকটু বড় হোক। কতো মানুষ হৃদয়ে আপনার জন্য ভালোবাসা আগলে রেখেছিলো ছিলো আপনি কি জানতেন ?

দু’বছর আগেই জেনেছিলাম কর্কট রোগ বসত করেছে আপনার শরীরে।

স্ত্রী সুতপার সঙ্গে

সেদিনও এতোটাই মনখারাপের দিন ছিলো। তবে আপনার মুখ থেকেই  শুনেছিলাম ‘কখনো কখনো এমন ঘটে আচমকা এক ধাক্কায় ঘুম ভেঙে যায়।গত কয়েকটা দিন ধরে আমার জীবনে এমনই ঘটনা ঘটে চলেছে। আমি এ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতে পারিনি।তবে যা জেনেছি তা হলো আমি এক বিরল রোগে আক্রান্ত। তবে আমিও হাল ছাড়বোনা। আমার ভালো লাগার বিষয়গুলোর জন্যে আমি শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাবো।’ লড়াইয়ের মাঠে এমন হুঙ্কারে আশা জেগেছিলো । মনে সংশয় রেখেও স্বস্তি পেয়েছিলাম।

এদিকে অভিনেত্রী সোনালী বান্দ্রেও একই ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। চিকিৎসা শুরু করেন যুক্তরাষ্ট্রে। মিডিয়াতে তখন আপনার কোনো খবর না থাকলেও সোনালী থাকতেন খবরে। আপনার খবর জানার জন্য মুখিয়ে থাকতাম।  এদিকে জানতাম একটু একটু করে ভালো হচ্ছেন সোনালী, জেনে মন ভালো হতো। ভাবতাম আপনিও হয়তো এভাবেই একটু একটু করে আয়ু বাড়াচ্ছেন। এতো সহজে আমাদের পানসিং হেরে যাবেন ? ‘লাঞ্চবক্স’ এর সেই নিরিহ মানুষটা তো কোনো অন্যায় করেননি। তাহলে এতোবড় যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখে কেনো তাঁকে ঢাল ধরতে হবে? তাইতো জয় করেছিলেন অসুখকে।একেবারে সুস্থ্য হয়ে ফিরে এসেছিলেন আপন তল্লাটে। সেদিন আমাদের আনন্দে হয়তো মুচকি হেসেছিলো প্রকৃতি। আসলে ধরে রাখতে চাইলেই কি সব ধরে রাখা যায়? আবার অসুস্থ্য হলেন। এবার অসুখটা মাথা থেকে নেমে এলো কোলনে। যুদ্ধটা বড়ো কঠিন হয়ে গেলো। তবুও চেয়েছিলাম আপনার মৃত্যুটাকে আরও ক’দিন ঠেলে পিছনে সরিয়ে দিতে। হলোনা…হয়তোবা হওয়ার ছিলো না।

এ মৃত্যু আকস্মিক নয়। তবুও বেদনা তো কম নয়। চলে গেলেন আপনি। নতুন কোনো সিনেমা আর আপনাকে নিয়ে তৈরি হবে না। থাকবেন না আপনি কোনো সংবাদ শিরোনামে।  লেখা হবে না আপনাকে নিয়ে সিঙ্গেল কলাম ডাবল কলাম কোনো সংবাদ।

মাত্র ক’দিন আগেই আপনার মা মারা গেলেন। আপনি মুম্বাই। মা জয়পুর। ক’ঘন্টারই বা দূরত্ব! তবুও শেষ দেখা হলোনা মায়ের সঙ্গে।অদেখা অসুখ।দেশে লকডাউন। এত্তসব বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু এখন…? আর কোনো বাঁধা নেই মা-ছেলের মিলনে। হয়তো মা দু’হাত বাড়িয়েই বসেছিলেন আপনার জন্য-খোকা তুই এলি বাবা…?

শোকেরও একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা বিন্দু থেকে বিন্দুতে গড়ায়। তবুও কোথাও একটা হাহাকার তো রয়ে যায়। এখন আপনার সিনেমা দেখতে বসলে শোকের সেই ক্ষুদ্র বিন্দুটা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। তখন আরও একবার আমার কাছে বেঁচে উঠবেন আপনি।

জীবনের সঙ্গে আপনার বিচ্ছেদে আজ আমার অনেক মনখারাপ। তবুও ভালোবাসা আপনাকে। আকাশের  সহস্র নক্ষত্রের ভীড়ে এখন আপনিও একজন ইরফান খান।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]