এগিয়ে আসার সময় এখনই…

লুৎফুল কবির রনি

যৌন নিপীড়নকে যুদ্ধ-সংঘাতের হাতিয়ার করার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই এ বছর শান্তিতে নোবেল জিতেছিলেন ডেনিস মুকওয়েগে ও নাদিয়া মুরাদ। পুরস্কার গ্রহণ করতে এসেও তারা সরব হলেন একই প্রশ্নে। যুদ্ধের ডাক দিলেন ‘যুদ্ধে যৌন নিপীড়নকে হাতিয়ার করা’র বিরুদ্ধে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ নিয়ে একটি রূপরেখা প্রণয়নের তাগিদ দিলেন তারা।

যৌন নিপীড়নবিরোধী লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর অক্টোবরে নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতে নেন মধ্য আফ্রিকার চিকিৎসক ডেনিস মুকওয়েগে আর মধ্যপ্রাচ্যের ইয়াজিদি মানবাধিকারকর্মী নাদিয়া মুরাদ। সোমবার ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের অসলোতে পুরস্কার নেওয়ার পুরস্কার নিতে গিয়ে মুকওয়েগে যুদ্ধে যৌন নিপীড়ন প্রশ্নে নীরবতা ভাঙার আহ্বান জানান। বলেন ‘যদি কোনও যুদ্ধ করতেই হয়, তবে তা হওয়া উচিত নীরবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। এই নীরবতা আমাদের সমাজকে ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কঙ্গোর অধিবাসী মুকওয়েগে মনে করেন, তার দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যই সেখানকার সংঘাতের নেপথ্য কারণ। তিনি বলেন, ‘সুন্দর গাড়ি, সুন্দর গহনা এসব আমদের পছন্দ। আমারও একটা স্মার্টফোন আছে। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যই এসবের উৎস, প্রায়শই খনি থেকে যা উত্তোলিত হয় ছোট ছোট শিশু, হুমকি-ধামকির শিকার মানুষ আর যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া নারীদের হাতে।’ যৌন নিপীড়নের ঘটনায় খনিজ সম্পদের সুবিধাভোগী এই শ্রেণীর নীরবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন তিনি বলেন, ‘কেবল সহিংসতা সৃষ্টিকারীরাই নয়, দায়ী তারাও যারা এসব অপরাধের বিরুদ্ধে নির্বিকার’

যৌন নিপীড়নের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে এবং নিপীড়নের শিকার মানুষদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মুকওয়েগে।

পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে নাদিয়া মুরাদ বলেন. ‘আজ আমার জন্য একটি বিশেষ দিন। সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত, যখন আলোকিত পথের জয় হয়েছে, বিজয়ী হয়েছে মানবতা, পরাজিত হয়েছে সন্ত্রাসবাদ। আজ সেই দিন, যখন দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর বিজয়ী হয়েছে নারী আর শিশুরা। আমি আশা করি আজকের দিনটি নতুন এক যুগের ইশারা দেবে, যেখানে সর্বত্র শান্তি বিরাজমান থাকবে। নারী-শিশুর সুরক্ষা আর যৌন নিপীড়নের অবসানে পুরো বিশ্বকে নতুন একটি রূপরেখা তৈরি করার জন্য কাজ করতে হবে।’

ডেনিস মুকওয়েগে ও নাদিয়া মুরাদ

যুদ্ধে যৌন নিপীড়নের শিকার লাখো মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছেন মুকওয়েগে ও তার সহকারীরা। নিজ দেশে ‘জাদুকরী চিকিৎসক’ হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি অসাধারণ দক্ষতায় অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে সারিয়ে তোলেন অত্যাচারিত ও ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীদের ক্ষত। যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ট্রমা থেকে বের করে আনতেও তিনি নিবেদিতপ্রাণ। গৃহযুদ্ধবিধ্বস্ত কঙ্গোয় বহু নির্যাতিত ও ধর্ষিত নারীকে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। নারীদের বাঁচাতে দিনে ১০টিরও বেশি অস্ত্রোপচার করা ছাড়াও ৩০ হাজারের বেশি নারীকে একা হাতে চিকিৎসা করে বাঁচিয়ে তুলেছেন তিনি। অন্যদিকে ইয়াজিদি তরুণী নাদিয়া সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিজেই ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং অন্য ধর্ষণের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। ২০১৪ সালের আগস্টে জঙ্গি সংগঠন আইএস-এর সদস্যরা ইরাকে অন্য ইয়াজিদি নারীদের সঙ্গে নাদিয়া মুরাদকেও অপহরণ করেছিলো। সিনজারের কোচো থেকে তাদেরকে অপহরণ করা হয়। আইএস-এর সদস্যরা নাদিয়ার ছয় ভাই ও মাকে হত্যা করেছিলো। তার বোনদেরকেও অপহরণ করে আইএস। ধর্ষণের শিকার হওয়া ও অন্যদের ধর্ষণের শিকার হতে দেখা এ নারী সাহসীভাবে সেই সহিংসতার কথা বর্ণনা করেছিলেন।

মুকওয়েগে ও মুরাদ সোমবার যৌথভাবে গোল্ড মেডেল, ডিপ্লোমা ও ৯০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার গ্রহণ করেছেন। পুরস্কারের অর্থ তাদের দুজনকে ভাগাভাগি করতে হবে।

নীরবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধটা প্রতিটি পরিবার, সমাজে আমি আপনি সকলকে মিলে করতে হবে। আমাদের মা,মেয়ে,প্রেয়সী, বোন,প্রতিবেশীদের বাঁচাতে এগিয়ে আসতেই হবে,এখনই।

ছবি: গুগল