এতো যে সুন্দর পৃথিবী আকাশে ওড়ার আগে বুঝিনি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

৯৬ সালের শেষের দিকে লাভষ্টোরী ছবিতে “কত মানুষ ভবের বাজারে ” গানের জন্য চলচ্চিত্রের গানের পুরস্কার “প্রযোজক সমিতি পুরষ্কার ” পেলাম। মনোনয়ন পেয়েছিলাম শ্রদ্ধেয় শিল্পী রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন এবং আমি। তৎকালীন শেরাটন হোটেলের বল রুমে আয়োজন করে পুরষ্কার দেয়া হচ্ছিলো।ভীরু পায়ে কম্পিত হৃদয়ে অনুষ্ঠান স্থলে গেলাম।যখন পুরস্কার প্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ গায়িকা ক্যাটাগরিতে আমার নাম ডাকা হলো আমি এবং আমার জীবনসঙ্গী স্তম্ভিত। এও কি সম্ভব! কিভাবে, কবে গাইলাম শ্রেষ্ঠ গান,সে গান কি আসলেই অন্যদের গাওয়া গানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ! পুরষ্কার আনতে মঞ্চে যাবো, পা-ই সরছিল না।চোখের সামনে অনেক আলো, অনেক জরি, অনেক চুমকি যেন আমার স্কুলের ড্রইং খাতা! আমি আঁকছি আঁকছি আঁকছি আর আব্বা বলছেন নাহ মা, এই জায়গায় রঙ চড়ানো ঠিক হয়নি মা, আরেকটু গোলাপি করো,হ্যাঁ, সাদা দাও সাদা, লালে সাদা মেশাও দেখো কেমন গোলাপি হয়ে ওঠে আর ওপরের দিকে একটু হলুদের ছোঁয়া দিয়ে তাতে আবার লাল দাও।তুলিটা আস্তে করে টেনে আনো, এনে হঠাৎ করে তুলে ফেলো, জাস্ট ড্রপ অফ! দেখো তোমার নরম গোলাপি কেমন রাগান্বিত কমলা হয়ে গেলো! এই বলতেই মা ডাকছেন

বাবার সঙ্গে

মা কনায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া নামাজের অক্ত গেলো মা ছবি আঁকা আর গান গাইলেই কি চলবে! আমি যেতে যেতেই দেখি আমার পড়ার টেবিলের সামনে আব্বার অত্যাশ্চর্য হাতের লেখা ” অহংকার পতনের মূল”।

আমার জীবনসঙ্গী কে কদমবুসি করে মঞ্চে যেতে যেতেই ভাবছিলাম আমার পায়ের পাতার চলনে যেন পথ ও টের না পায় যে কেউ তার বুকের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। খুব কান্না পাচ্ছিলো। পুরষ্কার কার হাত থেকে নিয়েছি ঠিক মনে নেই তবে অবশ্যই সম্মানিত কেউ হবেন। মঞ্চ থেকে নামতেই রুনা আপা সাবিনা আপা বুকে জড়িয়ে অভিবাদন জানালেন। বলরুমে ভরা গুনীজনরা সবাই ভালবাসা জানাচ্ছিলেন। ভালবাসা নিয়ে নিয়ে আমার ঝুলি ভরে গেলো।যার গানে এই পুরষ্কার সেই স্বভাবকবি সব্যসাচী সুরকার বুলবুল ভাইয়ের সামনে দাঁড়াতে স্বভাবসুলভ মৃদু হাসি মুখে মেখে বললেন ভাবি, এটা কেবল শুরু, আমি আপনাকে এমন জায়গায় পৌঁছে দেবো যে আপনি পেছনে ফিরে তাকানোর সময় পাবেন না! আমি কেঁদে ফেললাম।

 আমার স্বামী আর দেরি করলেন না।শেরাটনের ডিনার বাদ দিয়েই পুরষ্কার হাতে নিয়ে চলে গেলাম বাবামায়ের কাছে।ক্যামেরা সঙ্গেই ছিলো। আব্বা-আম্মাকে জড়িয়ে ছবি তুললাম। আব্বা-আম্মা বুকে জড়িয়ে রাখলেন বুক ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত। তাদের বুকে মনে হচ্ছিলো এটা আমার মায়ের বুক নাকি যমুনার পলি! কি শান্তি কি শান্তি। আব্বা বললেন মাগো, আরও অনেক দূর তোমাকে যেতে হবে মা, তুমি রেয়াজ করা আরও বাড়িয়ে দাও।আম্মা এবার রাগতে গিয়ে হেসে ফেলেন। তিনি কপট রাগে বলেন তোমার যে আরও কথা, আমার মেয়েটা কতকিছু করবে, গান সংসার, গান তো সারাদিনই গায়, এখনো রেয়াজ করবে! আমি হেসে তাদের সুখের আলাপ থামিয়ে দেই।আনন্দে আমি ভাসতে থাকি উড়তে থাকি। সাবানের বুদবুদ হই, আবার রংধনু হই ঘুড্ডি হই।আমি শিশু হয়ে যাই।খুব ইচ্ছে হয় বাবার কোলে গিয়ে গ্যাট হয়ে বসতে।আবার অশ্র্রু আমার চোখের কোল বেয়ে গড়াতে থাকে যখন দেখি আব্বা আমাকে বুকে জড়িয়ে আমার মাথায় আশীর্বাদ এর হাত রেখে চিরাচরিত ফু দিচ্ছেন। সত্যিই নিজেকে ভীষণ সুখী মনে হতে থাকে।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]