এতো সুর আর এতো গান, যদি কোনোদিন থেমে যায়…

দেলওয়ার এলাহী

(টরন্টো থেকে): এই পৃথিবীতে কত যে রহস্য লুকিয়ে আছে, কত শত ক্ষেত্রে, তার সব খবর আর কতজনই বা রাখেন! আর ইচ্ছে থাকলেও কি আর সব খবর রাখা সম্ভব! সম্ভব নয়। বড় জটিল,

হেমন্ত কুমার মুখোপাধ্যায়

বড় রহস্যময় এই জগতের নানান গলি ঘুপচির ছোট ছোট ঘটনাস্রোত। গানের ক্ষেত্রেই ধরা যাক: গত শতকের সত্তরের দশকের শুরু থেকে আশির দশকের শেষ অবধি প্রায় দুই যুগ ধরে বোম্বের তথা গোটা ভারতবর্ষের সংগীত জগৎ শাসন করেছেন দুই জন মানুষ- রাহুল দেব বর্মণ (পঞ্চম) এবং তাঁর পছন্দের অসাধারণ শিল্পী কিশোর কুমার। ভাবতে অবাক লাগে কুমার শচিন দেব বর্মণের সন্তান পঞ্চম পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে ভারতীয় মার্গসংগীতের মেলবন্ধন (এটির আবার কুলীন এক শব্দ আছে ফিউশন) ঘটিয়ে রাজাধিরাজের মতো শাসন করে গেছেন বোম্বের চলচ্চিত্র সাম্রাজ্য। সেই পঞ্চম কথায় কথায় একবার গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলে ফেলেছিলেন:-‘হেমন্ত বাবু গানে সুর লাগাতে জানেন নাকি? হেমন্ত বাবুকে বলবেন, গানে কীভাবে সুর লাগাতে হয়, কিশোর দার কাছ থেকে শিখে নিতে!’ বলেন কি মঞ্চম! পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন পঞ্চমের মুখের উপরেই। এবং খুবই ভর্ৎসনা করেছিলেন পঞ্চমকে। কিন্তু পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিবাদে তো পঞ্চমের মনের কথা শেষ হয়ে যায় না! নিশ্চয়ই কিশোর কুমারকে নিয়ে রাহুল দেব বর্মণের এমন উচ্চ ধারণা মনে গেঁথে ছিলো। এই উচ্চ ধারণা আছে বলেই পঞ্চম প্রমাণ করেছেন, যে কোনো সিনেমায় নায়কের ঠোঁটে যে গানেই কিশোর কুমার কণ্ঠ দিয়েছেন সেই সিনেমাই ব্যবসাসফল হয়েছে।

কিশোর কুমার

তালাত, মুকেশ, হেমন্ত, মান্না দে সবাই তখন কিশোর কুমারের রাজকীয় কণ্ঠের কাছে ম্লান। এমনকি বোম্বে সিনেমার কিংবদন্তী কণ্ঠশিল্পী মোহাম্মদ রফির সর্বব্যাপি জনপ্রিয়তাও পঞ্চম-কিশোরের গানের কাছে তখন অসহায়! ঠিক সেই সময়ই, কিশোর কুমার যখন বছরের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত সময় পূজার গানের সুরের জন্য স্বয়ং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে ছুটে আসেন, তখন বিস্ময়ের অন্ত থাকে না! কিশোর কুমার জানেন, কোন বিয়োগের স্পর্শ পেয়ে যোগফলের বিদ্যুতে জ্বলে উঠবে আলোর বাতি। তিনি সেই সুরের আলোকিত আগুনে আমাদেরকে প্রাণিত করতে চেয়েছিলেন। এবং অবশ্যই তা সফলভাবে করতে পেরেছিলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর করা পূজার সেই সর্বকালের জনপ্রিয় গানটির কথা মনে করুন-‘আমার পূজার ফুল, ভালোবাসা/ হয়ে গেছে তুমি যেন ভুল বুঝোনা….। তৎকালীন বাংলা হিন্দী সর্বত্রগামী জনপ্রিয় শিল্পী কিশোর কুমার। বাংলা আধুনিক অথবা চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তায় রাজাধিরাজ তিনি। এদিকে সুধীন দাশগুপ্তও বাংলা আধুনিক অথবা চলচ্চিত্রে অবিস্মরণীয় সুরের গান উপহার দিচ্ছেন একটার পর একটা। ‘কে প্রথম কাছে এসেছি/ কে প্রথম ভালোবেসেছি/ তুমি, না আমি?’ গানটি মান্না দে-লতা মুঙ্গেশকরকে দিয়ে গাইয়ে হেমন্ত-সন্ধ্যার জুটিকে ভেঙ্গে দিয়েছেন উ

রাহুল দেব বর্মন

ত্তম-সুচিত্রার ঠোঁটে। সেই সময় গুরুদত্ত সুধীন দাশগুপ্তকে মাস মাইনা দিয়ে বোম্বে নিয়ে গেলেন ছবি করবেন বলে। কিন্তু ছবির কাজ আর এগোয় না। গল্প, চিত্রনাট্য পাত্র-পাত্রি সবই বারবার পাল্টাতে থাকে। সুধীন বাবুর ভালো লাগেনা। সুধীন দাশগুপ্ত সুরকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। গীতিকার হিসেবেও তাঁকে আমরা মনে রাখতে বাধ্য। অনেক জনপ্রিয় গান রচনা করেছেন সুধীন বাবু।

আশা ভোঁসলের প্রথম বাংলা আধুনিক গানের রেকর্ডটির গীতিকার সুধীন দাশগুপ্ত। সুধীন বাবুর নিজের গান অথবা অন্য গীতিকারের গান; তাঁর সুর থাকলেই পুরুষ কণ্ঠের জন্য প্রথম পছন্দ করতেন বরাবরই কিশোর কুমারকে। তারপর অবশ্য কিশোর কুমারকে না পেয়ে অন্য শিল্পীকে দিয়ে গাইয়েছেন প্রায় সব গানই। এমনও হয়েছে পুলক বাবু সুধীন দাশগুপ্তকে নতুন লেখা গান দিয়েছেন, গানটি ভালো লাগলে পড়েই তিনি মন্তব্য করতেন: অপূর্ব, কিশোর বাবু দারুণ গাইবেন এই গান।

সারাজীবনই তাঁর প্রথম পছন্দের শিল্পী ছিলেন কিশোর কুমার। কিন্তু রসহ্যজনক এবং দুঃখজনক সুধীন দাশগুপ্তের সুর করা একটি গানেও কিশোর কুমার কণ্ঠ দেননি। এ এক অপার রহস্যের বিষয়! সুধীন দাশগুপ্ত তখন বোম্বেতে। গুরু দত্তের মাস মাইনার চাকরী করেন। গান রচনা আর গানের সুর ছাড়া তাঁর অন্য কিছু ভালো লাগার কথা নয়। লাগেওনি। একটি গান লিখে এবার তিনি কিশোর কুমার নয়, খুঁজতে লাগলেন সুবীর সেনকে। সুবীর সেনকে ধরে এনে বললেন-‘তোর জন্য একটি গান লিখেছি। শুধু তোর জন্য। তোকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে এই গান রেকর্ড করাবো।’ মুখরাটা সুবীর সেনকে শোনালেন: ‘এতো সুর আর এতো গান/ যদি কোনোদিন থেমে যায়/ সেই দিন তুমিওতো ওগো/ জানি ভুলে যাবে যে আমায়……..।’ প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেলেন সুবীর সেন এই গান গাওয়ার জন্য। অনেক দিন পর সুবীর সেনকে এই গানটি কণ্ঠে তুলে দিলেন। অতঃপর কলকাতায় এসে রেকর্ড করলেন সেই অবিস্মরণীয় -‘এতো সুর আর এতো গান…..। কোনো কোনো গান থাকে, যে গানকে শিল্পীর সিগনেচার সং বলা যায়। নিঃসন্দেহে বাংলা গানের সুবীর সেনের সিগনেচার সং এটাই। আমাদের ভালোবাসায়, বাঙালির ভালোবাসায় সুবীর সেন বহুদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি আড়াল হয়েছেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।

ছবি: গুগল