এভাবেই রুখে দাঁড়াতে হবে আমাদের

সাগর লোহানী

দেশে নারীর উপর সাম্প্রতিক নির্যাতন/ধর্ষণ/ইভ টিজিং যা ঘটচ্ছে তা ঘটানো হচ্ছে সুপরিকল্পিত উপায়ে। আঘাতটি সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির উপর। যারা নারীর ক্ষমতায়নে ভীত সেই কুচক্রী মহল এখন পথে নেমেছে। রুখে দাঁড়াবার জন্যে প্রস্তুত থাকুন। পথে বের হবার আগে একটি NT Cutter সঙ্গে নিন। যেকোন পাবলিক প্লেস, বাস, বাজার বা ভীড়ে কাটারটি ব্যাগ থেকে বের করে হাতে রাখুন। গাড়ীর নম্বর মনে রাখুন।
সুযোগ মত বাসের হেলপার ও ড্রাইভারের ছবি তুলে রাখবার চেষ্টা করুন। স্থানীয় থানায় রিপোর্ট করুন।

 ঘটনা বুধবার এপ্রিল ১৮, স্থান ইস্কাটন বিজিএমইএ ভবনের পেছনে:
“গতকাল কি ঘটেছিলো সে বিষয়ে জানতে চাইলে সোনিয়া বিডিমর্নিংকে বলেন, গতকাল দুপুর ১ টার দিকে আমি ভার্সিটির ক্লাস শেষে বাসায় ফিরতে ছিলাম। আমার বাসাটা মগবাজার বিজিএমই ভবনের দিকে। ফেরার পথে হঠাৎ করেই বৃষ্টি নামে। দ্রুত রিকশা নিলেও এর মাঝখানে খানিকটা ভিজে যাই আমি। রিকশা নিয়ে বাসার কাছে বিজিএমই ভবনের কাছে এসে নামি। তখন বৃষ্টি থেমে গেছিলো। আমি হাটতে হাটতে বিজিএমই ভবনের পিছনের দিকটা দিয়ে বাসার গলির দিকে যাচ্ছিলাম। এমন সময় রাস্তায় আমার পিছন থেকে এক লোক বিচ্ছিরি সব মন্তব্য করা শুরু করে। এমন বাজে সব অশ্লীল কথা যে আমি আপনাকে মুখে বলতে পারবো না। একজন মেয়ের বডি পার্টসকে বর্ণনা করতে গিয়ে যেসব নোংরা কথা বলা যায় সেসব আর কি। আমার মুখ দিয়ে বের হবে না। রাস্তার মধ্যে থতমত খেয়ে পিছনে ফিরে আমি আরও হতভম্ব হয়ে যাই লোকটার চেহারা দেখে। বড় বড় দাঁড়ি নিয়ে এক মধ্যবয়স্ক লোক। তখনো তিনি বাজে কথা বলে যাচ্ছিলেন।

আমি জাস্ট চিন্তা করতে পারতে ছিলাম না যে একজন বাবার বয়সী লোক কিভাবে এমন বিচ্ছিরি কথা বলতে পারে। তাছাড়া আমার সঙ্গে কথা বলতেছেন আমার পোশাক আপনিই দেখেতেছেন যে ফুল সালোয়ার কামিজ, হিজাব পড়া আমি। যদিও এটাই আমার স্বাচ্ছন্দের পোশাক। কিন্তু পোশাক বলেই তো না। আমি যদি জিন্স-টপসও পড়ে থাকতাম তাহলেও তো কারো অধিকার নাই কোনো মেয়েকে বাজে মন্তব্য করার।

যাইহোক, তখন মনে হলো এই মুহুর্তে চুপ করে চলে যাওয়া মানে তাদের উসকাই দেয়া। তাদের সাহস বাড়িয়ে দেয়া। এখন আমি চলে যাবো, একটু পর অন্য কোনো মেয়েকে উত্যক্ত করবে কিংবা এর থেকেও খারাপ কিছু। সেসব ভাবতে ভাবতে লোকটার কাছে গিয়েই একটা থাপ্পড় মেরে বসি, সে কিছু বুঝার আগেই পরপর ঘুষি আর থাপ্পড় মারি। এরইমধ্যে দু -চারজন মানুষ চলে আসে। তারা বলতেছে একদম ঠিক হয়ছে এই করা উচিত। এক রিকশাওয়ালা পর্যন্ত বলতেছে, মামা একদম ঠিক হয়ছে, ইচ্ছামত মারেন।

এরমধ্যে দুজন ভাইয়া আসে। তাদের হাতে লোকটাকে দিয়ে বাসায় ফোন দিয়ে ভাইয়াকে আনি। রাস্তার মানুষ আর ভাইয়ার সহযোগিতায় লোকটারে পুলিশের হাতে তুলে দিই।‘”

 

ঘটনা সোমবার এপ্রিল ১৬, স্থান: রামপুরা- চলন্ত বাস:

“‘একটা স্টিলের টিফিন বক্স আজকে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।’

আব্দুল্লাহপুর থেকে রামপুরা আসার জন্য বাসে উঠেছিলাম সাড়ে ৬টার দিকে। বাসে দুজন কন্ডাক্টরের একজন মনে হয় ড্রিংক করেছিল।

অনেক ভিড় ছিল, তবে রামপুরা আসতে আসতে প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। পেছনের দিকে কয়েকজন ছেলে বসেছিল আর সামনের দিকে আমি আর আম্মু।

বাসের লাইটগুলো বনশ্রীতে এসে বন্ধ করে দেয় ড্রাইভার, বলে যে তার হেডলাইট নষ্ট এ জন্য বন্ধ করেছে।

কালকে (সোমবার) সকালে পরীক্ষা, হাতে সময় নেই বলে কেউ এটা নিয়ে ঝামেলা করিনি।

রামপুরায় পৌঁছে গেলে বাস জ‍্যামে পড়ে আর আমরা নামার জন্য দরজার দিকে যেতে থাকি।

আম্মু প্রথমে নামে। আমি দরজা পর্যন্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন আমার হাত চেপে ধরে, আম্মু ততক্ষণে নেমে গেছে।

আমি নামার চেষ্টা করি কিন্তু বাস সামনের দিকে যেতে থাকে আর পেছনে কয়েকজন বলছিল- ‘মাইয়াটারে ধর’।

কী করব বোঝার মতো সময় ছিল না। অন্য হাতে একটা স্টিলের টিফিন বক্স ছিল ওইটা দিয়ে লোকটাকে বাড়ি মারলাম। কতটা লেগেছিল জানি না, কিন্তু আমাকে ধরে রাখা হাতটার শক্তি কমে গেল। ধাক্কা দিলাম লোকটাকে, বাস থেকে লাফ দিলাম।”

ঘটনা সোমবার এপ্রিল ১৬, স্থান: রামপুরা- চলন্ত বাস:

“আজ বিকেল ৫ -৫.১৫, শ্যামলী থেকে আমি আর আমার এক বান্ধবী লাব্বাইক বাসে উঠলাম কমলাপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রায় দু-চারদিন পরপরই এই রুটে যাতায়াত হয় আমার।

বাসে কমপক্ষে ২০-২৫ জন লোক ছিল। উঠার পরপরই কন্ডাকটর আসে ভাড়া নেয়ার জন্য – বললাম ভাইয়া একটু পরে দেই সায়েদাবাদ যাবো আমরা। সিট না থাকায় পিছনে গিয়ে বসতে হয় আমাদের। আমরা দুই জন কিছুক্ষণ গল্প করে পরে জ্যামে বোরিং লাগায় হেডফোনে গান শুনতে থাকি। তখন সবে আমারা মানিকনগর।

ফার্মগেট পার হবার পর কন্ডাকটর আবার আমাদের কাছে ভাড়া নেয়ার জন্য আসে, ভাড়া নিতে নিতে কন্ডাকটর হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল ” আপারা সায়েদাবাদ কই যাইবেন” প্রথমে বলতে গিয়েও পরে বললাম – “আপনার জানা লাগবেনা মামা, আপনি সায়েদাবাদের ভাড়া রাখেন দুইজনের”। আমরা আবার হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে থাকি।

বাংলামোটর পার হয়ে মালিবাগ ক্রস করে খিলগাও পুলিশ ফাড়ি পার হতে হতে দেখলাম আস্তে আস্তে পুরো বাস খালি হয়ে যাচ্ছে মানুষজন নেমে যাচ্ছে। আমরাও ব্যাপারটা নরমালি নেই।

খিঁলগাও ফ্লাইওভারে যখন বাস উঠে মাত্র আমরা সহ চারজন লোক ছিলো বাসে, বাসাবোতেও বাসটা আর থামলোনা, মানুষ থাকা সত্বেও বাসে লোক উঠায়নি কন্ডাকটর। বৌদ্ধমন্দির পার হবার পর আমরা যখন ফোন ব্যাগে ঢুকাচ্ছি নামার জন্য রেডি হব হঠাৎ পিছন থেকে আমাদের দুইজনকে দুইটা লোক হাত দিয়ে মুখ চোখ চেপে ধরে।

বাসটা হঠাৎ জোরে টানার শুরু করলো, আমি চোখে অন্ধকার দেখছিলাম, পরে আরেকটা লোক আমার পা বাঁধা শুরু করলো, বুঝতে পেরে শরীরের শক্তি দিয়ে তাকে লাথি মারি আমার মুখে রুমাল চেপে ধরায় চিৎকারও দিতে পারছিলাম না, ভয়ে আতঙ্কে শরীরের প্রতিটা নার্ভ আমার জমে গিয়েছিলো যা ভাষায় প্রকাশ করার মত না । ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে বুঝতে পারলাম আমি একদম গেটের সামনে এসে পড়ছি এবং ধাক্কা খেয়ে দেখলাম আমার বান্ধুবী আমার ঠিক পাশে।

হাত দিয়ে যত জোরে পারি নিজের শক্তি দিয়ে লোকটার বুকেকে আঘাত করি, সঙ্গে সঙ্গে উনি আমাকে ছেড়ে দিলে আমি আরেকটা লাথি মারি পেট বরাবর। কিছু না ভেবেই আমার পায়ের জুতা খুলে আমার বান্ধবীকে যে লোকটা ধরে রেখছে তার মাথায় মারি, ওই লোকটা ড্রাইভারের পাশে পড়ে যায়, তৎক্ষণাৎ আমরা গেইট খুলে বাস থেকে লাফ দিয়ে ছিটকে পড়ি। কোমনতে রাস্তা পার হয়ে দেখি বাসটা সোজা চলে গেছে।

একজন ট্রাফিকপুলিশকে বললাম উনি “দেখি “বলে বাইক নিয়ে সোজা চলে গেলো আর দেখতে পেলামনা উনাকে। বুক ফেটে, রাগে,দুঃখে ভয়ে শুধু চোখ দিয়ে পানি ঝরছে আমাদের। রিকসা নিয়ে বাসায় এসে পড়ি।”

ছবি: গুগল