এমন আয়োজন আমাদের জীবনে বারবার ফিরে আসুক

কাকলি পৈত

(দিল্লী থেকে): সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে কলকাতায় শুরু হয়েছিলো ব্যান্ড সঙ্গীতের পথচলা। সেই থেকে সঙ্গীতের এই ভিন্ন ধারার শৈলী আজকের দিনে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।গানের জীবনমুখীনতা, সমসাময়িকতাকে গানের বিষয় করে তোলা , তার সঙ্গে ব্যাক্তিগত আবেদন, সামাজিক বার্তা এই সঙ্গীতের ধারাকে মানুষের মনে বিশেষ করে তরুন প্রজন্মকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। চলচ্চিত্র সঙ্গীতের প্রাধান্য সবসময়েই বেশী থাকায় রক সঙ্গীতের এই বিশেষ ধারাকে সঙ্গীতের জগতে জায়গা করে নিতে একটু সময় লেগেছে। তবে সময়ের দাবী মেনে ধীরে ধীরে নানাধরনের ব্যান্ড গুলো উঠে এসেছে। কেউ কেউ ব্যাক্তিগতভাবে নিজের লেখা গান,নিজেই সুর দিয়ে রক সঙ্গীতের মূর্ছনায় তাকে পরিবেশন করেছেন আবার অনেকে সমষ্টিগত ভাবে দল গড়েছেন, নানাধরনের গানের সম্ভার নিয়ে।আধুনিক সঙ্গীত সরঞ্জামের সঙ্গে তারুন্যের উন্মাদনায়, কথার গভীরতায় সঙ্গীতকে রাস্তার মোড়ে মোড়ে পৌছে দিয়েছিলো এই ব্যন্ড সঙ্গীত।ভারতের প্রথম রক ব্যান্ড ৭৬’সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। গৌতম চট্টপাধ্যায়ের ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’,বাংলা প্রথম রক ব্যান্ড সমসাময়িক শিল্পীদের নিয়ে তৈরী হয়েছিলো। ষাটের দশকের বব ডিলনের মত তাদের গানে ও গণ আন্দোলনের আবেদন ও সামাজিক প্রকৃতির ছাপ ছিলো। আজকের দিনে এই সঙ্গীতের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছে।

সম্প্রতি ‘বাকার্ডি’ আয়োজিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যান্ড সঙ্গীতের আসর বসেছিল শিলং এর মুখলা গ্রামে। থাডলাস্কেইন জলাশয়ের উল্টোদিকে জয়ন্তিয়া পাহাড়ের সুদৃশ্য টিলার  ওপরে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে আকাশ বাতাস দাপিয়ে বেজেছিল ড্রামস গীটারের যুগলবন্দী সাঙ্গীতিক মূর্ছনা। তার তালে তালে পা মিলিয়েছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অগনিত সঙ্গীত প্রেমীরা।দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রকব্যান্ড অজস্র শ্রোতার মন মাতালেন। মঞ্চসজ্জা, জমকালো উপস্হাপনায় হাজারো দর্শকের করতালি আর নৃত্যের উন্মাদনায়,তারুন্যের আবেগে বিয়ারের ফেনিল উচ্ছ্বাসে পাহাড়ের কনকনে ঠান্ডাতেও উষ্ণতার পারা চড়ে গেয়েছিলো পরিবেশে আর মানুষের মনে। চারদিকে খাবারের অঢেল আয়োজন, নানারকম পানীয়ের মাদকতাময় পরিবেশ আর আলো -আঁধারিতে গীটারের উষ্ণ অভ্যর্থনায় রক্তে শিহরন জাগানো সাঙ্গীতিক উন্মাদনায় সকলেরই পা ছিলো টালমাটাল।বিশাল এলাকা জুড়ে খোলা মাঠে  টিলার ওপরে বসে চাঁদনী রাতে গান কে উপভোগ করার অনন্য অনুভূতি আর চারিদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে মন হারিয়েছিলাম কোন এক মায়াবী রাজ্যে।

একই সঙ্গে তিনটি মঞ্চ তৈরী করা হয়েছিলো আর একের পর এক ব্যান্ড তাদের অনুষ্ঠান নিয়ে উপস্হিত ছিলো আর মানুষ হাজির ছিলো নিজের পছন্দ অনুযায়ী ব্যান্ডের অনুষ্ঠানে।বিকেল তিনটে থেকে রাত এগারটা অবধি দু’দিনের এই অনুষ্ঠানে পাহাড় আর সমতল মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিলো। অনুষ্ঠানের ব্যাবস্হাপনা ও অত্যন্ত শৃঙ্খলিত ছিল।ভারত থেকে আসা ব্যান্ড দের মধ্যে ফরিদকোট,খাসি ব্লাডস, রাহুল রাজখোওয়া, tali angh(নাগাল্যান্ড) ওয়ারেন ম্যানডোসা সম্প্রতি যাদের আ্যালবাম’ the last analog generation’
মুক্তি পেয়েছে।এছাড়া বিশেষ আকর্ষন ছিলো শঙ্কর মহাদেবন আর বিশাল দাদলানির ‘পেন্টাগ্রাম’। অসাধারন পরিবেশনা ছিল শঙ্কর মহাদেবনের। ধ্রুপদী সঙ্গীত আর আধুনিক রক সঙ্গীতের অনবদ্য এক মেলবন্ধন তৈরী করে ধ্রুপদী সঙ্গীতকেই তিনি আধুনিকতার মোড়কে আজকের তরুন প্রজন্মের কাছে এমন ভাবে পরিবেশন করলেন, ছন্দের দোলায় করতালিতে তারা ও তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দিলেন।পরিবেশনা যদি সঠিক হয় আমাদের সংস্কৃতি ঐতিহ্য কে আমরা আজকের তরুন সমাজের হাতে নিশ্চিন্তে তুলে দিতে পারি । তারা ও তার যথাযোগ্য মর্যাদা দেবে।ভারতের বিভিন্ন প্রান্তিক জায়গা থেকে আসা লোকশিল্পীরা শঙ্কর মহাদেবনের সঙ্গে সহযোগিতায় ছিলেন। এছাড়া জনপ্রিয় বাঁশিবাদক ও কন্ঠশিল্পী রসিকা শেখর ও তার সঙ্গে যুগলে অনুষ্ঠান করেন।কর্নাটকী ধ্রুপদী গানের শিল্পী টি. এম . কৃষ্ণা ও শিলং এর স্হানীয় ব্যান্ড ‘সামারসল্ট’ ও তাদের অনবদ্য পরিবেশনা নিয়ে সঙ্গী হন শঙ্কর মহাদেবনের সঙ্গে।

ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের লোকসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত গীটার, ড্রামস ,অক্টোপ্যাড,বাস্ এর সংমিশ্রনে ছিলো অসাধারন।এছাড়া শিলং এর বিখ্যাত ব্যান্ড রুডি ওয়ালাঙ এর ‘soulmate’ , আমেরিকান গীটারিস্ট গানলেখক ও সুরকার ‘steve vai’ , আমেরিকান রকব্যান্ড জন ফোরম্যান এর ‘switchfoot’ এর অনুষ্ঠানে মানুষের ঢল উপচে পড়েছিলো । সমকালীনতা আর জীবনের গভীর সত্যগুলোকে গীতিধর্মীতার মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে পৌছে দেবার অনন্য প্রয়াস ব্যান্ড সঙ্গীত ,এক অন্য মাত্রা জুড়েছে সঙ্গীতের ধারায় যা শুধু আজকের প্রজন্ম নয়,একটু পুরোনো হয়ে যাওয়া মানুষকে ও ভালোলাগাতে শেখায় , ভাবতে শেখায়।
এছাড়া গীটারের যাদুকর গার্থী গোভান , এ. আর . রহমানের সঙ্গে কাজ করা বেস গীটারিস্ট মোহিনী দে ও মাতিয়ে রাখলেন দর্শকদের। এছাড়া ‘ ডিউ ড্রপস্, স্কাই লেভেল,দেশী বিদেশী নানা ব্যান্ডের অভূতপূর্ব এই মিলন মেলার অভিনব আসর খুব আনন্দদায়ক ছিলো।এই মেলার অনেক মহৎ উদ্দেশ্য আছে যা হলো ভারতের প্রত্যন্ত কোণে কোণে লাইব্রেরী তৈরী করা যাতে নানারকম বইয়ের সম্ভার আভ্যন্তরীন সমস্ত মানুষের কাছে পৌছে দেওয়া যায়। এজন্য বই দান করার আয়োজন ও ছিলো। প্লাস্টিকের ক্ষতিকর ব্যবহার ,পরিবেশ দূষণ এসব কিছুর ওপরেও কাজ ছিলো। প্লাস্টিকের ব্যবহার বর্জিত ছিলো।সমস্ত বর্জ্য পদার্থকে রি- সাইক্লিং করে কিভাবে তা থেকে নানারকম জিনিষ তৈরী করা যায় সেই বার্তা ও তারা দিয়েছেন।
এককথায় পাহাড়ের হিমেল বাতাসে সুরের ঝংকারে ,মাদকতায় ,নৃত্যের তালে তালে,আবেগে উচ্ছ্বাসে ভালোবাসায় ভেসে যাওয়ার এমন সুরেলা সন্ধ্যা, চাঁদনী রাত সঙ্গীতপ্রেমী মানুষকে টেনে আনবে বারেবার সঙ্গীতের এই সয়ন্বরসভায়।সুরের আবেদন সবসময়ই সুগভীর। আমাদের মন ভালো রাখে, বাঁচতে শেখায় ,মানুষের মধ্যে ঐক্য সংহতির মেলবন্ধন , ভালোবাসায় জড়ানো এক সুন্দর পৃথিবীর ছবি তুলে ধরে। তাই এমন আয়োজন পৃথিবীর সব কোণে আমাদের জীবনে ফিরে ফিরে আসুক বারবার।

ছবি: লেখক