এরই নাম জীবন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

আব্বা আর রত্না’পা

বাচ্চা দু’জনকে বাসায় এনে কিছুদিন রেস্ট দিলাম। তাদের স্কুল থেকে ছুটি নিলাম।কিন্তু আমার তো আর গান থেকে রেস্ট নেয়ার কিছু নেই।আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাই তাঁর ছবির নারী কন্ঠের সব গানই আমাকে দিয়ে গাওয়ান।তিনি আমার কন্ঠের উপর খুবই নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন। কিন্তু বাচ্চাগুলোকে রাখার জন্য সার্বক্ষণিক ভাবে কোন মানুষ খুঁজে পাচ্ছিলাম না।আমার বাবা-মায়ের বাসা থেকেও আমি অনেক দূরে চলে এসেছি।মাদারটেক থেকে রামপুরা মহানগর প্রজেক্ট। অনেক দূর। স্কুলে না গেলে তাদের পড়াশোনা তো আর থেমে থাকেনা।আব্বা বললেন আমি তোমার ছেলেমেয়েদের পড়াবো। আব্বা সেই মাদারটেক থেকে প্রায় প্রতিদিন আমার বাসায় আসেন মাশুক ফারিয়াকে পড়াতে।আমার খুব অসহায় লাগে।আব্বা আসেন সেই সকাল দশটায়।তারপর পড়িয়ে বাসায় যেতে যেতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়।আমি তাঁর জন্যও ঠিকঠাক রান্না করতে পারিনা। আমার যে বাঁধা কাজের সাহায্যকারী ছিলো সেই সালেহা বাড়ি গিয়ে আর আসলো না।তার বাবা নাকি অসুস্থ। অনেক যোগাযোগ এর চেষ্টা করেও তাকে আনতে পারিনি। আমি পড়লাম ভীষণ বিপদে। এর মধ্যে শিল্পী আবু সাঈদ জাহাঙ্গীর ভাই বললেন তার মামাতো বোন ঢাকায় পড়াশোনা করে কিন্তু তার থাকার জায়গা নেই।জাহাঙ্গীর ভাইরা দুইভাই মহানগর প্রজেক্ট এই থাকেন কিন্তু তারা দুজনই অবিবাহিত এবং তাদের ও বাসায় থাকার কোন ঠিক নাই।আমি বললাম মেয়েটি যদি আমার বাসায় থাকে তো আমার একটু উপকার হয়।আমার বাসায় বাড়তি একটি রুম ও আছে।শেষে ঠিক হলো ওনার মামাতো বোন মুমু আমাদের

বাসাতেই থাকবে। আমি একটু স্বস্তি পেলাম।মেয়েটি সারাদিন ভার্সিটির ক্লাস করে সন্ধ্যায়ই বাসায় ফিরে আসে।সে ফারিয়াকে পড়ানো খাওয়ানোর দায়িত্ব নিলো।ফারিয়া মাশুক ও তাকে খালামনি হিসেবে পেয়ে যার পর নাই খুশি। মেয়েটি রাতে আমাকে রান্নায় সাহায্য করে। খুবই অমায়িক মানুষ সে।আমরাও খুশি যে পড়াশোনার জন্য একটি মেয়ের পাশে আমরা থাকতে পারছি। আমি রেকর্ডিং বা প্রোগ্রামে গেলে সারাদিনের জন্য হলেও সে ক্লাস বাদ দিয়ে আমার বাচ্চাদের সে দেখাশোনা করে। ফারিয়া একদম তার মুমু খালামনির ভক্ত হয়ে উঠলো। রাতেও সে খালামনির সঙ্গে ঘুমায়।আমরা কোথাও বেড়াতে গেলে মুমুকেও সাথে নেই।মুমু আমাদের টাকাপয়সা দিতে চেয়েছে কিন্তু আমরা তা কখনোই মানিনি।বোনের স্নেহে তাকে সঙ্গে রেখেছি।সেও আমাদের পরিবারের একজন হয়ে গেছে। এভাবে যেতে যেতে প্রায় বছর পার হয়ে গেলো। ফারিয়া মাশুক আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করলো। মুমু মাঝেমধ্যে তাদের স্কুলেও পৌঁছে দিয়ে তার ভার্সিটিতে যায়।কিন্তু কদিন ধরে খেয়াল করছিলাম মেয়েটির ঠান্ডা লেগে থাকে। আমি তাকে আদা মধু তুলসীপাতার রস করে দেই।মুমুর চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে মেয়েটির। সে প্রায় বিছানায় পড়ে গেলো।সে তার বাড়িতে খবর দিলো।এবং একদিন সে বাড়ি গেলো।তার একটি সেমিস্টার বাদ গেলো। কিছুদিন রেস্ট নেয়ার জন্য সে বাড়ি গেলো। মাশুক যেমন তেমন কিন্তু ফারিয়া তার মুমু খালামনির জন্য অস্থির হয়ে পড়লো। আমি আবার একা হয়ে গেলাম। একটা পরিবার এর জন্য নানী-দাদী খালা ফুপুর কি যে প্রয়োজন তা আমার চাইতে কেউ আর ভালো করে বুঝবেনা।আমি খুব বিপদে পড়ে মাঝেমধ্যে আমার রত্না’পার মেয়ে এ্যানিকে বলে কয়ে নিয়ে আমার কাছে রাখতাম। কিন্তু তার-ও পড়াশোনা আছে, স্কুল আছে! একদিন রত্না’পারাও বদলি হয়ে ইশ্বরদী চলে গেলো।

ঠোকর খেতে খেতে আমি নাজেহাল।

আমার জীবনে আমার জীবনসঙ্গী যদি এই একই প্রফেশনে না থাকতেন অথবা তিনি যদি গানের অনুরাগী না হতেন বা আমার গান না ভালোবাসতেন তাহলে আমার গানের ক্যারিয়ার সেখানেই শেষ হয়ে যেতো। কারণ সংসার এবং গানের অনিয়মিত সসময়সূচির এই ক্যারিয়ার একসঙ্গে চালানো কখনওই সম্ভব নয়।এই জন্যই আমাদের সংগীত শিল্পীদের জীবনে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সংসার স্বামী বাচ্চাকাচ্চা মেইনটেইন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা।একজন শিল্পীর স্বামী যদি অন্য পেশায় থাকেন তিনি কখনও বুঝতে পারবেন না তার স্ত্রী রাত তিনটায় একটি রেকর্ডিং স্টুডিওতে কি কাজ করে। এজীবনে কতো গভীর রাত আমি স্টুডিওর ভেতর কাটিয়েছি গান গাইতে গিয়ে অথবা প্রোগ্রাম শেষ করে কতরাতে বাড়ি ফিরেছি তার কি কোন হিসাব আছে? উনি সঙ্গে ছিলেন বলেই আমি নিশ্চিন্তে আমার কাজ করতে পেরেছি।

মুমু বাড়ি গিয়ে আর ঢাকায় ফিরলোই না।খবর পেলাম তার ক্যান্সার ধরা পড়েছে। আমরা পুরো পরিবার দুঃখে নিমজ্জিত হলাম।মুমু একদম বিছানায় পড়ে গেছে।তাকে কেমো দেয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু তার অসুখ চতুর্থ স্টেজে চলে গিয়েছিল। মুমু মারা গেলো। কতদিন যে আমি কেঁদেছি ফারিয়াকে বুকে ধরে এই অনাত্মীয় মেয়েটির জন্য!

জীবনের এই অনাকাঙ্ক্ষিত গগল্পগুলো কখনওই আগে থেকে আন্দাজ করা যায়না! আজ আবার আমার মুমুর স্মৃতি আবারও জীবন্ত হয়ে উঠলো। আল্লাহ মেয়েটিকে ওপারে ভালো রাখুক।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]