এরিক মারিয়া রেমার্কের লড়াই

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নিজে বন্দুক হাতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঠে লড়াই করেছেন, কিন্তু গোটা জীবন যুদ্ধের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছেন লিখে। বিশ্বযুদ্ধের সময় পশ্চিম রণাঙ্গনের ভয়বহতা নিয়েই লিখেছেন সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’। তাঁর বই পৃথিবীর মানুষকে জানিয়েছিলো, যুদ্ধ কত ভয়ংকর।

‘একবার তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, আপনি কি ইহুদিদের পছন্দ করেন?

রেমার্ক বললেন, না।

আপনি কি জার্মানদের পছন্দ করেন? না।

আপনি কি আমেরিকানদের পছন্দ করেন ? না।

তা হলে আপনি…

আমি পছন্দ করি আমার বন্ধুদের। যারা পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যেই আছে।’

এমনই এক মানুষ ছিলেন রেমার্ক। অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট উপন্যাস লিখে তিনি পৃথিবীর মানুষকে জানিয়েছিলেন, যুদ্ধ আসলে যুদ্ধবাজ রাজনীতিবিদদের এক গোপন ব্যবসা। যুদ্ধের নির্মমতা মানুষের জীবনের সব সুন্দর ছবিকে নষ্ট করে দেয়, পুড়িয়ে দেয় সব মানবিকতার ইতিহাস। এই বইয়ের প্রথম জার্মান সংস্করণ বিক্রি হয়েছিলো দেড় লক্ষ কপি। তিন বছরের মধ্যে ইংরেজি, রুশ, স্প্যানিশ, রোমানিয়া, ফরাসি-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এই কাহিনি। যুদ্ধবিরোধী জনগণ বিপন্ন সময়কে বোঝাপড়ার সাহস ও অবলম্বন খুঁজে পেলেন এই আখ্যানে।

গত মাসে ছিলো তার ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী।

ধ্বংসযজ্ঞে সক্রিয় ‘যুদ্ধবাজ’ হিটলার নিজের ‘ঘাতক’ চেহারা আর মতলব চিনতে পেরেছিলেন আর্নেস্ট হেমিংয়ে, টমাস মান, জ্যাক লন্ডন প্রমুখের স্বৈরাচার-বিরোধী লেখনীতে। সেই জন্যই পোড়ানো হলো তাঁদের বইপত্র। নিষিদ্ধ হলো রেমার্কের ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট। তাঁর ‘রোড ব্যাক’ উপন্যাসটিও পড়লো হিটলারের রোষানলে। ১৯৩৮-এ বাতিল করা করে দেয়া হয় তাঁর স্বদেশের নাগরিকত্ব। ১৯৩৩-এই দেশান্তরী লেখক সুইটজ়ারল্যান্ড থেকে ফ্রান্স, আমেরিকা থেকে পর্তুগাল— বিশ্বের নানা প্রান্তে খুঁজেছেন এক টুকরো শান্তির আশ্রয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পরাজিত হওয়ার পর জার্মানিতে অভিশাপের মতো নেমে আসে অর্থনৈতিক মন্দা। মুদ্রাস্ফীতি, দারিদ্র, বিশৃঙ্খলা, বেকারত্ব জার্মান জাতির শ্বাসরোধ করে। তখন জার্মানিতে শুরু হয় ইহুদী ও কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ। সেই এলোপাথাড়ি সময়ে সদ্য যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা সৈন্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সমাজের স্বাভাবিক ধারা থেকে।   রাজনৈতিক অস্থিরতা আর দিশাহীন জার্মান অর্থনীতির রুগ্ন পরিবেশে, সক্ষম পুরুষেরা উপযুক্ত কাজ না পেয়ে কলকারখানা, জুয়া, রেস, রেস্তরাঁর ওয়েটার, কনসার্টের সহায়ক, পিয়ানোবাদক… এই সব খুচরো এবং অনিশ্চিত জীবিকা গ্রহণে বাধ্য হলেন। মেয়েদের দিন গুজরানের জন্য হয়ে উঠতে হলো বারের গায়িকা, অভ্যর্থনাকারী, পরিচারিকা, যৌনকর্মী, চিকিৎসালয় ও গির্জার সেবিকা ইত্যাদি।

সৈনিক রেমার্ক দেখেছিলেন, যুদ্ধে উন্মত্ত ফ্যাসিস্ট নাৎসি শক্তি যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়াও তাদের বিরোধী শক্তি কিংবা কণ্ঠকে ঘায়েল করতে তৈরি করেছে নানা নকশা। ‘স্পার্ক অব লাইফ’, ‘আ টাইম টু লাভ অ্যান্ড আ টাইম টু ডাই’ ইত্যাদির মতো কাহিনিতে প্রথম থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত অস্থির সময়ের জীবন্ত ইতিহাস তুলে এনেছেন এরিক মারিয়া রেমার্ক।

জার্মানির ওস্‌নাব্রুক শহরে ১৮৯৮ সালের ২২ জুন রেমার্কের জন্ম। বই বাঁধাইয়ের কাজ করতেন তাঁর বাবা। মা ছিলেন গৃহবধূ। তিন ভাইবোনের মধ্যে রেমার্ক বড়। দুই বোন ছোট। যুদ্ধ থেকে ফিরে পেটের দায়ে গ্রহণ করেছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা। পরে পাথর খোদাই, রেসিং কার ড্রাইভিং, গ্রন্থাগারিক, সাংবাদিকতার মতো বিচিত্র পেশা, কোথাও থিতু হতে পারেননি স্বাধীনচেতা রেমার্ক।

১৯২৫-এ প্রথম বিয়ে। হিটলারের অত্যাচার থেকে বাঁচতে সুইটজ়ারল্যান্ডের পোর্তো রোঙ্কো-তে বাগান বাড়ি কিনে দেশ ত্যাগ করেন তিনি ১৯৩৩ সালে। ১৯৩৭ সালে প্রেমে পড়েন নায়িকা মার্লিন ডিয়েট্রিশ-এর। বছর তিনেকের মতো সম্পর্ক টিকে ছিলো। তারা একে অপরকে যে সব চিঠিপত্র লিখেছিলেন তারই একটি সংকলন পরে প্রকাশিত হয় ‘টেল মি দ্যাট ইউ লাভ মি’ নামে বই হয়ে। ১৯৪৭-এ আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভের পর সেখানে কিছু কাল বসবাস করেন। তার পর ফিরে আসেন সুইটজ়ারল্যান্ডে। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে চূড়ান্ত আইনি বিচ্ছেদ ১৯৫৭ সালে। ১৯৫৮-তে ফের বিয়ে অভিনেত্রী পলেত গদার-কে। লোকার্নোর সেন্ট অ্যাগনিস হাসপাতালে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে সৈনিক-লেখক এরিখ মারিয়া রেমার্ক মারা যান ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭০-এ। মৃত্যুর পাঁচ দশক পরেও তাঁর সৃষ্টির মধ্যে অস্থির পৃথিবী খুঁজে ফেরে মানবিকতা আর শান্তির স্বপক্ষে লড়াই করবার শক্তি।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]