এ আমার নতুন খেলাঘর

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

ফারিয়া আর আমি

ফারিয়া একটু একটু করে বেড়ে উঠছে।আমি যেন তার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠছি।এতো দিন বড় ভাশুর জা এবং শ্বশুর শ্বাশুড়ির সঙ্গে এক বাসায় ছিলাম।ফারিয়া জন্ম নেয়ার মাস দুয়েক আগে নতুন বাসা নিয়েছি।এ বাসাটা একটু যেন বেশী আমার।সঙ্গে শ্বশুর শ্বাশুড়ি আছেন। সেটা অনেক বড় ভরসা।ফারিয়া জন্ম নেয়ার আগ পর্যন্ত তো অসুস্থই ছিলাম।কিন্তু ফারিয়া হওয়ার পর আমি ঝরঝরে হয়ে গেলাম। বলা যায় একা একাই বাচ্চা সামলানো শিখলাম। সত্যিকার অর্থে আমি যেন মাত্রই গৃহিণী হয়ে উঠলাম। বিয়ের ছয় বছর পরে যেন আমার আক্কেল হলো যে আমার রান্নাঘরে কিছু কাজ করা উচিৎ। আমার শ্বাশুড়ি মা এতো ভালো মানুষ ছিলেন যে এই এতো দিন উনি আমাকে রান্নাঘরে একটা নুনের বাটিও এগিয়ে দিতে বলেননি।আমার সকালের নাস্তা হয়তো উনি দু’বার গরম করে টেবিলে দিতেন। আমি হয়তো বাচ্চা নিয়ে ঘুমাচ্ছি।কখনই উনি রেগে যাননি বরং আমার মা আমাকে বলতেন তুমি তোমার শ্বাশুড়ি মাকে রান্নাঘরে সাহায্য করোনা কেন? আমার শ্বাশুড়িমা আমার পক্ষ নিয়ে আমার মা কে বলতেন একেতো ছোট মানুষ তায় আবার দুইটা বাচ্চা,রাতে হয়তো ঠিকঠাক ঘুমাতে পারেনা,ব্যাপার না, একসময় সব করবে দেখবেন! এই কথাগুলো ভেবে আমি যারপরনাই বিস্মিত হই এখনো। একটা মানুষ কতটা উদার হতে পারে!

সত্যিসত্যি হঠাৎই মনে হলো আমার কিছু কাজকর্ম করা দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। আমি একদম বদলে গেলাম। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাসা সাজানো থেকে রান্নাঘর এর কাজ করা সব শুরু করলাম। শ্বাশুড়ি মা দারুণ রাঁধেন,তাঁর রান্নাই শেখার চেষ্টা করলাম।মায়ের এতো সুন্দর রান্না, কিন্তু সেগুলো তো শুধু খেয়েছি, শিখিনি বা চেয়ে দেখিনি কিছুই! এবার শ্বাশুড়িমার রান্নার কৌশল বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। শিখেও যাচ্ছিলাম। তার সঙ্গে পত্রিকা দেখে দেখে হালিম পাস্তা ফালুদা এবং আরও নানাবিধ নাস্তা শিখে যাচ্ছিলাম। রান্নার বেসিক শিখছিলাম। আমি হঠাৎই মোটামুটি সংসারের হাল ধরার কাছাকাছি চলে গেলাম।মেহমান আসলে মেহমানদারি করতে পারছিলাম।এখনো এ কথা গুলো ভাবতে আমার খুবই ভালো লাগছে।

 সে সময়ই আমি গানের টিউশনি করতাম।কারো বাসায় গিয়ে এ কাজ করিনি,আমার বাসাতেই সবাই আসতো। একজন করেই আলাদা আলাদা ভাবে উচ্চাংগ সংগীত শেখাতাম। বেশির ভাগই কিশোরী এবং দু তিন জন বাচ্চাও আমার ছাত্রী ছিলো। সে সময়ের অভিজ্ঞতা বলে এই পৃথিবীর সবচাইতে খারাপ এবং অসম্মানজনক প্রফেশন হয় টিউশনি। যারা গান শিখতো তাদের বেশীরভাগ ছাত্রী এবং তাদের মা বা বোন যারা গার্জিয়ান হিসেবে সঙ্গে আসতো তারা অসম্ভব সম্মান করতো। কিন্তু দুয়েকজন যা ব্যবহার করেছে তাতেই কান ধরেছি যে জীবনে আর কোনদিন কাউকে পয়সা নিয়ে গান শেখাবোনা।লাগছে ভাত-তরকারির রেঁধে বেঁচে খাবো তবুও একাজ করবো না। তাদের আচার আচরণ নিয়ে অনেক কথাই বিস্তারিত বলা যেতো কিন্তু আসলেই তা রুচিসম্মত লেখা হয়না।তাই বিস্তারিত বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখলাম। কিন্তু ভাবতে খুবই কষ্ট হচ্ছে যে ওই টিউশনি ছিলো আমার জীবনের স্ট্রাগল এর অন্যতম অপমানজনক অধ্যায়। আলহামদুলিল্লাহ সে সময় আমি পিছনে ফেলে এসেছি। কিন্তু মানুষের মগজ এমন যে অনেক কিছু ভুলতে চাইলে ভোলা যায়না।মাঝেমধ্যে মনে হয় আল্লাহ যদি স্মৃতি মুছে ফেলার এক টুকরো ইরেজার দিতেন তাহলে খুব ভালো হতো!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে