এ কোন বিধাতা?

শামীম আজাদ

প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা দূর্ভোগ নারী পুরুষ বাছ বিচার করে তার ঘাড়ে এসে পড়ে না। তেমনি সূর্য, জল, হাওয়া ও পাথরে- নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলেরই সমান ভাগ। কিন্তু যখন মানুষ এর দায়িত্ব লাভ করে, ব্যাতয় ঘটে তখনই। সমান মাপেরই অন্য সব মানুষের কাছে সে ঈশ্বর হয়ে ফিল্টার করতে লেগে যায়, কোথায় কি দেবে না দেবে। ঠিক কোরবানীর মাংস ভাগের মতো। সিনা কলিজা স্টেইকের মাংস ছেলেদের জন্য রেখে বাকিটা বরাদ্দ করে পরিবারের নারীদের জন্য। ছাঁকনি নিয়ে যে দাঁড়ায় সে মানুষ, নর।

এখানেই আমার কথা, এই ‘ নর-মানুষ’দের নিয়েই। এরা নিজেদেকে মানব-ঈশ্বর করে নারীর উপরে বজ্র, বৃষ্টি, বান, খরা বইয়ে দেয়। কিন্তু দায়টা দেয় অশরীরি ঈশ্বরের কাঁধে, গ্রন্থের মাথায়। ব্যতিক্রম বাদ দিলে আশ্চর্য হয়ে দেখি, কি অবিস্মরণীয় উপায়ে পুরুষগন নারীদের কাছে ছোট ছোট মানব-ঈশ্বর হয়ে যায়। সংসার রাষ্ট্রে স্বৈরাচারী প্রধান মন্ত্রী হয়ে যায়, প্রেসিডেন্ট হয়ে যায়, অর্থমন্ত্রী হয়ে যায়, হয়ে যায় পীর পয়গম্বর। সে যতই দূর্বল অশক্ত উপার্জন-অক্ষম পুরুষই হোক না কেন। কারণটা এই- নিজের নির্বুদ্ধিতা, অক্ষমতা কিংবা অসহায়ত্ব আড়াল করে তর্জনী তোলার এটাই একমাত্র উপায়। কোন পুরুষ কবে নিজেকে শক্তিহীন স্বীকার করেছে বলুন?

সত্যিকার চেহারা দেখানো তাদের দ্বারা সম্ভব হয় না। সামাজিক চাপে আমরাই তাদের অমন করে তুলেছি। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে তারাও মানুষ। তাদের ও ভয়ভীতি, ক্ষমতা কিংবা অক্ষমতা একজন নারীরই সমান। পুরুষ মানেই বুদ্ধিমান, শক্তিময়, সাহসী, যোদ্ধা না। তুলনামূলকভাবে তাদের দেহগত শক্তি নারীর চেয়ে কিছু বেশি। তো নারীরওতো কিছু ব্যপার ও ক্ষমতা আছে যা পুরুষের চেয়ে বেশি। তাহলে তো কাটাকাটি। সমান সমান। নারীর যে টিঁকে থাকার ক্ষমতা, জন্মদানের ক্ষমতা আছে, দেহ থেকে সন্তানের আহারের উপায় করার যোগ্যতা আছে তাতো পুরুষের নেই! না থাকুক এর কিছু ওর হয়ে বা ওর কিছু এর। এটাতো কোন রেইস না।এরা তো পরস্পরের সম্পূরক এবং পরিপূরক। তাই না? নিজেদের সীমাবদ্ধতা অন্যকে দিয়ে পূর্ণ করলেই হলো। আর সেটাই তো উচিত।

অথচ নর কিনা তার নিজের সুবিধার্থে ঈশ্বরের কাঁধে দোষ দিয়ে সেই আল্লাহ, বিধাতা, বা করুনাময়কে কাটিয়া ছাঁটিয়া, বাটিয়া একজন বর্ণবাদী সেক্সিস্ট করে তুলেছে। এসব নাকি তাঁরই বিধান! হা হা … হাসা ছাড়াতো উপায় দেখিনা। এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের ব্যবধান তৈরী করলো নিজেরা আর ঠেকে গেলেই ঈশ্বরকে ডাকাডাকির ভন্ডামী! এতেই মোক্ষ দেখে মূর্খ বিশ্বে তাই করেই চলেছে। এদিকে মেয়েরা একের পর এক যা যাকে সুকঠিন কাজ বলে, পুরুষের কাজ বলে পরিচিত – যেমন এভারেস্টে ওঠা, প্লেন চালনা, মাটি কাটা, ইট ভাঙা – তার সবই করে সব মিথ ভেঙে দিলো। তারা প্রমান দিতেই থাকলো যে কোন ভাবেই তারা কমতো নয়ই বরং একটু বেশীই ক্ষমতাধর। ছেলেরা এসব কাজ যখন করে তাদের একজন বউ থাকে বা মেয়ে থাকে বা মা থাকে ঘর ও সন্তানদের জন্য। মেয়েদেরতো ‘বউ নেই’। ভাই বাবারা তো মেয়েদের’ কাজ করবেনা। সুতরাং এ যুগের নারীকে মেয়েদের এবং ছেলেদের দু’টো কাজই করতে হচ্ছে,পারছেও। এ কোন ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে অভ্যাসে বিবর্তনের সূত্রেই কম খেয়ে, কম পরে,কম দেখে,কম শুয়ে তারা বেশি দিতে সক্ষম হয়ে গেছে। আর তাতে পুরুষের সকল ক্ষমতা কমতে কমতে শুধু চোঁয়ালে ও হাতে এসে ঠেকেছে। কিন্তু ব্যতিক্রম আছে। আর ব্যতিক্রমই তো সুবিধেবাদীদের গাঁথা নিয়মগুলো খুঁচিয়ে জলের উপর নিয়ে এসেছে।

যা হোক এবার সাঁঝের আগে একবার পড়ুন নারীদের নিয়ে হীন কথা বলেছেন কোন ঈশ্বর, কোন বীর বা কোন পীর? তারা কিন্তু সবাই পুরুষ। এর এন্তার উদাহরণ আছে সামাজিক মাধ্যমেই। নিজে নিজেই ঘেঁটে দেখতে পারেন। আমি শুনেছি লিও টলষ্টয় বলেছেন- ‘নারী সমাজ জীবনে এক অনিবার্য নিরানন্দের উৎস।মেয়েদের একটি সুবিধা হিসেবেই গ্রহণ করা উচিত। তাই যত দূরসম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।’
নেপোলিয়ানের কথা ছিলো নাকি, ‘মেয়েরা আমাদের দাসী হবে, এটাই প্রকৃতির নিয়ম, মেয়েরা আমাদের সম্পত্তি, গাছের ফল – যেমন বাগানের মালিকের সম্পত্তি।’ প্রাচীন এ্যাথেন্সে নাকি বলা হতো, ‘মেয়েদের আত্মা নেই’। হায় হায়! আর আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট নাকি বলে গেছেন, ‘কোনো মেয়ে যখন ভাবে, তখন সে অশুভ জিনিষই ভাবে।’ আমি এ নিয়ে বেনিফিট অব ডাউট রাখতে চাই। এসব ‘গ্রেট ম্যান’রা এসব বলতে পারেন না। নিশ্চয়ই  ষড়যন্ত্র! আর না হলে এ হচ্ছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার রাজনীতি।এ হচ্ছে বিদ্যাবুদ্ধি ও সহিংসতার অপব্যবহার। অশক্ত পুরুষের হাতিয়ার। পিষে ফেল এদের।

আর তাই তারা গ্রেট ম্যান এবং আত্মাহীনা ওম্যান খণার জিহব্বা কেটে নেয়। নারীর সন্তানের জন্য দুধের আধারকে সেক্স সিম্বল করে তাদের স্তন দেখবে বলে তার ওপর কর ধার্য করে। রোকেয়া সাখাওয়াতকে ‘বেগম’ রোকেয়া সাখাওয়াত পূর্ব উপাধি জুড়ে তার গ্রন্থ থেকে পুরুষদের জন্য অস্বস্তিকর বানী মুছে দেয়। বেশী বুদ্ধিমান মেয়েটি মুখ খুললে তাকে পেত্নী আখ্যা দেয়। ক্রীড়া পারদর্শী মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে তার পুরুষ স্বভাব আটকায়। আচ্ছা, যে যে গুণাবলিতে পুরুষের স্থান উচ্চে উঠে যায় তা নারীর আয়ত্বে এলে খারাপ হতে পারে? এরাই আবার আরেকটি হাস্যকর কাণ্ড করে। নরম সরম মানবিক ছেলেটিকে বলে, ও মেয়েদের মতো, ওকে চুড়ি পরাও! কেন ভাই, পুরুষ এ মানবিক গুণধারী হলে তাকে ছোট করে দেখেন কেন? মাসল ফুলিয়ে নারীকে হেনস্থা করলেই সে মহাবীর? আর নিজ প্রিয়া প্রিয়তমার যত্ন নিলে, নারীর ভালবাসার গাছের গোড়ায় জল দিলে সে পুরুষ ‘স্ত্রৈন্য?’ কিন্তু প্রিয়তমের প্রতি একই প্রকাশ ঘটালে সে ‘স্বামী সোহাগিনী’?

এমন কি এ ধরণের নেতিবাচক ধারণার সামান্য পরিবর্তনঘটলেই তা রোধ করার জন্য রসুন ডলার রাজনীতি শুরু হয়ে যায়।বিশ্বব্যপী এ কূটনীতির কারণেই এখনো এক পুরুষের ব্যর্থতা তার একক দূর্বলতা বলে চিহ্নায়ন হচ্ছে – আর এক নারীর ব্যর্থতায় পুরো নারী জাতির। সফলতায় সঙ্গবদ্ধ পুরুষ পুরস্কৃত, আর নারীর অর্জন ব্যতিক্রম। সমাজ বলছে, এভাবেই বিধাতা বেঁধে দিয়েছে। এ কোন বিধাতা? আসলে এ হচ্ছে ঘরের নর বিধাতা। তার বয়স যে কোন হতে পারে। ঘরভরা কন্যা শিশু, কিশোরী তরুনী ও এক পুত্র সন্তান, সে একাই  যথেষ্ট। সেই পুঁচকেই কিন্তু সব অন্যায় নিয়মাবলী শেখে তখন থেকেই। বলে আমি নই আমি নই এর দায় অদৃশ্য, ভূত, বৈদিক- দৈবিকের। এতে সে মহা অযোগ্য হলেও এ পৃথিবীর তাবত বস্তুগত, বুদ্ধিগত সকল সম্পদের নিয়ন্ত্রনটা তারই হাতে থাকে যে ! সবচেয়ে বড় কথা থাকে সন্ত্রাস করার, পাথর ছোঁড়ার, দোর্‌রা মারার অধিকার।

তাহলে এ যে কুকর্ম ও অন্যায় তারা কি তা জ্ঞান করে না। এমনকি তার নিজ কন্যা ও মাতার সঙ্গেও ! স্ত্রীর কথা বাদ দিলাম-স্ত্রী তো সারাজীবনই ‘পর’, ভোগের, ব্যবহারের ও বিনা বেতনে কাজের লোক। সম্পত্তির হিস্যাতে তার কথা ভাবনাতেই রাখতে হয় না। বাকি দু সম্পর্কেই যথাসামান্য একটু ‘কিন্তু’ উঠে এসে কুত কুত করে ।কিন্তু বৃহত্তর ব্রাদারহুডের কাছে সে প্রেমও পরাজিত হয়।

ছবি: গুগল