এ কোন সকাল জীবনে আমার

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

নতুন একটা বাসা,ছোট একটা বাসা, কিন্তু খুবই সুন্দর। খুব সাধারণ জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো। আমার বন্ধু আফরিন বাসা দেখতে এসে বলে কি রে কনক,তোর বাসা ছবি ছবি লাগে।এমন সাধারণ অথচ এতো অসাধারণ! আমি তৃপ্তি ভরা প্রাণে কেঁদে ফেলি।সাততলার উপরে সকালে পূবের আলোয় একদম সোনালী হয়ে ওঠে আমার বাসা।আবার খোলা রান্নাঘরের আকাশী সেট আপ এর সঙ্গে আকাশী রং থাই স্লাইড এ সোনালী ভোরকেই মনে হয় কচি নীল দিগন্ত! কোথা থেকে যেন কবুতর আসে।আমি ছোট বাটিতে করে তাদের খাবার দেই।দিনদিনই তাদের আহ্লাদ বাড়তে থাকে। তারা দলে ভারী হয়ে ওঠে। শেষে এমন অবস্থা হয় যে আমাকে না পেলে থাই স্লাইডে ঠোঁকরাতে থাকে।জানান দেয় মা জননী, আমরা এসেছি, খাবার দাও।আমি তাড়াতাড়ি তাদের বাটিতে গম ভুট্টা সরিষাদানা রাখি।পানির বাটিতে পানি।ওমা! জানালা খোলা পেয়ে তারা ফারিয়ার বিছানার বালিশে বসে গা ঝেড়েঝুড়ে গর্ত করে নিজেকে সেট করে নেয়।সে এক অপূর্ব দৃশ্য! ওই বাসাতেই আমি আরও দু’বার মেরিল-প্রথম আলো পুরষ্কার পাই।

ক্যারিয়ারের উচ্চতার তুঙ্গে অবস্থান করছিলাম হয়তো। বরাবরের মতই আমি সেগুলো বুঝতে পারিনি।আমি ঘরে বাইরে কর্মীর মতো কাজ করে গেছি।আজ হয়তো ফিল্মের গান গাইলাম কাল টিভিসির জিঙ্গেল। পড়শু কোন অফিসের অফিসিয়াল আনন্দানুষ্ঠানে আমন্ত্রিত কণ্ঠশিল্পী। তারপরদিন সকালে চিটাগং রওনা দিলাম। হয়তো চিটাগং। এজীবনে সারা বাংলাদেশে যত জেলায় যত অনুষ্ঠান করেছি তার অর্ধেক অনুষ্ঠানই করেছি চিটাগাং এ। আবার সেই চিটাগং এ যত অনুষ্ঠান করেছি তার ভেতর বেশি অনুষ্ঠান করেছি চিটাগাং সিনিয়র ক্লাব ও চিটাগং ক্লাবে।চিটাগং এর অধিবাসীরা খুব ভালো শ্রোতা। তারা গান শোনার উপলক্ষ তৈরি করেন। নানা ছুতোয় তারা নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সেখানে আমি, সুবির’দা তাদের খুবই পছন্দের শিল্পী ছিলাম। এমন ও দিন গেছে চিটাগং থেকে আজ গান গেয়ে ঢাকায় পৌঁছেই তিনদিন পরেই আবারও চিটাগং যেতে হচ্ছে।চিটাগং ক্লাব যখন পাহাড়ের উপর সাধারণ হলরুম আর বোর্ডারদের থাকার জন্য পাহাড়ের পাদদেশে কুড়েঘর ও টিনের ঘর ছিলো তখন থেকেই আমরা সেখানে গাই।

চোখের সামনেই চিটাগং ক্লাব, চিটাগং সিনিয়র ক্লাব নতুন ডিজাইন হলো, অর্থ প্রাচুর্যের ছাপ পড়লো কিন্তু দর্শক শ্রোতাদের এক মাপের নিরলস ভালোবাসা আমার আজীবন এর পাথেয় হয়ে থাকবে।চিটাগং ক্লাবের যে ক্রু গন আছেন তাদের ভালোবাসা শ্রদ্ধা আমি কখনো ভুলবো না।তাদের আমি এবং আমার হাজব্যান্ড যেমন ভালোবাসতাম উনারাও তারচেয়ে বেশি আমাদের যত্নআত্মি নিতেন। তাদের কতজন আমাদের চোখের সামনে বৃদ্ধ হলেন।আমার হাজব্যান্ড একদম ডোমেস্টিক ফ্লাইট এ কমফোর্ট ফিল  করতেন না।আমরা বলা যায় সারাজীবনই সোহাগ পরিবহনে করে চিটাগং যেতাম। একদম প্রথম দিকের এক্সক্লুসিভ দুটো সীট আমাদের জন্য বলাই থাকতো।আরেকটা কথা এখানে উল্লেখ্য যে সারা বাংলাদেশ এবং সারা পৃথিবীতে আমাদের মিউজিশিয়ান ভাইদের নিতে হতো। কিন্তু চিটাগং একমাত্র স্থান যেখানে আমাদের তা করতে হতো না।ওই যে বললাম তারা খুব গান শোনেন, তাই তাদের নিজেদের ভেতর বেশ কয়েক সেট মিউজিশিয়ানদের দল গড়ে উঠেছিলো। আমরা চোখ বন্ধ করে চিটাগং চলে যেতাম এবং তাদের বাদ্যের উপর ভর করে গান গাইতাম। চিটাগং ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মোটামুটি সব জেলায় এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমরা একাধিকবার গান গেয়েছি।একাধিক বার না বলে শতশত বার বললে বলা ঠিক হবে।

আমাকে চট্রগ্রামের তখনকার প্রয়াত মেয়র শ্রদ্ধেয় মহিউদ্দিন চৌধুরী সাহেব বোনের মতো স্নেহ করতেন। উনিও যে কোন সামাজিক অনুষ্ঠান, গনজমায়েত সামাজিক উৎসব এ আমাকে ডাকতেন। তখন থাকতাম মেয়র সাহেবের বাংলোতে।চিটাগং এর কিবোর্ড বাদক অভিজিৎ দা,রুপতনু, অসীম সহ আরও অনেকের বাদনে আমি অসংখ্য বার গেয়েছি।বস্তুত মঞ্চে নিজেকে খোলার সাহস আমি চিটাগং এ-ই পেয়েছি। তাদের সরাসরি ভালোবাসা আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছে যে মঞ্চে আমি গাইতে পারি।আমাদের একজন খুব ভালো কণ্ঠশিল্পী আব্দুল মান্নান রানা ভাই ও আমাকে অনেক বার চিটাগং নিয়ে গেছেন গাইবার জন্য। যাইহোক, বলছিলাম ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকার দিনগুলোর গল্প। খুবই সত্যি কথা যে অত ব্যাস্ত থাকার পরেও আমি একফোঁটা ও বুঝিনি যে আমার একটা রাজ্য তৈরি হয়েছে। সেটা না বুঝতে পারা যে কত ভালো হয়েছে তা বুঝি একমাত্র আমি। বুঝলে সামনে এগোনো বড় কঠিন হয়ে যেতো। না বোঝাটাই আমার পথকে আরও মসৃন করেছে। আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

 


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box