ওদের আপনিই বলে দেন কে ভালো গায়ক, আপনি না মান্না দে?

স্বরূপ সোহান (লেখক)

ভেবেছিলাম কিছু লিখবো না। লিখে কি হয়! লিখে কি হারানো সময়টা ফিরিয়ে আনা যায় । লিখে কি ভালবাসার মানুষকে অন্যজগত থেকে চাইলেই পাওয়া যায়। কঠিন বাস্তবতার সামনে দাড়ালে অসহায়ত্ব গ্রাস করে।

এই অসহায়ত্ব থেকেই জন্ম নেয় শূণ্যতার। বাচ্চু ভাইয়ের চলে যাওয়াটা আমার জন্যে তেমনই এক অসহায়ত্বের শূণ্যতায় ডুবে যাওয়া।

অথচ কি মায়াময ছিল সেই দিনগুলি। নব্বই দশক কেবল শুরু। আমাদের বাসা ঢাকা কলেজের উল্টোদিকে। সবে স্কুল ফাইনাল শেষ। সারা দেশ তখন ব্যান্ড জ্বরে কাঁপছে । পপ আর মেলডি গানছাপিয়ে রক, হার্ড রক আর মেটালের দাপাদাপি। ঢাকা কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বাসা বলে একটা কনসার্টও মিস যেত না। প্রায় প্রতিদিনই নিউমার্কেট যাওয়া। খুঁজে ফেরা নতুন ব্যান্ডের ক্যাসেট। ঠিক এরকম সময়ই কানে এলো আইয়ুব বাচ্চু তার দল সোলস ছাড়ছেন। আমি তার কিছুদিন আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হলের মাঠে সোলসের কনসার্ট দেখেছি। ওই কনসার্টে শেষগান ছিল ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে।’

গানে আইয়ুব বাচ্চুর গীটার বাজানো সেটাই আমার প্রথম দেখা। মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কী যে সুন্দর বাজানো! তখনই ভেবে রেখেছিলাম সোলসের নতুন অ্যালবামটা কিনতেই হবে শুধুমাত্র ঘুম ভাঙ্গা শহরে গানে আইয়ুব বাচ্চুর গীটারটা শুনবো বলে। ওই কনসার্টেই শুনলাম গানের সুর বাচ্চু ভাইয়ের। তাই যখন শুনলাম আইয়ুব বাচ্চু সোলস ছেড়ে দিচ্ছেন মনটা বিষাদে ভরে গেল। আর তো ঘুম ভাঙ্গা শহরে বাচ্চু ভাইয়ের গীটার শোনা হবে না। কিন্তু না। জানা গেল আইয়ু্ব বাচ্চু এল আর বি ব্যান্ড করেছেন। বাংলাদেশে প্রথম ডাবল অ্যালবাম বের হচ্ছে। আর সবচাইতে বড় খবর হচ্ছে ওই অ্যালবামে ঘুম ভাঙ্গা শহরে গানটা থাকছে। একই সংগে চরম আনন্দ আর বেদনা এসে মনে ভর করেছিল।আইয়ুব বাচ্চুর নতুন ব্যান্ড এল আর বি তে আমার প্রিয় গানটি থাকছে আবার আমার প্রিয়ব্যান্ড সোলসের কি হবে? মিশ্র এই অনুভুতি নিয়ে সাদা রংয়ের কাভারে কিনে আনলাম এল আর বি র ডাবল আ্যালবাম। এরপর? এরপর আমার দিন রাত একাকার হয়ে গেল। সারাদিন শুধু এলআরবি আর আইয়ুব বাচ্চু। হকার, মাধবী, ফেরারী মন থেকে তুমি ছিলে । কোনটার কথা বলবো। আমরা বন্ধুরা মিলে রীতিমত গবেষনা করতাম আইয়ুব বাচ্চুর গিটারের কোন টিউনটা পাশ্চাত্যের কোন গীটারিষ্টকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। মনে হতো বাচ্চু ভাইকে গিয়ে বলি কিভাবে সম্ভব  এরকম বাজানো। কিন্তু কিভাবে উনাকে পাবো আমরা ?

পেলাম। বাচ্চু ভাইকে আমি পেলাম। কিভাবে? ময়না গানে আইয়ুব বাচ্চু পাড়াতো বোন ময়নার সংগে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, আর আমি আমার বাচ্চুভাইকে পেলাম পাড়াতো জামাই হিসেবে। আমার বাসার ঠিক উল্টোদিকের বাসার জামাই হয়ে গেলেন আইয়ুব বাচ্চু পাড়াতো বোন চন্দনাকে বিয়ে করে। আমার বাসার জানালায় এরপর থেকে আমি জোরে এলআরবির গান ছেড়ে পাড়া কাঁপিয়ে জানান দিতাম আমাদের বাচ্চু ভাই আমাদের পাড়ার নতুন জামাই।আসল ফন্দি হলো বাচ্চু ভাইয়ের চোখে পড়া। বাচ্চু ভাই প্রায়দিনই বেবী ট্যাক্সি করে চন্দনা ভাবীদের গেটে এসে নামতেন। স্লিভলেস কালো গেন্জি, ব্লু জিন্স আর চোখে কালো সানগ্লাস এই হলো ৯০ এর আইয়ুব বাচ্চু। কাঁধে অবশ্যই রেক্সিনে মোড়ানো ব্যাগে ঝোলানো তার অতিপ্রিয় গীটার। কতদিন এমন হয়েছে বাসার নিচে বেবীট্যাক্সির আওয়াজ শুনলেই হকার বা মাধবীর ভলিউম বাড়িয়ে জানালা দিয়ে বাচ্চু ভাইয়ের বেবি থেকে নেমে ভাড়া মেটানো দেখতাম আর মনে মনে ভাবতাম ইশ্ লোকটার কি কোনো আগ্রহ নেই একটু এই জানালাটার দিকে তাকানোর। এমন তো না যে তিনি শুনতে পাচ্ছেন না! তারই তো গান চড়া ভলিউমে বাজছে।কিন্তু না, গম্ভীর বাচ্চু ভাই সব উপেক্ষা করে চন্দনা ভাবীদের বাসার গেট খুলে ভিতরে হারিয়ে যেতেন। আর আমি বিরস মনে আবার পরেরদিনের জন্যে একইভাবে অপেক্ষা করতাম আর ভাবতাম আমাদের এই পাড়াতো দুলাভাইয়ের মন গলবে কবে? কবে আমার জানালার দিকে তাকিয়ে তিনি হাত নাড়বেন।

সুযোগটা যে এভাবে আসবে বুঝিনি। পাশের বাসা বলে দাওয়াত পেলাম বাচ্চু  ভাইয়ের শ্যালকের বিয়েতে। চরম উত্তেজনা নিয়ে গেলাম বিয়ে খেতে আমার  বাবার সংগে আমরা দুই ভাই। আমার উত্তেজনায় আর তর সইছে না আইয়ুব বাচ্চুকে কাছে থেকে দেখবো বলে। আমি আর আমার ছোট ভাই বসেছি আমার বাবার পাশে। একেবারেই আচমকা আমার বাবা একটা কাজ করে বসলেন।বাচ্চু ভাই আমাদের টেবিলের পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে আমার বাবা অনেকটাই তার পথ আগলে দাঁড়ালেন । কুশল বিনিময় করে আমাদের দুই ভাইকে দেখিয়ে বলে বসলেন, ‘এই যে দেখেন আমার দুইছেলে, সারাদিনরাত আপনার গান শোনে, আর আমার সংগে তর্ক করে আপনি নাকি মান্না দে, হেমন্তের চাইতেও নাকি ভাল গান করেন।আমরা তো পুরান দিনের মানুষ, এদের গানই শুনি। আচ্ছা ওদের আপনিই বলে দেন কে ভালো গায়ক? আপনি না মান্না দে?’ আমার বাবার এই অদ্ভুত প্রশ্নে চরম বিব্রত হলাম আমি আর আমার ভাই। বাচ্চু ভাইয়ের সংগে প্রথম পরিচয়ে আমার মনে হচ্ছিলো মাটির সংগে মিশে যাই।

আমাদের বাঁচালেন বাচ্চু ভাই। কাছে এসে আমাদের দুই ভাইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে কানে হাত দিয়ে জিভ কেটে হেসে দিয়ে বললেন, কী বলো তোমরা, মান্না দে হেমন্তর মতো শিল্পীর সংগে আমার তুলনা?? আমি তো উনাদের কাছে কিছুই না।  আমার জন্যে এটা বেয়াদপি। তোমরা আমার গান শোনো অবশ্যই ভালো কিন্তু উনাদের অবশ্যই সম্মান করবে’। এই হলো আমার সংগে বাচ্চু ভাইয়ের পরিচয়ের শুরু।

এরপর সময় আর জল দুইটাই অনেক গড়িয়েছে। আমি সাংবাদিকতা শুরু করলাম মধ্য নব্বইতে। তখন ভোরের কাগজে কাজ করি। পেশাগত কাজে বাচ্চু ভাইয়ের সংগে আরো ঘনিষ্টতা হয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাচ্চু ভাইয়ের সংগে দেখা হলেই বুকে জড়িয়ে ধরতেন। গান নিয়ে, গীটার বাজানো নিয়ে কত কত পরিকল্পনা তার। একদম ষোলোআনা মিউজিশিয়ান ছিলেন বাচ্চু ভাই। বাচ্চু ভাই গীটার নিয়ে, গানের কথা নিয়ে, সুর নিয়ে নিরীক্ষা করতেন। তার বড় প্রমান হলো এলআরবির আ্যালবাম ‘তবুও’। এই আ্যালবামটা শুনলে বোঝা যায় বাচ্চু সময়ের আগে চলতেন। তবুও আ্যলবামটিনিয়ে বাচ্চু নিজেই বলেছিলেন, তবুও বাংলাদেশে সময়ের আগেই চলে এসেছে। নিরীক্ষা করার সাহস বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকে একমাত্র আইয়ুব বাচ্চুরই ছিল। তারও বেশ পরে আমি যখন প্রথম আলো পত্রিকায় কাজ করি তখন মেরিল প্রথম আলোর প্রথম তিনটা অনুষ্ঠানের আমি অফিসিয়াল ইভেন্ট এক্সিকিউটিভ ছিলাম। ওই সুত্রে বাচ্চু ভাইয়ের সংগে আমার স্মৃতি বাড়তেই থাকে।

প্র্যাকটিস প্যাডে দিনরাত আড্ডা আর কাজ। মনে আছে মেরিল প্রথম আলোর টাইটেল সং হবে। আমাদের সে কী উত্তজনা। বাচ্চু ভাই, আমি আর আনিসুল হক ভাই বসলাম। আমাকে বাচ্চু ভাই মাত্র এক লাইন, ‘মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার’ একটা স্লিপে লিখে আমাকে দেখিয়ে বললেন, স্বরূপ কালকে পেয়ে যাবি’। আমি অবাক হয়ে বললাম মাত্র এক লাইনে সুর! বাচ্চু ভাই বললেন কেনো হবে না ? এক লাইনেই হবে। সত্যি তাই। সুর হলো। এখনো এত বছর পরেও মেরিল প্রথম আলোর টাইটেল সং সেটাই। এই হলো আমাদের বাচ্চু ভাই।

আমরা একটা প্রজন্ম বাচ্চু ভাইয়ের কাছ থেকে শুধু নিয়েই গেছি। আনন্দ, বিরহ, ভাললাগা, ভালবাসা, প্রেম, দেশ, মাটি সবকিছুতেই বাচ্চু ভাইয়ের সুরের কাছে গীটারের কাছে আমাদের ফিরে যাওয়া। তাই বাচ্চু ভাইকে নিয়ে একটা লেখা লিখলেই কি সব হয়ে গেল?

আজকাল হঠাৎ সবকিছু পেয়ে যাওয়ার এই দেশে বাচ্চু ভাইয়ের মাপের একজন শিল্পীকে নিয়ে একটা লেখা না লিখলেও কিছু যায় আসেনা।

স্বরূপ সোহান
ছবিঃ গুগল