ওপারে তুমি ভালো থাকবে নুসরাত

লুৎফুল কবির রনি

নুসরাত একটি চিরকুট লিখেছিলো। তাতে ধিক্কার ফুটে উঠেছে সেই লালসা চরিতার্থ করতে চাওয়া সিরাজ উদদৌলার প্রতি। তাতে প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে। তাতে প্রশ্ন রেখে গিয়েছিলো নুসরাত, কেন তার সহপাঠীরা মেয়ে হয়েও ধর্ষক, নিপীড়ক, ইতর, কাঠমোল্লা সিরাজের পক্ষ নিচ্ছে। চিঠিতে লেখা, ‘…তোরা সিরাজ উদ দৌলা সম্পর্কে সব জানার পরও কীভাবে তার মুক্তি চাইতেছিস।

তোরা জানিস না, ওইদিন রুমে কি হইছে? উনি আমার কোন জাগায় হাত দিয়েছে এবং আরো কোন জায়গায় হাত দেয়ার চেষ্টা করেছে, উনি আমায় বলতেছে- নুসরাত ডং করিসনা। তুই প্রেম করিস না। ছেলেদের সাথে প্রেম করতে ভালো লাগে। ওরা তোরে কি দিতে পারবে? আমি তোকে পরীক্ষার সময় প্রশ্ন দেবো। আমি শুধু আমার শরীর দিতাম ওরে….’

শরীরের ৮০ ভাগ পুড়ে গিয়েছিল নুসরাতের। ফেনীর সোনাগাজীর সেই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাতের পুড়ে যাওয়ার দহনে জ্বলেছে গোটা বাংলাদেশও। নুসরাতের মৃত্যুতে আমাদের সামনে আরো নগ্ন হয়ে ফুটে উঠেছে নারীদের নিরাপত্তাহীনতা , এই সমাজের কিছু কীটের মানসিকতা। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করাতে নুসরাতের উপর যে অত্যাচার হয়েছে, নৃশংসতা হয়েছে তা নজিরবিহীন।

নুসরাত বাঁচতে চেয়েছিলো। প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলো। বলেছিলো, ‘…আমি লড়বো শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে। সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করবো না। মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া। আমি মরবো না, আমি বাঁচবো। আমি তাকে শাস্তি দেবো। যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেবো যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নিবে। আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেবো। ইনশাআল্লাহ।’

কিন্তু নুসরাত বাঁচেনি।তবে নুসরাত মুখোশ খুলে গিয়েছে ধর্ষকের। নুসরাত সমাজের বিবেক হয়ে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে গেছে। নুসরাতের চিরকুট দেখে তার বেঁচে থাকার আকুতি বোঝা গিয়েছিলো। বৈশাখ এসেছে, শহরে তীব্র দাবদাহন। গা পুড়ে যায় রোদে। এইটুকু সহ্য করতে পারি না আমরা। অথচ, নুসরাতকে মাত্র পাঁচ মিনিটে কয়েকজন মিলে জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়েছে। গোটা শরীরে দাবানল, কি যন্ত্রণা, কি কষ্ট বহন করেছে মেয়েটা। তবুও প্রতিবাদ করার জন্য হলেও বাঁচতে চেয়েছিল নুসরাত। যে অগ্নিশিখায় পুড়ে নুসরাত প্রতিবাদের অগ্নিশিখা জ্বালিয়েছে, এই প্রতিবাদ জারি রাখা জরুরি নুসরাতের জন্য, সকল মেয়ের নিরাপত্তার জন্য।

জনপ্রিয় ব্যান্ড দল চিরকুট নুসরাতকে ট্রিবিউট দিয়ে তাই একটি গান প্রকাশ করেছে ইউটিউবে, গানের শিরোনাম ‘মানুষ’। নুসরাতের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই গান, এই ট্রিবিউট। গানটির ভিডিও ধারণ করেছেন স্থপতি মারুফ। জিওশ্রেড বাজিয়েছেন নীরব। গানটি ফেসবুকে প্রকাশ করে ব্যান্ডের প্রধান ভোকাল সুমী লিখেছেন, ‘বিচার চাইতে গিয়ে আগুনে পোড়ার ঠিক শেষ মুহূর্তে জানি না নুসরাতের এমনটাই মনে হয়েছিলো কি না। এপারে জীবন ভার, রূঢ়, বর্বর, অস্বাভাবিক। ওপারে তুমি নিশ্চয়ই ভালো থাকবে নুসরাত।’ চিরকুটের আশা মানুষ মানবিক হয়ে উঠবে। আমিও বলি, অমানুষরা মানুষ হয়ে উঠুক।

‘মানুষ মানুষ কত মানুষ
আমার মানুষ কই,
আসমান ভাইঙ্গা জ্যোস্না পড়ে,
একলা জেগে রই…
পারলা দয়াল পারলা,
এই মরারেই মারলা…।’

ছবি:গুগল