ওরে আমার রাজেশ্বরী…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

গৌতম ঘোষ্

‘‌পদ্মা নদীর মাঝি’ চিত্রনাট্য লেখার পর্যায়ে আমি গবেষণা করতে গিয়ে জেনেছিলাম ইলিশের একটা অদ্ভুত নাম। জেলেরা বা গ্রামীণ লোকেরা ‘রাজেশ্বরী’ বলে সম্বোধন করে। এই নামটা আমি ব্যবহার করি। দৃশ্যে একটা সময় যখন কুবেরের জালে আর ইলিশ উঠছে না তখন ধনঞ্জয় ও অন্য যারা ছিলো তারা বলে, ‘‌কোন অতলে হারাইলি ওরে আমার রাজেশ্বরী!’‌ কথাগুলো স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ্।

সময়টা এখন ইলিশের। যাকে বলে মৌসুম। মাছের বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়বেই ঝকঝকে ধারালো ইলিশের স্তুপ। ইলিশের সঙ্গে বাঙালির সারা জীবনের এক রসময় সম্পর্ক। সে ইলিশ ভাজাই হোক বা ঝোলময় তা বাঙালির খাবার টেবিলে আসবেই। এমনি-ই অপ্রতিরোধ্য এই ইলিশ মাছ।

গৌতম ঘোষ বাংলাদেশে এসেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের চিত্ররূপ দিতে। বহু বছর আগে এ দেশে এসে ইলিশের মৌসুমে ইলিশ মাছ খাওয়ার বিবরণ দিয়েছেন তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায়।

‘ইলিশের নস্টালজিয়া নিয়ে ছবি করেছিলাম— ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। মূলত মাটির কাছাকাছি একদল মানুষ ইলিশ মাছকে কেন্দ্র করেই যাদের জীবনধারণ তাদের নিয়ে। সেই সুবাদেই আমি দেখেছিলাম তখনকার দিনেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা গরিব জেলে–মাঝিদের নানা দিক থেকে বঞ্চিত করতো। কাজেই, যত পরিমাণ মাছ জালে উঠতো মাঝিরা অনেক সময়েই সম্পূর্ণটা বিক্রি করে উঠতে পারতো না ব্যবসায়ীদের কাছে। অনেক মাছ রয়ে যেত। তখন সেই বাড়তি মাছগুলোকে কড়াইয়ে পরপর সাজিয়ে তাতে আঁচ দিয়ে তেল বের করতো। সেই তেল ওদের কুপি জ্বালানোর কাজে ব্যবহার হতো। আমি খানিকটা নিজের চোখে দেখেছি আর্থিক প্রতিকূলতার সঙ্গে ওদের জীবন-সংগ্রাম।’‌
‘পদ্মা নদীর মাঝি’ ছবির শুটিং শুরু হয়েছিল ভাদ্র মাসে। তখন ঘোর বর্ষা। একেবারে ইলিশের মরশুম। ঠিক যে লোকেশনে শুটিং হয়েছিলো, সেই সময় এখনকার মতো সর্বত্র এত হোটেলের আধিক্য ছিলো না। ইউনিটের একদল থাকতো একটি স্কুলবাড়িতে। আরেক দল ছোট কুঠুরি বাংলোতে। তবে রান্না, খাওয়াদাওয়া সবই একসঙ্গে হতো। কলকাতার মানুষেরা অঢেল ইলিশ একসঙ্গে দেখে প্রায় দিশেহারা হয়ে গেলো। রান্নাঘরে প্রতিদিনই দু’‌বেলা করে চলতে থাকল নানা রকম ইলিশের পদ। কেউ-কেউ আবার সকালে জলখাবারে খেত মুড়ি ও ইলিশ মাছ ভাজা। তারপর দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকে ভাতের পাতে প্রথম আসতো তেতো ইলিশ— করলা দিয়ে ইলিশের ডিম ভাজা, লুকা–ভাজা, তা ছাড়া ভাজায়, ঝোলে, পাতুরিতে পরপর ইলিশের আইটেম। অফুরন্ত ইলিশ— যে যতো ইচ্ছে খেতে পারে। গোনাগুনতির কোনও ব্যাপার ছিলো না। খাওয়ার শেষে ইলিশের তেল গড়াগড়ি যেতো।

এই প্রসঙ্গে গৌতম ঘোষ স্মৃতির পুরনো পাতা উল্টাতে গিয়ে বললেন, ‘‌আমাদের শুটিং যে চরে হচ্ছিলো সেখানে টাটকা ইলিশ মাছ রান্না করে খাওয়া হয়েছিলো একবারে অন্য রকম স্টাইলে। টাটকা ইলিশ মাছ তেল, নুন, কাচালঙ্কা দিয়ে চরে বালির মধ্যে সরায় করে পুঁতে রাখা হতো। সত্যি বলতে কী, সেই ভাপা–ইলিশের স্বাদ অতুলনীয়। আজীবন আমার মুখে লেগে থাকবে। এ এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।’‌
এদিকে ইউনিট মেম্বাররা প্রাণ ভরে ইলিশ খাচ্ছে আর আনন্দ করে শুটিং করে চলছে। তবে এমনটা চলতে চলতে একটা সময় এলো যখন কম-বেশি প্রত্যেকেই বলতে লাগলো, ইলিশ আর খাবো না। কারণ প্রতিদিন এত পরিমাণ ইলিশ হজম করা অতি দুরূহ কাজ। ততদিনে ইলিশ খেয়ে–খেয়ে পেটের একেবারে কাহিল অবস্থা।

বিভিন্ন ঋতুতে পদ্মায় শুটিং চলেছিলো। ছবিতে জেলেপাড়া বাদ দিয়ে যাবতীয় দৃশ্য নেওয়া হয়েছিলো বাংলাদেশে মানিকগঞ্জের কাছে একটা জায়গায়। আর জেলে গ্রামটা তৈরি হয়েছিলো ভারতের কাকদ্বীপ অঞ্চলে। সেখানে গঙ্গা প্রায় পদ্মার মতোই চওড়া। ফলে সিনেমায় গ্রামের পিছন দিয়ে বয়ে চলা গঙ্গাকে দেখে পদ্মা বলেই মনে হয়েছিলো দর্শকদের কাছে।

কিন্তু হঠাৎ একটা সমস্যায় পড়েছিলেন গৌতম ঘোষ। ভাদ্র মাসে তোলা ইলিশের যে শট নেওয়া হয়েছিলো তার কন্টিনিউটির কী হবে? অর্থাৎ শুটিংয়ের প্রথম শিডিউলের সেই একই মাছের শট চিত্রনাট্য অনুসারে আবার রয়েছে জেলে–গ্রামে। কিন্তু ওই গ্রামপর্বের শুটিং হওয়ার কথা জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি মাসে। সত্যি বেশ চিন্তার বিষয়। সহকারী পরিচালক থেকে আর্ট ডিরেক্টর সকলের মাথায় এই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রযোজক হাবিবুর রহমান খানের কাছে বড় ডিপ ফ্রিজার ছিলো। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তাতে বড়–বড় সাইজের ইলিশগুলোকে রেখে দেওয়া হবে। এবং এর প্রায় পাঁচ–ছয় মাস পরে সেই পদ্মার ইলিশ দিয়ে আবার শুটিং করা হলো ভারতের কাকদ্বীপে।
সিনেমায় মাছের কন্টিনিউটি রক্ষার প্রসঙ্গে স্মৃতি রোমন্থন করে গৌতম ঘোষ হাসতে হাসতে জানালেন, ‘‌ওই সিকোয়েন্সগুলো শুটিং হয়ে যাওয়ার পর প্রোডাকশন ম্যানেজার দিলীপবাবু এসে আমাকে বলেছিলেন, সবকটা ইলিশ ভাল আছে। এগুলো কি ইউনিট মেম্বারদের খাওয়ানো যাবে? প্রস্তাব শুনে সকলে রাজি। উৎপলদা (দত্ত), রবিদা (ঘোষ), রূপা (গঙ্গোপাধ্যায়)–সহ অন্যান্য অভিনেতা–অভিনেত্রী এবং সব টেকনিশিয়ানের সঙ্গে বসে তৃপ্তি করে আমিও সেই ইলিশ খেয়েছিলাম। শীতকালে অর্থাৎ অকালে ইলিশ খাওয়ার আনন্দ যে কতখানি হতে পারে তা আমার ধারণার অতীত ছিল। একটি বিশেষ মাছ নিয়ে এমন মাদকতা বোধহয় বাঙালি ছাড়া অন্য কোনও জাতির পক্ষে করা সম্ভব নয়।’‌

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ দৈনিক আজকাল
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]