ওলগার জীবন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জহিরুল চৌধুরী

(নিউইয়র্ক থেকে):ওলগার বাড়ির সামনে মস্ত উঁচু লোহার শিকের গেইট। শিকের মাথাও সুচালো। উচ্চতা এমন যে হাত উঁজিয়েও নাগাল মেলে না। পাশে দুই গাড়ি যাতায়াতের সমান দু’টি দরজা। গেইটের দুই পাশে আবার কুড়ি হাত করে ততোধিক উঁচু শিকের বেড়া মিশে গেছে গভীর জঙ্গলের সঙ্গে।

আমার ছাত্রটির নাম নিকোলাস। পড়ে কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে। এখনো তার নিরাপদ ড্রাইভিং শেখা হয়নি। তাকে গত দুই মাস ধরে কৌশল শেখাতে শেখাতে আমি প্রায় ক্লান্ত। আজ তার ইচ্ছে হলো গাড়ি চালিয়ে দাদীমাকে দেখাতে যাবে। এখন সে আর ছোট্ট খোকা নয়।

আমাকে অনুরোধ করলো- ড্রাইভিং-এর কুড়ি মাইল পথ পাশে বসে থাকতে। আমি তাই করলাম। পথিমধ্যে আমার প্রস্রাবের বেগ পেলে তাকে গাড়ি থামাতে বললাম কোনো সার্ভিস স্টেশনে। উল্টো সে আমাকে বললো- ৮–১০ মিনিট চেপে রাখতে পারলে ওই সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাবে দাদীর বাসায়। আর সেখানে আমি আমার প্রাকৃতিক কার্য সেরে নিতে পারি। আমি বললাম- অসুবিধা নেই, আমি চেপে রাখতে পারবো। তুমি চালিয়ে যাও।

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। হাইওয়ে ১৯৯-এর উপর দিয়ে চলে গেছে পথটা। আমি জিপিএস ধরে নিকোলাসকে নির্দেশনা দিচ্ছিলাম। গাড়ি ক্রমেই উপরে উঠছিলো। নিক (নিকোলাসের সংক্ষিপ্ত নাম)-এর গাড়ি চালনার উপর এমনিতেই আমার ভরসা কম। ফলে প্রতিটা বাঁক পেরুনোর সময় আঁৎকে উঠছিলাম!

প্রধান রাস্তা থেকে বাড়ির গলিটিও জঙ্গলাকীর্ণ। কোনোমতে গেইটের সামনে গাড়ি পার্ক করে আমি দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। মনে মনে ভাবলাম- উপায়ান্তর না হলে কয়েক কদম এগিয়ে জঙ্গলেই প্রাকৃতিক কার্য করে ফেলবো।

দাদীর বাসায় গেইট তালা বন্ধ দেখে আমার ভিড়মি খাবার যোগাড়। এই প্রথম আমি আমেরিকায় কারো বাড়িতে এতো উঁচু সীমানা বেড়া এবং গেইট দেখলাম।

নিক বেশ কয়েক বার মোবাইলে কল করলো দাদীকে। কিন্তু দাদী লাপাত্তা। অগত্যা সে বেড়ার সীমানায় জঙ্গল ভেঙে রওয়ানা হলো ভেতরে। আমাকে বললো- ১০ মিনিটের মধ্যেই সে ফিরে আসছে চাবি নিয়ে।

মিনিট দশেক পর এক থুত্তুরে মহিলা চাবি নিয়ে এগিয়ে আসছেন। সঙ্গে, পাশাপাশি হেঁটে আসছে নিক। মনে মনে বললাম- যাক বাঁচা গেল। ঘন্টা ধরে চেপে রেখেছি । এবার মহিলাটি তার সাধের শৌচাগারে ঢুকতে দিলেই হয়! প্রশ্ন জাগলো মনে- নিক তো নিজেই চাবি নিয়ে আসতে পারতো। কী দরকার ছিলো বৃদ্ধাকে কষ্ট দেয়ার!

বৃদ্ধা এগিয়ে এলে তাঁর সঙ্গে কর্মরদন করে নিজের পরিচয় দিলাম। তিনি দরজা খুলে দিলে গাড়িটি নিয়ে ভেতরে চলে গেলাম। গেইট থেকে মাত্র ৫০-৬০ গজ দূরে লতাগুল্মে প্রায় ঢাকা একটি গ্যারেজের সামনে গাড়ি পার্ক করলাম। নিক আর দাদি প্রায় চলে এসেছেন গেইটটি আবার তালা লাগিয়ে।

ওয়াসরুমে যাবার আগ পর্যন্ত মহিলাটিকে সাবলীল রাখা জরুরি মনে করলাম। যেনো সে বেঁকে না বসে। আমিই কথা শুরু করলাম এই বলে যে, তাঁকে দেখে মনেই হয় না যে তিনি ৭৯ বছরের বৃদ্ধা। তিনি সংশোধন করে দিলেন- বয়স তার এখনো ৭৮। ৭৯ হবে আগামী মাস অর্থাৎ অক্টোবরে। নিকের কাছ থেকে জেনেছিলাম তাঁর বয়স।

আমেরিকায় সাধারণত পাঁচ ছয় রকমের বাড়ির স্টাইল। এগুলো যেমন- ম্যানশন, রেইজড রেনচ, রেনচ, কেইপ কড, কলোনিয়াল। ওলগার বাড়িটি রেইজড রেনচ। নীচে গাড়ি রাখার গ্যারেজ ও বাড়তি ঘর, এবং উপরে বসবাস।

সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার সময় লক্ষ্য করছিলাম অসংখ্য খালি বোতল এবং খালি টীনের কৌটা পড়ে আছে দেয়াল ঘেঁসে। কোথাও পুরনো জুতা কাপড়ের গাট্টি।

সাধারণত বাডিগুলোর সামনে গার্বেজ কনটেইনার থাকে দু’ধরনের। একটি পূনব্যবহারযোগ্য অর্থাৎ রিসাইক্লিং বর্জের। আরেকটি সাধারণ বাসাবাড়ির বর্জের। কিন্তু ওলগার বাড়ি অথবা গেইটের সামনে এর একটিও নেই! দেয়াল ঘেঁসে পরিত্যক্ত জিনিষের স্তুপ এ কারনেই।

ওলগাকে অনুসরণ করে সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলাম। ফয়ারে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখিয়ে দিলো ওয়াসরুম। ওলগা নিজেই বলে যাচ্ছিলো, আমার বাড়ি খানা পুরোটাই মেস (বিশৃঙ্খল)। ওয়াসরুমটিও দ্যাখো একেবারে গুদাম।

কয়েক খণ্ড ছেড়া ভেজা তোয়ালে ওয়াসরুমকে আরো স্যাঁতস্যাঁতে করে তুলেছে। কোনো প্রকারে কাজ সারলাম। আমি ঢাকা শহরের মানুষ। এরচেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশেও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়েছি বহুবার। কাউকে গালমন্দের কিছু নেই। বন বাঁদারের পরিবর্তে তুমি যে নির্দিষ্ট একটি স্থান পেয়েছো, এটাই তো বড় কথা।

ওয়াসরুম থেকে বেরুলে মহিলা কফি, ফলের রস কিংবা লুডল স্যুপেরও অফার দিলেন। কিন্তু খাবার গেলার সময় আমার নেই। বরং আমি তাঁর কথা শুনতে পারি দু’দণ্ড। এটা বলার পর তিনি আশ্বস্থ হয়ে তাঁর অভিযোগের হাঁড়ির ঢাকনা খুললেন।

একটি পুটলার গিঁট খুলতে খুলতে বলতে থাকলেন- আমার কাছে সব প্রমাণ আছে। আমি পুলিশ প্রিসিঙ্কটে (থানায়) গিয়ে বহুবার অনুরোধ করে বলেছি, এই দ্যাখো চোরের রেখে যাওয়া প্রমাণ। অথচ তোমরা চোর ধরতে পারো না! চোরের নামপরিচয় পর্যন্ত আমি বলেছি।

যতবার হাসপাতালে দু’চার দিনের জন্য ভর্তি হয়েছি, ততবারই চোর হানা দিয়েছে! পুলিশ আমার কথায় কান দেয় না।

আমি প্রশ্ন করলাম- চোর কিভাবে হানা দিলো? দরজা বন্ধ করে যাওনি? ওলগার উত্তর, বেইজমেন্টের জানালা ভেঙে ঢুকেছে। বললাম- তাহলে সিকিউরিটি কোম্পানির ক্যামেরা লাগিয়ে দাও। চোরকে সনাক্ত করার দায়িত্ব তাঁরাই নেবে। বুঝলাম- প্রস্তাবটি ওলগার মনপুত হয়নি।

ওলগার সঙ্গে আমার দু‘য়েকটি সেলফি থাকলে মন্দ হয় না। বিশেষত ছোটখাট পলিনেশিয়ান চেহারার এই মহিলার একাকী জীবন তো আমেরিকান জীবন ধারারই অংশ! কিন্তু ওলগা সেলফিতে আগ্রহী নন। কারন মুখে ঠোঁটে কিছু লাগানোর সময় তিনি পাননি। চুলগুলোও আলোথালু।

এবার ঘরের ভেতরে সর্বত্র চোখ ঘুরালাম। এ কী, পুরো বাড়িটাই ভাগার। এখানে সেখানে বই আর আবর্জনার স্তুপ। ভাবতে কষ্ট হলো- কোনো এক কালে এই বাড়িতে পাকঘর, খাবার ঘর, বসার ঘর কিংবা শোবার ঘর বলতে কিছু একটা ছিলো। ভেতরটা এতটাই অন্ধকার যে, দিনের আলোতেও আমাকে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালাতে হলো।

ফ্রিজের গায়ে তাঁর একমাত্র সন্তান নিকের বাবা এন্থনির ছবি। নিকরা দুই ভাই। তাদের স্কুল জীবনের ছবিও শোভা পাচ্ছে। একটি ছোট্ট লাল কালোর মিশ্র রঙের ফ্রেম। তাতে লেখা- Love Spoken Here.

বাড়ির ভেতরে ঢোকার সময় ওলগা গেইট তালা মেরে এসেছিলেন। এবার ফেরার সময়েও চাবি নিয়ে আগেভাগে খুলে দিলেন। গাড়ি স্টার্ট দিলাম আমিই। কারন, নিকের হাতে গাড়ি দিয়ে আমি আর দুর্ভাবনায় থাকতে চাই না!

স্টিয়ারিং নিজের হাতে নেয়ার আরেকটি কারন ছিলো নিকের মুখ থেকে ওলগার গল্প শুনতে চাই। পোর্টেরিকো থেকে এসেছিলেন ওলগা, আদতে পলিনেশিয়ান। অর্থাৎ ফিজি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী। নিক নৃবিজ্ঞানের ছাত্র। তাই গবেষকের মতো ওলগার ডিএনএ তার জানা।

ওলগা নার্সিং কলেজে পড়ার সময় বিয়ে করে স্কুল জীবনের বন্ধুকে। তার পরের বছরই এন্থনির জন্ম ১৯৬৩ সালে। তখন তারা থাকতো নিউইয়র্ক নগরীর ব্রোঙ্কসে। কয়েক বছরের মধ্যে এন্থনির বাবা সপ্তাহান্তে আর ঘরে ফিরে না। বন্ধু বান্ধবীর সঙ্গে আড্ডা দিতে চলে যায়। স্বামীকে তালাক দিয়ে ওলগা চলে আসে এই হাডসন ভ্যালীতে। সঙ্গে একমাত্র সন্তান এন্থনি।

গত ৫৬ বছরে ওলগা আর কোনো পুরুষকে তার জীবনসঙ্গী করেনি। স্থানীয় হাসপাতালে নার্সের চাকরি করে সন্তান বড় করে। এর বিয়ে দেয়। নাতি দু’টোকেও সময় সময় বেবী সিটিং করে। ১৯৭০ সালের দিকে বাড়িটিও কিনে।

৭০ দশকের একটি ক্যাডিলাক এখনো সে চালিয়ে ছেলের বাড়ি চলে আসে। এর আগের গাড়িটিও সযত্নে রাখা আছে গ্যারেজের সামনে। রাতে খানিকটা অসুবিধা হয় গাড়ি চালাতে। দিনে কোনো সমস্যা হয় না।

এই বাড়িটিতেই তার নাতি দু’টো বড় হয়েছে। এন্থনিও এখানকার স্থানীয় স্কুল কলেজে পড়াশুনা করেছে। ছেলে নাতিরা মাঝে একসময় প্রস্তাব করেছিলো- আরও বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সঙ্গে বৃদ্ধাশ্রমে দাদীমাকে থাকার। কিন্তু ওলগা যাবেন না। এক কথায় তাদেরকে ‘না’ বলে দিয়েছেন। কারন- একদা এই বাড়িটিতে ভালবাসা ছিলো! এই ভালবাসা ছেড়ে কোথায় যাবেন তিনি?

ছবি:লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]