ওস্তাদ আখতার সাদমানী—স্মৃতিতে যিনি অম্লান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইভা আফরোজা খান

৩০ ডিসেম্বর, ২০০৩। আজ থেকে ১৫ বছর আগে আমার ওস্তাদজি,  ওস্তাদ আখতার সাদমানী এই জগত ছেড়ে চলে যান ।  নিভৃতচারী এই শিল্পী সঙ্গীতে তাঁর অবদানের জন্য ২০১১ সালে একুশে পদক পান (মরণোত্তর)।

এই পদকটি যদি তিনি তাঁর জীবদ্দশায় পেতেন, আমরা হয়তো ওস্তাদজির হাসিমুখখানা দেখতে পারতাম। অনেক গল্প শুনতে পারতাম । অত্যন্ত সৌম্য, শান্ত, সাদাসিধে, ধার্মিক, সময়ানুবর্তী, উচ্চাঙ্গ-সঙ্গীতের প্রতি নিবেদিত এক ওস্তাদজিকে পেয়েছিলাম আমরা। মৃত্যুর দিনটি পর্যন্ত তিনি সঙ্গীত শিক্ষার কর্মকান্ডে ব্যস্ত ছিলেন, বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ অসুস্থবোধ করতে শুরু করেন এবং হাসপাতালে নেয়ার পর জীবনের তাবৎ বোধকে ছেড়ে দিয়ে অন্যলোকে চলে যান। তখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘সুর রং অ্য্যাকাডেমি অফ ক্লাসিক্যাল মিউজিক’-এর দুটি শাখার একটি ছিল ফার্মগেট থানার পাশে ‘যায় যায় দিন’ লেখা একটি পুরনো একরুম বিশিষ্ট দোতলার ঘরটিতে। শ্যাওলা পড়া, পলেস্তারা খসে যাওয়া বাড়িটা বাইরে থেকে দেখা যেত না। কিন্তু বড় গেট দিয়ে ঢুকলে বড় একটি উঠানের মত জায়গায় ওস্তাদজির গাড়িটি অপেক্ষমাণ দেখেছি কোনো কোনো দিন। সরু, খাঁড়া সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় ওঠে ঘরটিতে প্রবেশ করতেই মনে হতো যেন অন্য একটা জগতে চলে এসেছি। প্রথমেই চোখে পড়বে ওস্তাদ আমীর খাঁ সাহেব ( তাঁর ওস্তাদজি)-এর বড় একটি ছবি। নিচে গদির উপর বসে সেই সৌম্যদর্শন, সুদর্শন, শান্ত, উদার, চিরায়ত পোশাক পাঞ্জাবি আর মাথায় লম্বা ধরনের টুপি পরিহিত একজন পাহাড়সম মানুষ।

বাইরে থেকে বহু বাহাদুরি করে ঢুকলেও তাঁর সামনে এসে যেকোন মানুষের মাথা অবনত হয়ে যেত শ্রদ্ধা ও ভালবাসায়। তাঁর ডান পাশে বসতেন যন্ত্রশিল্পী ( তবলা), আর বায়ে সিনিয়র শিষ্যেরা। এখানে কখনো তাঁর পুত্র আমিন আখতার সাদমানী, কন্যা মিলি আখতার এবং অন্যান্যেরা বসতেন। তাদেরকেও দীক্ষা দিতেন। জীবনের নানা গল্প বলতেন। নতুন শিক্ষার্থীরা বসতেন তাঁর মুখোমুখি দুরত্ব বজায় রেখে। একজন একজন করে যার যার পাঠ অনুযায়ী প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ভাবে তালিম দিতেন ও তাদের বাড়ির কাজটি শুনতেন। শুক্রবার ছিল জুনিয়র শিক্ষার্থীদের জন্য আর বৃহস্পতিবার সিনিয়রদের। এছাড়া মাসের একটি বৃহস্পতিবার ছিল কর্মশিবির, যেদিন সিনিয়র দু-একজন এবং অবশষে ওস্তাদজী নিজে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। কর্মশিবিরের মাধ্যমে ওস্তাদজীর অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও পারস্পরিক সম্পর্ক ও মেলবন্ধন তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকত। চলতো গল্পের মাধ্যমে সঙ্গীতের নানাদিক আলোচনা ও হালকা চা নাশতা । ওস্তাদজি বলতেন গান শেখার আগে কান তৈরী হওয়াটা ভীষণ জরুরি। কাজেই তোমরা গান শুনবে ও কর্মিশিবিরে আসবে। এও বলতেন, গানের আগে তবলা শেখো, তাল শেখো। তাল যদি একবার বুঝে যাও তাহলে ১২ মাত্রা, ২৪ মাত্রা, ৪৮ মাত্রার উপরে অবলীলায় তান ও বিস্তার করে যেতে পারবে। আর বলতেন গণিত চর্চা করতে। সঙ্গীতে গণিতের ভূমিকা অপরিসীম। বড় আনন্দময় একটি সভা ছিল এই কর্মশিবির শিক্ষার্থীদের জন্য।

ওস্তাদজির অ্যাকাডেমির অন্য শাখাটি ছিলো তাঁর নিজ বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে। উত্তরার ৪ নং সেক্টরে। বাড়ির নাম এই অ্যাকাডেমির নামেই  ‘সুর রঙ’। উতরা বা তার আশেপাশের শিক্ষার্থীরা সেখানে যেতেন। কর্মশিবিরে তাদেরকেও আমরা দেখতে পেতাম। (ওস্তাদজি মারা যাওয়ার পর এই বাড়িটি ভেঙ্গে নতুন বহুতল অট্টালিকা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে বাড়িটির নামঃ DOM-INNO সুর রঙ ) । ওস্তাদজির সন্তান মোটচারজন ।

ওস্তাদ আখতার সাদমানীর জন্ম ঢাকাতে হলেও ( ১৯৩৪) তিনি বড় হয়েছেন কোলকাতায়। দশ বছর বয়সে তাঁর পিতা আকবর আলী সঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটিয়ে দেন। ১৯৪৪-এ তিনি প্রফেসর ববি ড্যানিয়েলের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা শুরু করেন। ১৯৫৫ তে ববি ড্যানিয়েল ওস্তাদ ওমর খাঁ এর কাছে তাঁকে নিয়ে যান। ওস্তাদ ওমর খাঁ তাঁর কন্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৫৭ সালে ওস্তাদ ওমর খাঁ তাকে নিয়ে যান ইন্দোর ঘরানার ওস্তাদ আমীর খাঁ সাহেবের কাছে। ওস্তাদ আখতার সাদমানী এছাড়াও বহু গুণীজনের কাছ থেকে দীক্ষা নেন। ‘খেয়াল’(khyal) এর তালিম নেন ওস্তাদ আমানত আলী, ওস্তাদ ফতেহ আলী, ওস্তাদ মানজুর হোসেইন খান এবং ওস্তাদ ফয়েজ মোহাম্মদ খাঁ- এর কাছ থেকে। ধ্রুপদে তালিম নেন ওস্তাদ জাহির উদ্দীন ডাগর ও ওস্তাদ ফাইয়াজ উদ্দীন ডাগর –এর কাছে।

১৯৬১ সালে ওস্তাদ আখতার সাদমানী ঢাকায় ফিরে আসেন এবং রেডিও বাংলাদেশে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে যুক্ত হন। ১৯৬৬ সালে তিনি রেডিও বাংলাদেশে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে দআয়িত্ব পালন করা শুরু করেন। তিনি ‘সঙ্গম’ চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলন। তিনি নিয়মিত বাংলাদেশ টেলিভিশনে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান ‘রাগ রং’ এ সঙ্গীত পরিবেশন করতেন এবং শুক্রবার ছোটদের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শেখার অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও নতুন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতেন।

ওস্তাদ আখতার সাদমানী অতি অল্প অর্থের বিনিময়ে কিন্তু অত্যন্ত আন্তরিকতা, সহজ ও পদ্ধতিগতভাবে সঙ্গীত শিক্ষায় তালিম দিতেন। তিনি বলতেন, ‘প্রথমে ফাউন্ডেশন পোক্ত কর। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা যেকোন শিল্পীর মূল ভিত্তি, তারপর যেকোন অঙ্গের গানকেই বেছে নেয়া যেতে পারে নিজের ও শ্রোতার আনন্দের জন্য’। বিভিন্ন সময়ে বর্তমানের প্রতিষ্ঠিত শিল্পী যেমন আঁখি আলমগীর, শম্পা রেজা, প্রয়াত শেখ ইশতিয়াক, তিশমা, নুশরাত ইমরোজ তিশা প্রমুখ তাঁর কাছ থেকে সঙ্গীতে তালিম নিয়েছিলেন।

ওস্তাদ আখতার সাদমানীর প্রয়াণে আমরা যে আমাদের দীক্ষাগুরুকেই শুধু হারিয়েছি তা নয়, একটি সামগ্রিক সঙ্গীত পরিবেশকেও আমরা হারিয়েছি। যে পরিবেশটি ছিল অত্যন্ত শান্তির ও প্রাত্যহিক ক্ষুদ্রতার অনেক ঊর্ধে। ওস্তাদজির জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা ও তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে আমার ক্ষুদ্র নিবেদন। তাঁর আত্মা শান্তিতে থাকুক চিরকাল। আমাদের স্মৃতিতে তিনি চির অম্লান।

ছবি: গুগল ও সংগ্রহ

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]