ও পাখী! আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

পাখীকে আমার বড় হিংসা হয়।একেতো দেখতে অপরূপ তায় আবার নিজস্ব স্বাধীনতা নিয়ে যেখানে সেখানে উড়ে যায়।উড়ে গিয়ে কোন মগডালে বসে।ভুত যেমন গল্পে থাকে,জ্বীন তো কোরান শরীফেই আছে, তারাও যেখানে সেখানে উড়ে বেড়ায়, যত্রতত্র তাদের প্রবেশাধিকার আছে বলে কথিত কিন্তু পাখির স্বাধীনতা খুবই বাস্তব। চোখের সামনেই তা দেখা যায়।তাই তার স্বাধীনতা দেখে হিংসা জ্বাজ্জল্যমান হয়ে ওঠে।এই ফুড়ুৎ ওই ফুড়ুৎ। ছোট বেলায় মাটি ছেনে পুতুল বানানোর সঙ্গে সঙ্গে পাখি ও বানাতাম। আমি ভাবতাম বানানো হয়ে গেছে। শুকোতে দিয়ে খুব আত্মতুষ্টি হতো, কিন্তু পরদিন দেখতাম আলগা করে চাপানো মাথা, পাখা, লেজ অথবা চোখের মনি মাটিতে পড়ে আছে।আমি খুবই দুঃখ পেতাম। তারপর একদিন আবিস্কার করলাম আমার পাখী এমনিতে ভেঙে পড়েনা! পাশের বাসার হিংসুক বান্ধবী তার পাখি মুরগী হয়ে যায় বলে আমার পাখি ভেঙে দেয় অথবা চিমটি দিয়ে আলগা করে বসানো অঙ্গ তুলে ফেলে।

আমার পাখী আর প্রাণ পায়না।পায় ও নাই কোনো দিন কারণ আম্মা একদিন বেদম পিটুনি দিয়ে প্রাণের মূর্তি বানানো বন্ধ করলেন। ইতোমধ্যে আমি গাইতে শিখেছি খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।এবার আমার, আব্বার, আম্মার চেষ্টা চলে গানের পাখির মনের ভেতর প্রাণ আনার চেষ্টা। সে চেষ্টার গল্প আমি আগেও বলেছি।এই গানের মর্মার্থ বোঝার পরে এমন দাঁড়ালো যে এই গান গাইলেই আমি কাঁদি,সে কান্না বন্ধ হতে চায়না। আব্বার এবারের চেষ্টা যে এই গান শুনে কোনো শ্রোতা কাঁদে কিনা। এক বৃদ্ধ ভিক্ষুককে তিনি শ্রোতা হিসেবে ঠিক করলেন। আব্বা ভাবলেন দুঃখী মানুষ, এই গানে নির্ঘাত ভিক্ষুক কাঁদবে।আর ভিক্ষুক যখন কাঁদবে তখনই আব্বার সমস্ত কষ্ট, শ্রম সার্থক হবে। তারপর সত্যি সত্যি সেই নির্বাচিত ভিক্ষুক বাসায় এসে হাঁক ছাড়লে আব্বা প্রস্তাব দিলেন আমার মেয়ের গান শুনে মন্তব্য করো তারপর ভিক্ষা! ভিক্ষুক বাধ্য হয়ে গান শুনতে বসলেন।একটু পরে তিনি উসখুস শুরু করলেন।

আমি ধৈর্য ধরে গান শেষ করলাম। রাগে জিদে আমি কেঁদে ফেললাম। যখন তখন গান গাওয়া আমি সয়ে নিয়েছি, এখন আমার শেষমেশ ভিক্ষুককেও গান শুনাতে হবে! গান শেষে কাঁদতে দেখে ভিক্ষুক বললেন আমি তো গান বুঝিনা কিন্তু পাখি কেমনে আসে যায় শুনে আমার মনে ভাবের উদ্রেক হলো কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনার এই মেয়ে ভালো গান গায় কারণ শুনতে খুবই শান্তি লাগছিলো। এবার দেখি আব্বা চোখ মোছেন। আমি এক দৌড়ে পালিয়ে সেদিনের মতো বাঁচলাম। তবে সেই অচিন পাখি আমাকে জ্বালিয়েই মারছিলো। কিশোরী মনেই মৃত্যুর চলন,মৃত্যুর ভাবনা আব্বা ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন। সেই পাখির চলন, দেহখাঁচার পাখি, সব মিলিয়ে ‘পাখি’ আমার প্রিয় সাবজেক্ট হয়ে দাঁড়ালো। দুই পাখিই আমার ভাবনার খোরাক জোগাতে শুরু করলো। পাখি সংক্রান্ত যত গান সব আমার প্রিয় গান হয়ে দাঁড়ালো।

অসাধারণ শক্তিমান শিল্পী মোহাম্মদ রফিজীর বিখ্যাত সেই গানে আমি মজে গেলাম! ভেবেই পাচ্ছিলাম না যে কি করে এমন গান গাওয়া যায়! না, না, নায়ায়ায়ায়া পাখীটার বুকে যেন তীর মেরো না আয়ায়া —– এই আকুতি কিভাবে সুরে আনা যায়! কি অভূতপূর্ব আকুতি! কি অসাধারণ গায়কী! যেন পাখী শিকারীর পায়ে ধরে সাধছেন! কেমন একটা ধাক্কা খেলাম গানটার সঙ্গে ব্যাখ্যাতীত ভাবে! এরপর অনেক দিন অনেক বছর পরের কথা! অফিসার্স ক্লাবের সম্মানিত ‘লেডিস’ সদস্যদের অনুষ্ঠান। আমি আর বারী সিদ্দিকী ভাইয়ের গান।বারী ভাই আগে গাইবেন।

আমি গ্রীন রুম টাইপ একটা আড়ালে বসা।উনি গান ধরলেন ‘আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি’ আমি এক সেকেন্ডে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললাম। আমার চোখের কাজল গলে গলে কালির সরু নদী বয়ে গেলো। এমন ডাক! পাখি চলে যেতে নিয়েও ফিরে আসতে বাধ্য হবে! কি করে এমন আকুতি বাঁধা যায় সুরে! আমার মনে হলো এরপর আর আমার গান গাওয়ার কোন অর্থ হয়না! তারপর ও অ্যাপয়েন্টেড শিল্পী আমি আমাকে গাইতেই হলো। কিন্তু সারারাত আর ঘুমাতেই পারলাম না।এমন অন্তর্গত কান্না গানে! যেন মোহাম্মদ রফি আর বারী সিদ্দিকী একটি কান্নার দুই প্রান্তের রশি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন অনায়াসে! এরমধ্যে আরেক কান্নাপাখির সুরের ভেতর আটকে গেলাম। তা থেকে বেরুনোর উপায় আমার জানা নাই আজো। আমি আর সুবির’দা ছিলাম আজীবনের হাজার মঞ্চের অবধারিত জুটি।আর সুবির’দার গানের লিস্টে ‘পাখীরে তুই দূরে থাকলে কিছুই আমার ভালো লাগেনা’ গানটা থাকবেই। অনেক সময় সেই গান আমরা পেছন থেকেও চেঁচিয়ে রিকুয়েষ্ট করতাম।

সুবির’দা রোবটের মতো দাঁড়িয়ে এক সাগর প্রেম ঢেলে গাইতে থাকতেন অবলীলায়– পাখীরে তুই কাছে থাকলে গানের সুরে পরান দোলে — আর আমি আমার জীবন সঙ্গীর কথা ভেবে আকুল হতাম অথচ উনি কাছে বসেও ভাবতেই পারতেন না যে আমি তাঁর দিকে চেয়ে কতো প্রেম আঁকছি! এই গান শুনে আমি যেন আবারও উনার প্রেমে পড়তাম রোজই। আমার মনে হতো আমি যেন এই কথা গুলো উনাকেই বলছি।নিতান্তই প্রেমের গান কিন্তু আমার ভাবনা একদম গভীরে গিয়ে কেটে বসতো।

আমি আল্লাহকে বলতাম আল্লাহ আমার এই পাখীর অন্তত একদিন হলেও যেনো আমি আগে মরে যাই।উনি নাই আর আমি আছি এটা আমার পক্ষে মানা সম্ভবই না! এভাবে ভাবতে ভাবতে আমি কেঁদে ফেলতাম অথচ কাউকে বলা হতোনা কেন কাঁদছি! এভাবেই সারাটা জীবন প্রাণপাখী, প্রেমপাখী অনবরত আমাকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দিলো! এখনো সেই ব্যাপারটাই ঘটে রোজ রোজ। পাখী ব্যাপারটাই আমার কাছে অনবদ্য বিষয় আর যারা খাঁচায় পাখী পোষেন তাদের আমি খুবই অপছন্দ করি। কারণ আমার ওড়ার স্বাধীনতা না থাকুক আমার চোখের সামনে পাখী উড়ছে এটা খুবই আনন্দময় দৃশ্য। সে পাখী হোক চড়ুই, হোক কাক, হোক চিল! এই বেলায় বলে রাখি, কাক আমার খুবই প্রিয় পাখী। একদিন আমি একটি ধুসর ছাইরঙা অপূর্ব ঘাড়ওয়ালা সুন্দর একজোড়া কাক আঁকবো!

ছবি: প্রাণের বাংলা


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box