কখনও বুক ভরে ফ্রেশ অক্সিজেন চাই

শামীম আজাদ

শামীম আজাদ

দৌড়ে আটকা পড়া মানুষ বোঝেনা তার দম নেয়া কত জরুরী, বোঝে তার বন্ধুরা। আমার সেই চূড়ান্ত দৌড়ের সময় যখন একদিকে আজাদকে দেখে রাখছিলাম আর অন্যদিকে ইউপিএল এর জন্য কার্তিকা নায়ারের হানি হান্টার অনুবাদ করছিলাম। তখন একদিন মাছ কিনতে গিয়েছিলাম। আর হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম দেখে যে কি না পাওয়া যায় এই বাংলা টাউনে!

আর তখন আমার বন্ধুদের কথাই ছিল আমার শ্বাস আমার অক্সিজেন।ওরাই আমাকে তখন রিমোট কন্ট্রোল টেলিফোনে ভাল রেখেছে। এটি তিন বছর আগের ফেইসবুক স্টেটাস। এখানে শ্রাবনীর ঊল্লেখ আছে আর আছে সে সময়ের নিত্যদিনের গল্প। বাবলী শ্রাবনী নীনা রহিমা সুদেষ্ণা… আমার দূঃসময়ের আশ্বাস তোরা ভালো আছিসতো!
সে সময় একদিন
” শ্রাবনী ক্যানাডা থেকে ফোন করে বলে,
-শামীম সারাদিনতো কেবল ঘরের ভেতরে থাকিস, হয় লিখিস নয় ঘরের কাজ আর আজাদ ভাইর দেখাশোনা। তোর কিন্তু মাঝে মাঝে ফ্রেশ এয়ার খাওয়া উচিত।
– খাইতো। ওকে নিয়ে জিপি, হসপিটাল, ঘরের বাজার…
– আরে না, এমনিও বেরুবি। তোর ঐ সালেহা না মালেহা কে আছে তাকে আজাদ ভাইর কাছে বসিয়ে কাজে না একদম ‘অকাজে’ই বেরুবি। তুই ঠিক না থাকলে কি যে হবে! ভাবতেও পারি না। তাই ঘর থেকে বেরিয়েই বড় শ্বাস নিবি আর ছাড়বি।
– বড় শ্বাস মানে?
– গাধা একটা! মানে পুরো মুখ খুলে হা করে করে শ্বাস নিবি। আবার ছাড়বি। আবার নিবি আবার ছাড়বি। এতে তোর টেনশন কমবে আর বুকটা ফ্রেশ অক্সিজেনে ভরে যাবে।
– আচ্ছা। আমি গুড গার্লের মত বলি। আর মনে মনে আমার মাতৃভাষা সিলেটি অনুবাদে আমার উত্তর শুনি ‘ আইচ্চা আমি আ অইয়া মুটা মুটা শ্বাস লইমু আর ছারমু’রে টুক্লা’।
– আইচ্চা কইলে অইতো নায় মনো রাখিছ। এবার সেও সিলেটিতে বলে।
সেদিন লন্ডনে মাইনাস ডিগ্রী তাপমাত্রা। অর্থাৎ ঘরের বাইরেই ফ্রিজ। সব্জী কিনে আর ফ্রিজে তোলার দরকার নেই বাইরে রেখে দিলেই হবে। পথে পড়ে থাকা কদিন আগের চকোলেটও দেখি একদম গলেনি। তুলে মুছে দিব্বি ফ্রেশ বলে চালানো যাবে। ফুটপাথের নিচু এক চৌকো কংক্রিট ফুটপাথের নালার ময়লা জল বরফ বিস্কুট হয়ে আছে। দোকান পাটের ছাদ সাদা সাদা চিনি কুচোয় ঢেকে আছে। কাল আরো হবে, তুমুল বরফ হবে। মনে হচ্ছে চারিদিকে কেবল ঠান্ডার কষ বেয়ে নামছে। শহর নিঝঝুম। গাড়ি নিয়ে বেরুলে ভাল হত। কিন্তু জ্যামে পরলে ভেতরের গরম হিটারে থাকা অবস্থায় জ্যামে থাকতে থাকতে ঘুম পেয়ে যায়। তখন কোন গাড়ি না কোন গাড়িতে ঢুশ মেরে দেই! তাই বেরুলাম আন্ডার গ্রাউন্ড ট্রেনেই। সালেহাকে বসিয়ে রেখে।

বাসার কাছের আন্ডার গ্রাউন্ড ষ্টেশানের নাম স্নেয়ার্স ব্রুক। সেটাই লাল টুকটুকে সেন্ট্রাল লাইন গলিয়ে সোজা আমাকে উগড়ে ফেল্ল বেথনাল গ্রীন ষ্টেশানে। পড়েই প্রাণপ্রাপ্ত হয়ে ছুটতে শুরু করলাম রিচ মিক্স আর্ট সেন্টার অভিমুখে। সেখানেই আমার ওলিভারের সঙ্গে মিটিং ৪টায়। ছুটছিতো ছুটছি। প্রায় দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে। মিটিং শেষে আবার কিছু বেগুন, রশুন আর চাপিলা মাছ কিনে নিতে হবে। এসবের জন্য আমাদের বাঙালি পাড়াই বেস্ট।

হঠাৎ দেখি বিশাল এক বাঙালি দোকান। এখানে যে যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে সামনে তার স্পোস্টার এবং বিশাল এক লিস্ট। প্রবল শীত প্রতিরোধের জন্য এমনিতেই আমি দৌড়ে দৌড়ে আসছিলাম। মুখ দিয়ে হৃদপিন্ডের শব্দ বেরিয়ে আসছি্লো। হঠাৎ শ্রাবনীর কথা মনে হতেই মুখটা খুলে বিশাল একটা ‘হা’ করে শ্বাসকার্য চালাতে থাকলাম। আর ওভাবেই নিঃশ্বাস নিতে নিতে লিস্টও পড়তে থাকলাম। এদোকানে কি নেই! আমাদের দেশের পাবদা, গুইলশা, চাপিলা, লইট্টা, কাচকী, সরপুঠি, তেলাপিয়, মাগুর, লইট্যা, বাটা, চেউয়া, কালি বাউশ, ইলিশ, বাইম, গলদা চিংড়ি, টেংরা, গজার সব সব। যেন মাছমেলা! এখনই কিনবো না ফিরবার সময় কিনবো তা ভাবছিলাম।

এমন সময় ভেতর থেকে দোকানদার দৌড়ে বেরিয়ে এসে বলে,
-আফা আমরার অত বড় স্টক দেকিয়া ‘আ’ অইগেছন দেখি। আফনার লাখান সবর মুক ওলাউ ‘আ’ অই যায়। ( আপা আমাদের এত বড় স্টক দেখে সবাই আপনার মত হা হয়ে যায়)। ইনো তিব্বত স্নো তনে নিম’র মিছওয়াক সবউ ফাইবা। হা বন্ধ করে বললাম
– আ অইবার মত গটনাউ বটে বাই ( হা হবার মত ঘটনাই বটে ভাই))!

বাড়ি এসে ফেইস বুকে শ্রাবনীর ইনবক্সে ঘটনাটা লিখতেই সে ভাবলো আমি বানাচ্ছি। রেগে বল্লো,
– তুই আস্ত একটা ফাজিলাতুন্নাহার! আমি আবারও ‘হা’।

ছবি: লেখক