কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা : জন্মদিনের শুভেচ্ছাঞ্জলি

আবদুল্লাহ আল মোহন

১.

বাংলাদেশের গর্ব, উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী, গানের পাখি রুনা লায়লার জন্মদিন আজ। ১৯৫২ সালের আজকের দিনে সিলেটে রুনা লায়লার জন্ম। জন্মদিনে আমাদের সকলের প্রিয় শিল্পীকে জানাই ফুলেল শুভেচ্ছাঞ্জলি। জন্মদিন এলেই এখনও শৈশবের সেই স্মৃতির কথা মনে পড়ে তার। রুনা লায়লার ছোটবেলার প্রতিটি জন্মদিনই ছিল স্মরণীয়। ছোটবেলায় মা ও বড় বোন দীনা লায়লার দেওয়া নতুন জামা পরে জন্মদিন কাটত তার। এক সাক্ষাৎকারে রুনা লায়লা বলেছেন, ‘ছোটবেলার সব জন্মদিন ছিল আমার কাছে স্মরণীয়। জন্মদিনে বাড়িতে বন্ধুবান্ধব আসত, কেক কাটা হতো। সব মিলিয়ে দারুণ আনন্দ হতো। এখন আর ঠিক সেভাবে করা হয় না। তার পরও আলমগীর প্রতি বছর জন্মদিনে আমাকে চমকে দিতে নানা ধরনের আয়োজন করে।’ শিল্পী জীবনের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সঙ্গীত জীবনে আন্তরিকতা, সততা, রেওয়াজ, ত্যাগ ও পরিশ্রমের কমতি রাখা যাবে না। এক কথায়, সঙ্গীত হতে হবে সাধনার বিষয়। টাকা আয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে গাইতে আসিনি। ভালোবাসার টানে আজও গাইছি। তার পরও আমি পেশাদারিত্বে বিশ্বাস করি।’ আগামী দিনের পরিকল্পনা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া এখনও সুস্থ আছি, ভালো আছি, গান গাইতে পারছি বলে। যাদের জন্য এই শিল্পী জীবন, সেই সব ভক্ত-শ্রোতার জন্য নতুন নতুন গান করতে চাই। এর বাইরে আলাদা কোনো পরিকল্পনা নেই।’ আজকের এ অবস্থানের পেছনে বড় ভূমিকা হিসেবে মা-বাবা এবং বোন দীনা লায়লার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন রুনা লায়লা।

২.

চিত্রকলাকে বলা হয় বৈশ্বিক, কেননা এর কোনো ভাষা নেই, দৃশ্যময়তাই এর ভাষা। সংগীতের কিন্তু ভাষা আছে, কথা সংগীতের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু কথাকে ছাপিয়ে গান অনেকসময় বৈশ্বিক হয়ে ওঠে; এই হয়ে ওঠার কারণটা হলো কণ্ঠের মাধুর্য। তেমনি মাধুর্য নিয়ে পৃথিবীবাসীকে চমকে দিয়েছেন যিনি, তিনি হলেন রুনা লায়লা। যিনি গাইলে অনেক সময়ই অলৌকিক এক অনুভূতির জন্ম দেয়, মুগ্ধ করে, ভাষারহিত করে। সুতরাং উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের আবেগের নাম রুনা লায়লা, বাংলাদেশের তো বটেই। রুনা লায়লার নামের পাশে কোনো বিশেষণের প্রয়োজন পড়ে না। তারপরও ‘নন্দিত’, ‘খ্যাতিমান’, ‘দেশবরণ্যে’, ‘বিশ্বখ্যাত তারকা’- এই শব্দগুলো তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। কণ্ঠের জাদুতে শ্রোতার কাছে সব সময় তিনি চিরনতুন, চিরতরুণ। এক জীবন ধূপের মতো গন্ধ বিলিয়ে চলেছেন তিনি। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে যাত্রা শুরুর পর এই শিল্পী এখনও তুলনারহিত ছড়িয়ে যাচ্ছেন কণ্ঠের মায়াজাল। সঙ্গীত জীবনে সব ধরনের গানেই তিনি সাবলীল।  বাংলার পাশাপাশি হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, বালুচি, অ্যারাবিক, ফারসি, মালয়, নেপালিজ, জাপানিজ, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ, ফ্রেন্স ও ইংরেজি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। শুধু গান নয়; তার সাজসজ্জা, পোশাক, গায়কী ঢং থেকে শুরু করে সবকিছুকে অনুসরণীয় মনে করেন নানা প্রজন্মের অনুসারীরা। অনেক সংগীতবোদ্ধার কাছে সেরা শিল্পীর নাম রুনা লায়লা। তাদের ভাষায়- তিনি অসাধারণ, অতুলনীয়। তার তুলনা আসলে তিনি নিজেই। মঞ্চে লাইট, সাউন্ডসহ প্রযুক্তির অনেক খেলা থাকে। থাকে নানা বাদ্যযন্ত্রের ঝংকার। এত সবের মাঝেও রুনা লায়লা যখন মঞ্চে থাকেন, তখন তিনি হয়ে ওঠেন মঞ্চের রানী। তিনি আসলে সত্যিকারের গানের রানী। শিল্পী হিসেবে রুনা যেমন অসাধারণ, মানুষ হিসেবেও অতুলনীয়। তাঁর সঙ্গে গল্প করা বেশ আকর্ষণীয়। অসাধারণ সব কথা বলে পুরো জায়গা মাতিয়ে রাখতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ প্রশ্ন তুলেছেন ‘রুনা লায়লা স্বাধীনতা পুরস্কার পান কিভাবে?’। রচনায় তিনি বলেছেন, ‘শিল্পী রুনা লায়লাকে স্বাধীনতা পদক দেয়া হয়েছে, যার সঙ্গে স্বাধীনতার কোনো দূরবর্তী সম্পর্কও ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি তখন পশ্চিম পাকিস্তানে টেলিভিশনে স্টেজ শো করেছেন এবং ওই সময়ের পূর্বাপর নিগার অ্যাওয়ার্ড, ন্যাশনাল কাউন্সিল অব পাকিস্তান অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি পদকে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ভূষিত হয়েছেন। যতদূর জানা যায়, তিনি ঘোরতর পাকিস্তানপন্থি খাজা জাভেদ কায়সারকে বিয়ে করেন, যেমন তার ভগ্নি দীনা লায়লা পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। এ কথা দ্বারা আমি কাউকে ছোট করতে চাই না। শিল্পী হিসেবে তিনি মর্যাদা পেতেই পারেন। কিন্তু যিনি ওই সময় ‘দামা দাম মাসকালেন্দার’-এর মতো বহু উর্দু সংগীত পরিবেশন করেছেন। তাকে স্বাধীনতা পুরস্কার যারা দিয়েছেন তারা অন্যায় করেছেন।’

৩.

রুনা লায়লার বাবার বাড়ি রাজশাহীতে আর মায়ের বাড়ি চট্টগ্রামে। তবে রুনা লায়লা জন্মস্থান কিন্তু সিলেট। কেননা বাবা ছিলেন সিভিল সার্ভেন্ট। চাকরিসূত্রে যখন তিনি সিলেটে অবস্থান করছিলেন, তখনই জন্ম রুনা লায়লার, ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর। তার পিতা মোহাম্মদ ইমদাদ আলী, মাতা আমিনা লায়লা। রুনা লায়লার জন্মের পরপরই পিতা বদলি হয়ে যান পশ্চিম পাকিস্তানের মুলতানে। সেখান থেকে করাচি। করাচিতেই অনেকটা দিন থাকা হয় তাঁর পরিবারের। স্কুল-কলেজ করাচিতেই, ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন প্রথম বিভাগ পেয়ে। পড়াশোনার শেষটা অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৭৪ সালে দেশে ফিরে তিনি বহিরাগত শিক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করেন। রুনা লায়লারা দুই বোন এক ভাই। বোন দীনা লায়লা ও ভাই সৈয়দ আলী মুরাদ। দীনা লায়লা গান শিখতেন। ছোট্ট রুনাও তখন বোনের সাথে বসে থাকতেন। তবে গানের চেয়ে তার আগ্রহ ছিল নাচের প্রতি। ফলে ছোটবেলাই শিখেছেন কত্থক, ভরতনাট্যম ও কথাকলি নাচ। একটি অনুষ্ঠানে দীনা অসুস্হ থাকার কারণে আয়োজকরা রুনাকে স্টেজে বসিয়ে দেন। সেই অনুষ্ঠানে তানপুরা নিয়ে ‘খেয়াল’ পরিবেশন করে সবার নজর কাড়েন। মাত্র সাড়ে ১২ বছর বয়সে ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানি চলচ্চিত্র ‘জুগনু’র মাধ্যমে সঙ্গীতে পথচলা শুরু করেন তিনি। ওই চলচ্চিত্রের ‘গুড়িয়াসি মুন্নি মেরি’ তার জীবনের প্রথম গাওয়া গান। রুনা লায়লা শৈশবে নাচের তালিম নিলেও পরে সঙ্গীতে স্থায়ী হন।  পাঁচ দশকের অধিক সঙ্গীত জীবনে লোকজ, পপ, রক, গজল, আধুনিক- সব ধাঁচের গানই গেয়েছেন রুনা। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ইংরেজিসহ ১৮টি ভাষায় তার কণ্ঠে গান শোনা গেছে। এ পর্যন্ত গানের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। গানের বাইরে চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘শিল্পী’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রুনা লায়লা। এতে তার সহশিল্পী ছিলেন আলমগীর। পরবর্তী সময়ে তারা ঘর বাঁধেন।

৪.

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে রুনা লায়লার গাওয়া প্রথম গান হলো গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও সুবল দাসের সুরে ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে’। লাহোরে থাকাকালেই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন তিনি। দেবু ভট্টাচার্য্যের সুরে করাচি রেডিওতে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রথম রুনা লায়লার কণ্ঠে বাংলা গান শোনা যায়- ‘নোটন নোটন পায়রাগুলো’, ‘আমি নদীর মতো কতো পথ পেরিয়ে’ ইত্যাদি। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে রুনা লায়লা প্রথম প্লেব্যাক করেন ১৯৭০ সালে ‘স্বরলিপি’ চলচ্চিত্রে সুবল দাসের সুর-সঙ্গীতে ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে বলো কী হবে’ গানের মাধ্যমে।  ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে দেশে স্থায়ীভাবে চলে আসার পর প্রথম তিনি গেয়েছেন সত্য সাহার সুরে ‘জীবন সাথী’ চলচ্চিত্রে। এতে তার সহশিল্পী ছিলেন খন্দকার ফারুক আহমেদ। নব্বইয়ের দশকে মুম্বাইয়ে পাকিস্তানি সুরকার নিসার বাজমির সুরে একদিনে ১০টি করে তিন দিনে ৩০টি গানে কণ্ঠ দিয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখান রুন লায়লা। তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ছয়বার। চলচ্চিত্রগুলো হলো- ‘দি রেইন’ (১৯৭৬), ‘যাদুর বাঁশী’ (১৯৭৭), ‘এ্যাকসিডেন্ট’ (১৯৮৯), ‘অন্তরে অন্তরে’ (১৯৯৪), ‘তুমি আসবে বলে’ (২০১২) এবং ‘দেবদাস’ (২০১৩)। এছাড়া বলিউডের বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন রুনা লায়লা। সর্বশেষ গেয়েছিলেন ১৯৯০ সালে অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ‘অগ্নিপথ’ চলচ্চিত্রের ‘আলীবাবা মিল গ্যায়া চল্লিশ চোর সে’ গানটি। বলিউডে তার গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘ও মেরা বাবু চেইল চেবিলা’। এর সঙ্গীত পরিচালনা করেন এম. আশরাফ। পাকিস্তানের ‘মান কি জিত’ (১৯৭২) চলচ্চিত্রে এ গানটি ব্যবহার হয় বলিউডের ‘ঘর দুয়ার’ (১৯৮৫) চলচ্চিত্রে।

সঙ্গীতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন রুনা লায়লা।

৫.

সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা প্রথম নাচ শিখেছিলেন। নাচ দিয়ে শুরু তার শিল্প জীবন। বাবা এমদাদ আলী ছিলেন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা। থাকতেন পাকিস্তানের করাচিতে। সেখানে বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টসে মেয়েকে নাচ শেখার জন্য ভর্তি করেন মা আমিনা লায়লা। এই প্রতিষ্ঠানে চার বছর নাচ শিখেছেন রুনা। শিক্ষক ছিলেন আফরোজা বুলবুল। রুনা তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন কত্থক আর ভরতনাট্যম। রুনা বললেন, ‘এখন আর সেসব মনে নেই। তবে মঞ্চে যখন গান করি, নিজের অজান্তেই তখন নাচের কিছু মুদ্রা চলে আসে।’ বড় বোন দিনা লায়লা গান শিখতেন। বাসায় তাঁকে গান শেখাতে আসতেন একজন ওস্তাদ। তখন আপনার বয়স কত হবে? ‘এই চার কি পাঁচ।’ বললেন রুনা লায়লা। খেলাধুলা করতেন। দৌড়ঝাঁপ ছিল তাঁর নিত্য কাজ। বোন যখন গান করতেন, তাঁর আশপাশেই থাকতেন। ওস্তাদজি বোনকে যা শেখাচ্ছেন, তা তিনি শুনে শুনেই শিখে নিতেন। পরে গুনগুন করে গাইতেন। রেডিওতে কোনো গান শুনলে সুরটা তাঁর ঠিকই মনে থাকত। মেয়ের প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বাবা-মা। গানে মেয়ের সম্ভাবনা সেদিন ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁরা। পরে মেয়েকে গান শেখানো শুরু করেন। রুনা লায়লা বললেন, ‘গানে আমার শিক্ষক ছিলেন আবদুল কাদের, হাবিব উদ্দিন আহমেদ। পরে গজলের গায়কি শিখেছি মেহেদী হাসান সাহেবের বড় ভাই ওস্তাদ গোলাম কাদিরের কাছে।’

৬.

মঞ্চে রুনা লায়লার গান গাওয়ার শুরুটা একদম হঠাৎ করেই। করাচিতে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢাকা ওল্ড বয়েজ অ্যাসোসিয়েশন। এখানে গান করবেন দিনা (রুনার বড় বোন)। কিন্তু অনুষ্ঠানের আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন দিনা। বিপদে পড়েন আয়োজকেরা। শেষে বড় বোনের জায়গায় ছোট বোনকে দিয়ে গান গাওয়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। রুনা বললেন, ‘ওই অনুষ্ঠানে শাস্ত্রীয়সংগীত করেছিলাম। তখন আমার বয়স ছিল ছয়। পরে মায়ের কাছে শুনেছি, আমি নাকি সেদিন ধুমধাম গেয়ে মাত করেছিলাম। তানপুরা নিয়ে গান করেছিলাম। আর ওই তানপুরা ছিল আমার চেয়ে দুই গুণ বড়। সবাই আমার গানে মুগ্ধ হন। খুশি হয়ে সেদিন অনেকেই আমার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেন।’

৭.

তখন রুনা লায়লার বয়স ১২। বললেন, ‘লাহোর থেকে একটি ছবিতে গান করার প্রস্তাব আসে। আব্বা শুনেই না করেন। গান গাওয়া নিয়ে আব্বার কোনো আপত্তি ছিল না, কিন্তু চলচ্চিত্রের ব্যাপারে তখন অনেকেই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। আমার খুব ইচ্ছে হলো। তখন সব বড় বড় শিল্পী রেডিওতে গান করতেন। ভাবতাম, একদিন রেডিওতে আমার নামও বলবে। সবাই আমার গান শুনবে। বাবাকে আমার ইচ্ছের কথা জানান মা। অনেক কষ্ট করে তিনি আব্বাকে রাজি করালেন। আমি ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ পেলাম।’
ছবির নাম জুগনু। উর্দু ছবি। গানটি ছিল ‘গুড়িয়া সি মুন্নি মেরি’। পর্দায় ১২ বছরের একটি ছেলের ঠোঁটে ছিল গানটি। পুরো এক মাস চর্চা করেন রুনা। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে দুই ঘণ্টা আর স্কুল থেকে ফেরার পর দুই ঘণ্টা। ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন মনজুর হোসেন। তিনিই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। রুনা বললেন, ‘মনজুর হোসেন সাহেব আমাকে ফিল্মে গান গাওয়ার কিছু কৌশল শিখিয়ে দেন। সৃষ্টিকর্তা আমাকে যে কণ্ঠ দিয়েছেন, তিনি তা ঘষে-মেজে পলিশ করেন।’ ১৯৬৫ সালের জুন মাসে জুগনু ছবিতে প্রথম গান করেন রুনা। দ্বিতীয় গানটিও একই ছবির। এই গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলান শর্মিলী আহমেদ।

৮.

রুনা লায়লা প্রথম বাংলা গান রেকর্ডিং করেন পাকিস্তান রেডিওর ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসে। দেবু ভট্টাচার্যের সুর করা গান দুটি ছিল ‘নোটন নোটন পায়রাগুলো’ আর ‘আমি নদীর মতো পথ ঘুরে’। গত শতকের ষাটের দশকে বাংলা ছবিতে গান করার জন্য আমন্ত্রণ পান রুনা। চিত্রপরিচালক নজরুল ইসলাম আর সংগীত পরিচালক সুবল দাস স্বরলিপি ছবির গান রেকর্ডিং করতে যান লাহোরে। তাঁরা ছবির একটি গান রুনাকে দিয়ে গাওয়ানোর পরিকল্পনা করেন। তখন তিনি দারুণ ব্যস্ত। একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে গান। একই দিনে বিভিন্ন স্টুডিওতে ছয়-সাতটি গান রেকর্ডিং করছেন। কাজ করতেন সকাল ছয়টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। শুনে রাজি হলেন রুনা। লাহোরের বারী স্টুডিওতে রেকর্ডিং করা হয় গানটি। গানটির শিরোনাম ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে’। একই গানে আরও কণ্ঠ দিয়েছিলেন মাহমুদুননবী। রুনা বললেন, ‘বাংলাদেশে আসার আগে আর কোনো বাংলা ছবিতে গান গাওয়া হয়নি।’ বাংলাদেশে আসার পর প্রথম গান করেন সত্য সাহার সুরে জীবন সাথী ছবিতে।

৯.

বাবা-মায়ের সঙ্গে রুনা লায়লা বাংলাদেশে আসেন ১৯৭৪ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। রুনা লায়লা বললেন, ‘সংগীত জগতের অনেকেই আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। সবাই আমাকে স্বাগত জানালেন। আর বাংলাদেশে ফিরে আসতে পেরেছি, সেটাই ছিল আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের। আব্বা যখন বাংলাদেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন, তখন অনেকেই আমাকে পাকিস্তানে থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। শুনিনি। তত দিনে উর্দু ছবিতে আমি অনেকগুলো গান করে ফেলেছি।’ একই বছর ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনসের (আইসিসিআর) আমন্ত্রণে প্রথম ভারত সফর করেন রুনা। ভারতে প্রথম গান করেন দিল্লি বিজ্ঞান ভবনে, এরপর মুম্বাইয়ে শান মুখআনন্দ হলে। বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে তাঁকে বলা হয় ‘দামাদাম গার্ল’। তাঁর প্লেব্যাক করা প্রথম হিন্দি ছবি এক সে বড়কার এক। কল্যাণজি-আনন্দজির সুরে তিনি ছবির টাইটেল গানে কণ্ঠ দেন। পর্দায় এই গানের সঙ্গে অভিনয় করেন হেলেন।

১০.

পাকিস্তানে নিসার বাজমির সুর করা অসংখ্য গানে কণ্ঠ দিয়েছেন রুনা। রুনাকে দিয়ে নানা ধরনের গান করিয়েছেন এই সুরকার ও সংগীত পরিচালক। পরে মুম্বাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠান রুনাকে দিয়ে নিসার বাজমির সুর করা গান গাওয়ানোর পরিকল্পনা করে। প্রতিদিন একই সুরকারের ১০টি করে তিন দিনে মোট ৩০টি গান রেকর্ড করেন রুনা। পরে তা বিশ্বরেকর্ড হিসেবে স্থান পায় গিনেস বুকে। ১৮টি ভাষায় গান রুনা বললেন, ‘বাংলা ছাড়া আমি উর্দু, হিন্দি আর ইংরেজি ভাষা জানি। তবে বাংলা, হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, পশতু, বেলুচি, আরবি, পারসিয়ান, মালয়, নেপালি, জাপানি, ইতালিয়ান, স্পেনিশ, ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায় গান করেছি।’

১১.

কন্যা ও নাতনীর সঙ্গে

১৯৮২ সালের ১ ডিসেম্বর। এদিন রুনার গাওয়া বাপ্পী লাহিড়ীর সুর করা গান নিয়ে ইএমআই মিউজিক কোম্পানি প্রকাশ করে সুপার রুনা অ্যালবাম। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, প্রথম দিনেই অ্যালবামটির এক লাখ কপি বিক্রি হয়। উপহার হিসেবে রুনাকে দেওয়া হয় গোল্ড ডিস্ক। রুনা বললেন, ‘অ্যালবামটির কাজ করেছিলাম লন্ডনে। লন্ডনের এবি রোডেস, যেখানে বিটল্স গান রেকর্ডিং করত।’

১২.

ছবিতে অভিনয়ের ব্যাপারে পাকিস্তান থেকে তো বটেই, ভারত থেকেও অসংখ্য প্রস্তাব পান রুনা লায়লা। কিন্তু তখন তিনি গানকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। শেষে একটি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। ছবির নাম শিল্পী। রুনা বলেন, ‘এই ছবিটি আমার জীবনের কিছু গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছিল, তাই রাজি হয়েছিলাম।’

১৩.

তাকে নিয়ে আরেক জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন বলেছেন, তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। মানুষ হিসেবে তাঁকে অসাধারণ মনে হয়। তাঁকে আমার কাছে ভালো এবং উঁচু মনের মানুষ বলে মনে হয়েছে। তিনি খুব মজার মানুষও বটে। খুব মাতিয়ে রাখতে পারেন। আমরা দুজন একসঙ্গে কয়েকটি কাজ করেছি। তা হাতেগোনা। চলচ্চিত্রে তুমি বড় ভাগ্যবতী ছবিতে একটি গান করেছি। তাঁকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন। সুরকার আলাউদ্দীন আলীর ভাষায়, রুনা লায়লা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন শিল্পী। রুনা লায়লার মতো ভালো শিল্পী পেয়েছি বলেই তো আমার সুর করা অনেক ভালো ভালো গান টিকে আছে। গান তো শুধু সুর আর কথার ওপর টেকে না, গানটা ভালো গাইতে হয়। আমি এটা সব সময় মনে করি ভালো কণ্ঠশিল্পী দরকার, ভালো বাণী আর ভালো সুর তিনটাই দরকার। রুনা লায়লার সঙ্গে কাজ করতে পারাটা আমার নিজেরও সৌভাগ্য বলে মনে করি। রুনা লায়লা যখন বাংলাদেশে আসে, তখন ভারত থেকে বলা হয়েছিল, তারা ফারাক্কার সব পানি দিয়ে দেবে, আর আমরা যেন রুনা লায়লাকে তাদের দিয়ে দিই! তারা সংগীতের মর্যাদা বুঝে তাই এমন কথা বলতে পেরেছে। এ কথার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, রুনা লায়লার তুলনা তিনি নিজেই। সুরকার আলম খান বলেন, সত্যিকারের সংগীতশিল্পী যাঁকে বলে, তাঁর প্রথম ও প্রধান উদাহরণ হলেন রুনা লায়লা। আমার জীবনে আমি যত শিল্পীকে দিয়ে গান করিয়েছি, তাঁদের মধ্যে গানের ব্যাপারে রুনাকে যেভাবে চেয়েছি, সেভাবেই পেয়েছি। গানের ব্যাপারে তাঁর ভালোবাসা তাঁকে আজকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। স্টুডিওতে আসতে যদি কোনো দিন দুই মিনিট দেরি হতো, সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করতেন। এত বড় মাপের শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও নিজের অনাকাঙ্ক্ষিত দেরির জন্য তাঁর এই দুঃখ প্রকাশের ব্যাপারটি আমার খুব ভালো লাগত। এত সুন্দর সুরে তিনি গান করেন, যা শুনে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। এটা একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় গুণ। তাঁর কণ্ঠের দ্বিতীয় কোনো কপি পৃথিবীতে আর নেই। তাল-লয় সবকিছুতে তাঁর রয়েছে অসাধারণ দখল। তাঁর জন্য আমার অনেক দোয়া। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক আত্মীয়ের চেয়েও বেশি। আর কুমার শানুর মতে,  আমি ছোটবেলা থেকেই রুনা লায়লার গান শুনছি। তিনি অসাধারণ একজন গায়িকা। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য ও গায়কির মধ্য দিয়ে বাংলা গানে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বাংলা লোকগানকে তিনি সবার সামনে নিয়ে আসেন। তাঁর ‘সাধের লাউ’, ‘বন্ধু তিন দিন’Íএসব গান তো মানুষের মাঝে অন্য রকম এক জোয়ার সৃষ্টি করে। রুনা লায়লা এমন একজন শিল্পী যে লোকগান থেকে শুরু করে পপ, সব ধরনের গান গেয়েছেন। আমি সব সময় তাঁর ভক্ত। আমাকে তিনি ব্যক্তিগতভাবেও চেনেন। ভালোবাসেন। আমরা ভালো বন্ধু। আমাদের যেমন লতা মুঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলে আছেন, তার পরই আছেন রুনা লায়লা। এটা সত্যি সাংঘাতিক ব্যাপার। তাঁর কণ্ঠ সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। তাঁর কাছ থেকে আরও ভালো ভালো গান আমরা চাই।

১৪.

দীর্ঘ পাঁচ দশকের অধিককাল ধরে সঙ্গীত সাধনা করে আসছেন শিল্পী রুনা লায়লা। এ দীর্ঘ সময় তার প্রাপ্তির তালিকাও বেশ দীর্ঘ। রুনা লায়লার সঙ্গীত জীবন ও অন্যান্য বিষয়ে শুনব তারই ভাষায়। এবার সরাসরি রুনা লায়লার সঙ্গীত জীবন ও অন্যান্য বিষয়ে তার নিজের মুখেই শোনা যাক। এক সাক্ষাৎকারে শিল্পী আত্মকথনে জানাচ্ছেন- ‘যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই।’ তিনি বলছেন- আমার বয়স তখন ৬ বছর। বাবা-মাসহ আমরা থাকতাম করাচিতে। বাসায় গান শিখি। বড় বোন দীনাও গান করে। ঢাকা ওল্ড বয়েজ অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে দীনার গাইবার কথা। কিন্তু হঠাৎ করেই দীনার গলা খারাপ হয়ে গেল। অর্গানাইজাররা পড়লেন বিপদে। ওরা আমাদের বাসায় এলে মা বলল- দীনা না গাইতে পারলে রুনা গাক। এ কথা শুনে তো অর্গানাইজাররা দ্বিধায় পড়ে গেলেন, এইটুকু মেয়ে কী গান গাইবে। শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানে আমি একটি ক্ল্যাসিকাল রাগ গাইলাম। সবাই দেখল ৬ বছরের একটি মেয়ে তানপুরা যার চেয়ে অনেক বড় সেটা পাশে নিয়ে বসে বসে গাইছে। গান শুনে সবাই খুশি। অ্যাওয়ার্ড পেলাম, সঙ্গে কিছু ক্যাশপ্রাইজও। আমার বয়স যখন ৯ বছর তখন ইন্টার স্কুল মিউজিক কম্পিটিশন হয়েছিল রেডিও পাকিস্তানের উদ্যোগে। কিন্তু আমি ইংরেজি মিডিয়ামের ছাত্রী বলে আয়োজকরা নিতে চাইল না। তাদের কথা- শুধু উর্দু মিডিয়ামের যারা তারাই অংশ নিতে পারবে। মা বললেন, এ কেমন কথা। গান তো গানই, গানের আলাদা ভাষা আবার কী! শেষ পর্যন্ত ওই অনুষ্ঠানে আমাকে গাইবার সুযোগ দেয়া হল এবং একটি গজল গেয়ে প্রথম হলাম। ওই সময় থেকেই গানের চর্চা আরও বেশি বেশি করে শুরু হল। কিন্তু তখনকার সময়ে নাচ, গান, অভিনয়- এসব সাধারণ মানুষ ভালো চোখে দেখত না। গানের পাশাপাশি আরেকটি শখ ছিল আর সেটা হচ্ছে নাচ। অনেকের কাছেই কথাটা নতুন শোনাবে হয়তো। ছেলেবেলায় আমি নাচও শিখেছি। এক-দুবছর নয়, চার বছর বুলবুল একাডেমি করাচিতে ভরত নাট্যম, কত্থক, কথাকলি শিখেছি।

১৫.

পাকিস্তানের তখনকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছিল লাহোরকেন্দ্রিক। একবার লাহোর থেকে একজন পরিচালক, প্রযোজক এবং সঙ্গীত পরিচালক করাচি এলেন একটি চলচ্চিত্রে ১২ বছরের একটি ছেলের লিপে সুন্দর কণ্ঠ খুঁজতে। তারা গেলেন করাচি রেডিওতে। সেখান থেকে আমার কথা শুনলেন এবং বাবার অফিসের নম্বরে ফোন করলেন। বাবা তো কোনোভাবেই ফিল্মের গান করতে দেবেন না। তারা অনেক কষ্ট করে বাবাকে বোঝালেন যে, আমরা আগে আপনার বাসায় আসি এবং একটু কথা বলি। মা-ও বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে আসুক, দেখুক। ওইদিকে আমার তো খুব ইচ্ছা। রেডিওতে বড় বড় সব শিল্পীর নাম বলে, গান শুনি। মনে মনে ভাবতাম, আমার নাম কবে বলবে? ওনারা বাসায় এলেন এবং আমার কণ্ঠ খুব পছন্দ হল। কিন্তু প্লেব্যাকে গান গাওয়ার টেকনিক সম্পূর্ণ আলাদা বলে প্র্যাকটিস করতে বললেন। বাসায় বাবা-মা ভাবলেন, ঠিক আছে, শখেই যখন করছে, তখন একটা গান করুক। তারপর আমার শখও মিটে যাবে, ওনাদের কাজটাও হয়ে যাবে। ওই একটা গানের জন্য এক মাস সকাল-বিকাল প্র্যাকটিস করি। স্কুলে যাওয়ার আগে এক ঘণ্টা আর বাসায় ফিরে হোমওয়ার্ক শেষ করে এক ঘণ্টা। অবশেষে এলো সে মাহেন্দ্রক্ষণ। রেকর্ডিং হল আমার প্রথম গান গুড়িয়াসি মুন্নী মেরি ভাইয়া কী পেয়ারি। গানটা ছিল জুগনু ছবির।

১৬.

এই গানের পরই আমার কাছে নায়িকার লিপে গান গাইবার আমন্ত্রণ এলো। তখন তো পাকিস্তানের দুই অংশে যুগ্মভাবে গান হতো। নায়িকার লিপে প্রথম যে গান গাইলাম সে চলচ্চিত্রটির প্রযোজক ছিলেন মামনুন আর সুরকার মানজুর আহমেদ। মজার বিষয় হচ্ছে ছবির নায়িকা হচ্ছেন শর্মিলী আহমেদ। তিনি বাঙালি, আমিও বাঙালি। গানটা ছিল স্যাড ধরনের। আরও মজার বিষয় হচ্ছে- ওই ছবিতে আমি নায়িকার লিপে যেমন গান গেয়েছি তেমনি ছোটদের লিপেও গেয়েছি। এরপর পাকিস্তানে নানা ভাষায় আমি গান গেয়েছি। পাঞ্জাবি, পশতু, গুজরাটি, সিন্ধি সব। দেখা যেত একটা ছবিতে ৬টা গান আছে যার ৫টাই হয়তো আমি গেয়েছি।

১৭.

১৯৭৪-এ বাংলাদেশে এলাম। সে বছরের শেষে প্রথমবারের মতো ভারত সফরে গেলাম। আয়োজক ছিল ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব কালচারাল রিলেশন অর্গানাইজেশন। দিল্লিতে এবং বোম্বেতে আমার শো। অর্গানাইজাররা বোম্বের শোতে লতা মুঙ্গেশকরকেও আমন্ত্রণ জানালেন। বোম্বের শো-এর দিন আমি স্টেজের পেছনে রিহার্সেল করছি। হঠাৎ দেখলাম পেছনের দরজা দিয়ে কেউ একজন প্রবেশ করছেন- পরনে সাদা শাড়ি ও হাতে গোলাপ ফুলের তোড়া। সঙ্গে আরও দুই-তিনজন। দূর থেকে মনে হল লতাজি আবার ভাবলাম না তা কী করে হয়! যখন নিশ্চিত হলাম লতাজি, তখন দৌড়ে গিয়ে তার পা ছুঁয়ে সালাম করি। লাল গোলাপের তোড়াটি আমার হাতে দিয়ে তিনি শুভেচ্ছা জানালেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিখ্যাত পরিচালক ঋষিকেশ মুখার্জি এবং সলিল চৌধুরী। লতাজির সঙ্গে কথা হল অনেকক্ষণ। দেখলাম আমার সম্পর্কে তিনি অনেক কিছু জানেন। কোত্থেকে জেনেছেন জানতে চাইলে তিনি বললেন, আমি তো অনেক উর্দু গান শুনি এবং বেশিরভাগই তো আপনার গান। আমার গাওয়া তার অনেক প্রিয় গানের কথা চটপট বলে ফেললেন। আমি খুব অবাকই হয়েছি সেদিন।

১৮.

১৯৭৫-এ প্রথম আমি হিন্দি ছবিতে গান গাইলাম। কল্যাণজি আনান্দজির এক সে বাড়কার এক প্রথম ছবি। টাইটেল গানটি আমার গাওয়া। অগ্নিপথ, পেয়ারে লাল, স্বাপ্নোকা মন্দির, দারিন্দা- এ রকম অনেক ছবিতে গেয়েছি। দারিন্দায় তুমে না হো মুজছে তো ইতনা ইয়াকিই হে এবং ভুপেন্দর সিংয়ের সঙ্গে ডুয়েট গান দো দিওয়ানে শাহরমে খুব জনপ্রিয় হল। ডুয়েট গানটি ফিল্মফেয়ার নমিনেশনও পেয়েছিল। বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে জানে বাহার ছবিতে মোহাম্মদ রফির সঙ্গে গান গাইবার কথা খুব মনে পড়ে। ছেলেবেলা থেকে মোহাম্মদ রফি সাহেবের গান শুনে আসছি। ওনার সঙ্গে গান গাইব ভাবতেই পারছিলাম না। রেকর্ডিংয়ের দিন আমি সময়মতোই স্টুডিওতে গেলাম। কিন্তু ঢুকে দেখি রফি সাহেব আগেই চলে এসেছেন। আমি লজ্জা পেলাম। উচিত ছিল আমারই আরও আগে আসা। যদিও আমি সময়মতোই গিয়েছি। যাই হোক ওনাকে সালাম দিলাম এবং দুঃখ প্রকাশ করলাম ওনার আগে পৌঁছাতে না পারার জন্য। আমি ওনার সঙ্গে গাইছি এটা আমার জন্য অতি সম্মানের ও গর্বের বিষয় বলে তাকে জানালাম। উনি উল্টো আমাকে বললেন, আমার সঙ্গে উনি গান করছেন এটা তার জন্য অনেক ইজ্জতের। তার মতো একজন শিল্পীর এমন মন্তব্য আমার জীবনে বিশাল পাওয়া।

১৯.

মোহাম্মদ রফি ও কিশোর কুমারের সঙ্গে বেশকিছু অনুষ্ঠানে গেয়েছি আমি। কিশোর দা খুব মজা করতেন। চমকে দিতে ভালোবাসতেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় একসঙ্গে কোনো গান রেকর্ড হয়নি। সেবার কলকাতার নেতাজি স্টেডিয়ামে শো। শিল্পী আমি, কিশোর দা এবং মোহাম্মদ রফি। আমি ব্যাকস্টেজে ঢুকে ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করি। ওখানে যারা ছিলেন তাদের জিজ্ঞেস করি মোহাম্মদ রফি ও কিশোর দা এসেছেন কিনা? কিশোর দা পেছনের দরজায় লুকিয়ে ছিলেন। হঠাৎ লাফ দিয়ে সামনে এসে বললেন, নমস্কার, আমি এখানে। আমি চমকে গেলাম। আমার অবস্থা দেখে তিনি বললেন, দেখ আমি তোমাকে কেমন ভয় পাইয়ে দিলাম। আমি যখন স্টেজে গাইছি তখন অডিয়েন্সের মধ্যে গিয়ে নানা রকম ফানি চেহারায় উপস্থিত হন তিনি।

২০.

১৯৭৭-এ আমি প্রথমবারের মতো আমেরিকা যাই বাংলাদেশ-আমেরিকান কালচারাল ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে। সিনেটর ম্যাক্যাভার্ন সেখানে ছিলেন। বাংলাদেশ হাইকমিশনের অনেকেই ছিলেন সেখানে। বিশেষ করে সাবের রেজা করিম সাহেবের কথা বলতেই হয়। উনি উদ্যোগটি নিয়েছিলেন। আমার শো হবে আমেরিকা ও কানাডার নানা ভেন্যুতে। প্রথম শো ওয়াশিংটনের বিখ্যাত কেনেডি সেন্টারে। অতিথিদের বেশিরভাগ কূটনীতিক ও সিনেটর। আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার আসবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি আর আসতে পারলেন না; এলেন তার পুত্র চিফ কার্টার এবং পুত্রবধূ। প্রেসিডেন্সিয়াল বক্স-এ বসে আছেন তারা। এফবিআইসহ নানা নিরাপত্তা সংস্থার লোকজনও ছিলেন অনুষ্ঠানে। সবার শেষে আমি দামাদাম মাস্তকালান্দার গানটি গাইলাম। পুরো হল তখন নাচছে, তালি বাজাচ্ছে। চিফ কার্টার এবং এফবিআইয়ের সবাই খুব ভয় পেয়ে গেল যে, হঠাৎ কী হল? চিফ কার্টার আমাদের হাইকমিশনারকে জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছে? তিনি চিফ কার্টারকে আশ্বস্ত করলেন, চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। বোঝালেন আমার এ গানটা সবার খুব প্রিয় এবং গানটা গাইলে সবাই খুব এক্সাইটেড হয়ে যায়। চিফ কার্টার ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তাদের বোঝালেন আতংকিত হওয়ার কিছু নেই সবাই এনজয় করছে। এরপর দেখলাম চিফ কার্টার নিজেও তালি বাজাতে শুরু করলেন। কনসার্ট শেষে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে স্টেজে এলেন আমার জন্য বিরাট এক ফুলের তোড়া হাতে। বললেন, তোমার ভয়েস এত ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। আমরা ভাষাটা বুঝিনি কিন্তু সুর ও তোমার গায়কী এনজয় করেছি।

২১.

ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন মোরারজি দেশাই। একটি সরকারি সফরে আমি ভারত গেলাম। ওনার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা হল। সেটা তার সেক্রেটারিকে জানালাম। আধা ঘণ্টার মধ্যে আমার কাছে কল এলো সন্ধ্যাবেলা আমি আসতে পারব কিনা, উনি গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন। এত সহজেই তিনি রেসপন্স করবেন আমি ভাবিনি, উনি তো ভারতের প্রধানমন্ত্রী চাট্টিখানি কথা নয়। ওইদিনই পার্লামেন্ট ছিল বলে তিনি তার অফিসেই আসতে বললেন। আমি ওনার অফিসে গেলাম। নানা কথা হল। দেশাই সাহেব আমাকে বললেন, জয়দেবের সুরে আপনি দুটি ভজন গেয়েছিলেন সেগুলো আমার খুব প্রিয়। আমি তাকে ধন্যবাদ দিলাম। সেই মুহূর্তে তিনি তার সেক্রেটারিকে বললেন, ফটোগ্রাফার আছেন কিনা? বাংলাদেশ থেকে এত নামকরা একজন শিল্পী এসেছে তার সঙ্গে একটি ছবি না থাকলে কি চলে? সেক্রেটারি তাকে জানালেন ফটোগ্রাফার চলে গেছে। তিনি আমাকে পরদিন সকালে তার বাসায় নাশতা করার নিমন্ত্রণ জানালেন। বললেন আমার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন। আমি একটু অবাকই হলাম। পরের দিন সকালে আমি তার বাসায় নাশতা করলাম, নানা কথা হল, ছবি তোলা হল। ভারতের প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় ছবিসহ অন্যতম খবর হল সেটি। বাংলাদেশের শিল্পী হিসেবে যে সম্মান দেশাইজী আমাকে দেখালেন তাতে আমি সত্যি গর্বিত।

২২.

কলকাতার চিফ মিনিস্টার তখন জ্যোতি বসু। সল্ট লেক সিটিতে একটি কনসার্ট হবে। বোম্বের বিখ্যাত সব শিল্পী আসছেন। স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার মিনিস্টার সুভাষ চক্রবর্তীর মাধ্যমে যোগাযোগ করা হল আমার সঙ্গে। তিনি বললেন, দিদি আপনাকে আসতেই হবে। আমিও রাজি হলাম। বিমান থেকে ল্যান্ড করার পর চিফ মিনিস্টারের গাড়িতেই আমার যাতায়াত ছিল যতদিন ছিলাম। পুরো নিরাপত্তাবাহিনী নিয়ে সাইরেন বাজাতে বাজাতে রাস্তা খালি করতে করতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি একটু লজ্জাই পেলাম এ ভেবে যে, সবাইকে সরিয়ে রাস্তা খালি করতে করতে আমরা যাচ্ছি। তাই আমি একটু নিচু হয়েই বসলাম। ভাবলাম মানুষ কী ভাববে। সঙ্গে আমার মেয়ে। সে তখন ছোট। বলল, মা তুমি লুকাচ্ছ কেন? ঠিক হয়ে বস, বলল ইউ আর লাইক এ প্রাইম মিনিস্টার। আমি বুঝলাম মায়ের গর্বে সেও গর্বিত। আর আমি চিন্তা করছি একজন শিল্পীকে কতটা সম্মান করেন তারা। লতাজি যেখানে থাকেন সেখানেই থাকতে দিলেন আমাকে। আমি বললাম আমাকে অন্য সুইটেও তো দিতে পারতেন? তারা বললেন, আপনি আমাদের অতিথি। আমাদের যতটুকু সম্ভব তার পুরোটাই আপনাদের জন্য করব। শোর দিন মাঠে লাল গালিচা বিছানো হল। গালিচা দিয়ে হেঁটে আসছি আর দুই পাশে উলু ধ্বনি আর ফুল ছিটানো হচ্ছে। এত সম্মান পেয়ে আমি প্রায় কেঁদেই ফেললাম। ভাবলাম শিল্পীকে এরা কতটাই না সম্মান দেয়। শিল্পী হিসেবে নিজের জীবনকে সার্থক মনে হল। সেখানকার লোকেরা বললেন, শিল্পীদের আমরা দেব-দেবীর পর্যায়ে ধরি। তাই আপনাদের সম্মানে বরণ করে নেয়ার বিষয়টি তো আলাদা হবেই।

২৩.

পৃথিবীর বহু দেশে আমি গান করতে গিয়েছি। গানের জন্য গিয়ে সেই দেশটাকে একবার দেখে নেয়া। বেড়াতে যাওয়া, ঘুরতে যাওয়া বলতে তাই। কিন্তু একবার আমি এবং আলমগীর একেবারে প্ল্যান করেই ঘুরতে গেলাম। দুজনেই সময় ঠিক করলাম এবং এটাও নিশ্চিত করলাম কোনো কাজে নয়, শুধুই ঘুরতে যাব আমরা। সারা দিন বেড়াব এবং রিলাক্স করব। স্থান নির্ধারণ হল হাওয়াই। আমরা গিয়েছিলাম তিন দিনের জন্য। কিন্তু দেশটা আমাদের এত ভালো লাগল যে এক সপ্তাহ কাটিয়ে এলাম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে এক দেশ। দেশের মানুষগুলো অনেক ভালো। ট্যুরটা ছিল খুব এনজয়েবল। আমি ও আলমগীর দুজনই প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকি। কখনও আমি ব্যস্ত তো আলমগীর ফ্রি আবার কখনও তার উল্টো। কিন্তু সেবার একেবারে প্ল্যান করে গিয়েছিলাম।

২৪.

আমার মেয়ে তানীর বিয়ে ঠিকঠাক। লন্ডনে গ্রাজুয়েশন করার সময়ই এনগেজমেন্ট হয়ে গেল। জুলাইয়ে পরীক্ষা শেষে বিয়ে। আমি চেয়েছি আমার মেয়ের বিয়ে একেবারেই বাঙালি ঐতিহ্য মেনে হবে। আমার মেয়ে তানী এবং মেয়ে জামাই আরমান দুজনই এ যুগের ছেলেমেয়ে। ভাবলাম ওরা বিষয়টা কীভাবে নেবে। কিন্তু দুজনই সম্মত হল। আমি আর তানী যুক্তরাজ্যে শপিং করলাম। আলমগীরের সঙ্গে শপিং করলাম ব্যাংককে। সবাই মিলে শাড়ি কিনতে গেলাম ভারতে। আমার কাজ ছিল সব জোগাড় করে দেয়া আর আলমগীর হলুদ, খাওয়া-দাওয়া, দাওয়াত দেয়া থেকে পুরো দায়িত্ব পালন করল। আমাদের বাসাজুড়ে উৎসবের আমেজ। গায়ে হলুদ থেকে সব ধরনের ঐতিহ্যগত আয়োজন ছিল বিয়েতে। কেউ হাতে মেহেদি দিচ্ছে তো, কেউ চুল বাঁধছে, কেউ স্টেজ ঠিক করছে- সব মিলিয়ে অন্যরকম এক পরিবেশ। বিয়েতে করাচি থেকে আমার ছেলেবেলার দুই বান্ধবীও এলো। পুরো আয়োজনটি এত মধুর ছিল যে, এখনও ভাবতে অসম্ভব ভালো লাগা কাজ করে।

২৫.

জীবনে বেশকিছু আনন্দঘন মুহূর্ত মনে পড়ে যায়। প্রথম গান রেকর্ডিংয়ের দিন, প্রথম যখন অ্যাওয়ার্ড পেলাম সেদিন, আমার মেয়ে তানীর জন্মদিন। তারপর প্রথম যেদিন নানি হলাম। ২৪ নভেম্বর ২০০৪ তানীর প্রথম সন্তান জেন জন্ম নিল আর আমি হলাম নানি। আমি দুমাস আগেই লন্ডনে গিয়ে উঠলাম। তার দেড় বছর পর জন্ম হল অ্যারেনের। এখন ওদের সঙ্গে খেলা করতে খুব ভালো লাগে। জেনের বয়স যখন কয়েক মাস, তখন মিউজিক শুনলেই দেখি ও হাত-পা বেশি বেশি নাড়ে। যখন কথা বলতে আর গাইতে শিখল তখন তো রীতিমতো আমার ভুল ধরে বসে। একদিন কী একটা গান যেন গাইছিল। আমাকে বলল তুমিও আমার সঙ্গে গাও। আমিও একটু একটু গাইছি। ও বলছে তোমারটা হচ্ছে না তো এভাবে গাও। আমি মজা পেয়ে হাসতে হাসতে বললাম তুই এটা বাইরে বলিস না তাহলে অন্যের মার খাবি। ওরাই এখন আমার খেলার সাথী। আমি সময় পেলে লন্ডনে যাই। মেয়ে আমার বন্ধুর মতোই। সেখানে গেলে অনেক আড্ডা হয়, বাইরে ঘোরা হয়, খাওয়া-দাওয়া হয়। আমি সেখানে গেলে রান্নাবান্নাও করি। আলমগীর বলে, তোমাকে তো কখনও এখানে রাঁধতে দেখি না? আমি বলি ওইখানে গেলে কেন জানি ভালো লাগে। সবকিছু খুব সহজেই পাওয়া যায় আর রাঁধতেও সময় লাগে না। কাটাকুটির ঝামেলাও কম। কথা শুনে সে হাসে।

২৬.

১৯৭৮ সালের কথা। আমার কাছে একটা আমন্ত্রণপত্র এলো। তাও আবার কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহর নিজ হাতে লেখা। তিনি কাশ্মীরে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করতে চান। এজন্য আমি তাকে ফান্ড জোগাড় করে দিতে কোনো সাহায্য করতে পারব কিনা? আমি পারফর্ম করলে ফান্ড উঠবে। ভারতে তিনি অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছেন কিন্তু তাদের কেউই টাকা ছাড়া পারফর্ম করতে রাজি হলেন না। আমি তাকে উত্তর পাঠালাম। আমাকে হাতে লিখে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এজন্য আমি সম্মানিত বোধ করছি। যেহেতু আপনি একটি মহৎ উদ্দেশে ফান্ড তুলতে চাইছেন সেখানে পারিশ্রমিক নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমি শুধু বললাম, আমার সঙ্গে কয়েকজন মিউজিশিয়ান আসবেন এবং আমার পরিবারের কয়েকজন সদস্য যেতে ইচ্ছুক। তিনি আমাকে সাদরে কাশ্মীর আমন্ত্রণ জানালেন। লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়ে তার অফিসিয়াল রেসিডেন্সে থাকতে দিলেন। বাড়িতে দাওয়াত করলেন। অনুষ্ঠানের দিন তিনি এমন এক বক্তৃতা দিয়েছিলেন যা কোনোদিন ভোলার নয়। আমি বাংলাদেশের একজন শিল্পী যিনি মানবতার ডাকে এসেছি। বিনা পারিশ্রমিকে গান গাইছি সব বললেন। শুধু আমাকে নয় বাংলাদেশের মানুষকে, বাংলাদেশ সরকারকে তিনি ধন্যবাদ জানান। স্বনামধন্য একজন রাজনীতিবিদের কাছ থেকে এতটা সম্মান পেয়ে সেদিন শিল্পী হিসেবে, বাংলাদেশের শিল্পী হিসেবে আরেকবার গর্ববোধ করলাম।

২৭.

একনজরে রুনা লায়লা-

নাম : রুনা লায়লা

জন্মস্থান : সিলেট

জন্মদিন : ১৭ নভেম্বর (১৯৫২)

স্বামী : চিত্রনায়ক আলমগীর

পিতা-মাতা : সৈয়দ এমদাদ আলী – আমিনা লায়লা

আদি নিবাস : বগুড়া

ভাই-বোন : দুই বোন, এক ভাই (বোন-দীনা লায়লা, ভাই সৈয়দ আলী মুরাদ)

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে দীক্ষা : ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খান ও আবদুল কাদের পিয়ারাং

গজলে দীক্ষা : পণ্ডিত গোলাম কাদির (মেহেদী হাসানের ভাই)

দর্শকের সামনে প্রথম গান গাওয়া : ছয় বছর বয়সে

গানে প্রথম পুরস্কার লাভ : ৯ বছর বয়সে

প্রথম প্লে-ব্যাক : পাকিস্তানি চলচ্চিত্র জুগনুতে। বয়স তখন সাড়ে এগারো।

বিভিন্ন ভাষায় গান গাওয়া : হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, পশতু, বালুচি, অ্যারাবিক, ফারসিয়ান, মালয়, নেপালিজ, জাপানিজ, ইটালিয়ান, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ ও ইংলিশ।

উপস্থাপনা : উনিশ বছর বয়সে পাক্ষিক বাজমে লায়লা (নিজের অনুষ্ঠান)

এখন পর্যন্ত গানের সংখ্যা : ১০ হাজারের অধিক

এখন পর্যন্ত পদকের সংখ্যা : বাংলাদেশ ও বিভিন্ন দেশ থেকে তিন শতাধিক পদক।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার : সর্বোচ্চ ছয়বার।

( তথ্যসূত্র : দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক সমকালসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট)