কতটা পথ পেরোলে প্যারিস যাওয়া যায়- পর্ব পাঁচ

শ্যামলী আচার্য

পর পর বেশ কিছু শব্দ। তার মধ্যে ছোট্ট মিড়। স্পর্শসুর। সুক্ষ্ম কারুকাজ। কেউ উদাত্ত গলায়, কেউ গুনগুনিয়ে। কখনো অবসর দুপুরে। কখনো হয়তো গভীর রাতে। কিন্তু অবশ্যই একলা থাকার সময়। একলা মানেই তো নিটোল কবিতা। যে শব্দের অনুরণন চলতেই থাকে, বারে বারে কে যেন ডাকে। 
কবিতা, তোমার সংগে একা। ভিড়ের মধ্যে বসে কি কবিতা পড়া যায়? আমি পারিনা। আমি আবার তেমন করে কবিতা বুঝিও না। শুধু ওই যে একের পর এক শব্দ দল বেঁধে এগিয়ে আসে, কখনো গুটিগুটি পায়ে, কখনো হুড়মুড়িয়ে জলপ্রপাতের মতো, ওদের চোখে তাকিয়ে দেখি, সাড়া পাই কিনা। সাড়া না পেলেই বুঝি, আমার জ্বলেনি আলো। কোথাও আমার বোঝার অক্ষমতা, ছুঁতে পারার ব্যর্থতা। সেই কবিতা ক্রমশ সরে যায়। কবিতা তো অভিমানী। তাকে আদর-যত্নে কোলে-কাঁখে না রাখলে অবধারিত সে পরকে আপন করে… আমারই বঁধুয়া আমারই আঙিনা দিয়া চলে অভিসারে। কবিতাকে ভালবেসে যাঁরা অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছেন, আমি তাঁদের দলে নই। অত দুঃসাহস আমার নেই। নিতান্ত ছাপোষা। আমি ভীরু ভীরু চোখে লাস্ট বেঞ্চে একা জুলজুল করে চেয়ে দেখি তাঁদের। দু’চারটি ছেঁড়া পাতায় কাটাকুটি-মাখা শব্দের সংগে আড়ি-ভাব খেলা। উড়ে এসে পড়ে কখনো-সখনো। আমার শুধু আলো-আঁধারে …… কাঁদা-হাসা।

প্যারিস কারো কাছে ফরাসী-বিপ্লব। কারো কাছে চিত্রকলা-স্থাপত্য। কারো কাছে কবিতার দেশ।

সংগে যখন একজন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠিত এবং একজন স্ট্রাগলিং উড-বি কবি, তখন কি প্যারিস ভ্রমণে কাব্যময় হয়েছিলাম আমরা? নাঃ। সে গুড়ে কাঠপিঁপড়ে। স্মার্ট ট্যুর-ম্যানেজার কাম অ্যারেঞ্জার অংশুমান ও-রসে বঞ্চিত। কিন্তু কাব্যে উপেক্ষিত হলেও দর্শনে তো থাকতেই হবে। ছবি-কবিতার দেশে যে বিশাল অঞ্চল জুড়ে অপূর্ব নির্জনতায় নিজের সৃষ্টিতে ডুবে থাকা যায়, আড্ডা-গল্প-ক্যাফে-গান-ছবি-কবিতা-পানীয়-প্রকৃতি মিলিয়ে আমাদের সেই গ্রামের নামটি মঁমার্ত।
১৮৭৫ সালে শুরু হওয়া সাক্রে-ক্যুর ব্যাসিলিকা। সাক্রে-ক্যুর, অর্থাৎ সেক্রেড হার্ট। পবিত্র হৃদয়। হৃদয়ের পবিত্রতা নিয়ে প্রভু যীশুর অধিষ্ঠান হেথায়। ২৩৪ টি ধাপ পেরোলে তবে দরশন। ব্যাসিলিকার পায়ের কাছে ইতিউতি বেঁকে যাওয়া নানান পথে ঝরা পাতার সঙ্গে শুধু হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা। সব কবিই যেমন বলে থাকেন, গন্তব্যের চেয়েও সে গন্তব্যে পৌঁছনোর পথটিই আসল। সেই পথে অলস মায়া, মেঘের খেলা। আঁকাবাঁকা পথ বেয়েই প্লেস দে তেরত্রে। 
মঁমার্ত রোমান অর্থে “মাউন্ট অফ মার্স”, পরবর্তীতে ফরাসী অপভ্রংশে “মাউন্ট অফ মার্টায়ার্স”। নামে কি আসে যায়? ছড়িয়ে রয়েছে জলরং, কাগজ, তুলি, ব্রাশ আর সীমাহীন মগ্নতা। সরু গলির কোনো ক্যাফের টেবিলে হেলান দিয়ে বসতেন পিকাসো। ভ্যান গঘ সারাবেলা উপোসী শরীরে বুভুক্ষু চোখে খুঁজে যেতেন কোনো তারা-ভরা আকাশ। হেমিংওয়ের কড়া চুরুটের ধোঁয়া এখনো পাক খায় রাস্তার ধারে ওয়াইন-গ্লাসের পাশে। এলিভেটর ট্রেনে চড়ে অনেক উঁচুতে উঠলে তবেই ব্যাসিলিকার গোড়ায়। সেখান থেকেই এক পলকে অনেকটা প্যারিস শহর ক্যামেরার নাগালে।
রয়েছে মঁমার্ত মিউজিয়ম, সালভাদোর দালির মিউজিয়ম। আর যেদিকেই তাকাই, দেওয়ালে দেওয়ালে মনের খেয়ালে লেখা-আঁকা। রঙ্গিন চক তুলে নিয়ে তুমিও লিখে রাখো ফুটপাথে তোমার অমরত্বের দাবি-দাওয়া। গিটারে-বেহালায় অবলীলায় ঝড় তুলে চলে যাবেন কেউ। ফুটপাথে বসে হাসিমুখে বাজিয়ে চলেছেন কেউ অযাকর্ডিয়ান। প্রশংসার হাসি উপহার দিলেই টুপি খুলে কুর্নিশ।
বারে বারে বলা হয় “France breathes culture”…… অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় সব পথ। সিমেতিয়েরে সমাধিস্থ রয়েছেন এমিল জোলা ও আলেক্সান্দার দুমা। তাঁদের আর বিরক্ত করতে যাইনি। বাতো লাভোয়ার (Bateau Lavoir) বাড়িটিতেও কড়া নেড়ে খামোখা সময় নষ্ট করিনি আমরা। পিকাসো এখন আর থাকেন না ঐ বাড়িতে।
কম ভাড়া, সস্তা খাবার আর চমৎকার নিসর্গ এই আড়াই কিলোমিটার ব্যাসার্ধের অঞ্চলটিকে করে তুলেছে শিল্পীর আপন বাস।

স্বর্গ যদি কোথাও থাকে……… এইখানে……।(চলবে)

ছবি:লেখক