কতটা পথ পেরোলে প্যারিস যাওয়া যায়- পর্ব ৪

শ্যামলী আচার্য

অনাথ কাটেরিনা। ফ্লোরেন্স থেকে এগারো মাইল দূরের এক গ্রামে থাকে সে। সেই গ্রামেরই ছেলে পিয়েরো। পৈতৃক জমিতে চাষ-আবাদ তার। পিয়েরোর বাবা আন্তোনিওর পেশা নোটারি। যে কোন দলিল বা বিবৃতিকে আইনিভাবে সার্টিফাই করেন তিনি। এ তাঁদের বংশগত পেশা। বংশের প্রথম সন্তান বংশানুক্রমে নোটারির কাজ করবে, এই রকম নিয়ম চলে এসেছে বরাবর। সের পিয়েরো নিজেও ছিলেন অ্যাটর্নী এবং নোটারি পেশায় নিযুক্ত। কিন্তু পিয়েরোর সন্তান লিওনার্দো ছিলেন তাঁর পিতার অবৈধ সন্তান। পিয়েরো আর কাটরিনার তো বিয়েই হয়নি। অতএব বংশানুক্রমিক নিয়ম থেকে লিওনার্দো বেঁচে গেলেন এ যাত্রা। ফ্লোরেন্স থেকে এগারো মাইল দূরের ভিঞ্চি গ্রামের লিওনার্দোকে আর বাধ্যতামূলক ভাবে শিখতে হল না লাতিন ভাষা, গিলতে হল না নীরস পুঁথির পাঠ। স্বশিক্ষিত এই বিজ্ঞানমনস্ক মানুষটি প্রকৃতি, যুক্তি আর শিল্প মিলিয়ে মিশিয়ে ক্রমশ নিজেই এক রেনেসাঁ, লিওনার্দো মানেই নবজাগরণ।
ফ্রয়েড যেমন বলেছিলেন, He was, like a man who awoke too early in the darkness, while the others were all still asleep.”

মোনালিসা। এক মধ্যবয়সী রমণী। কি আছে তোমার মনে, বুঝিব তাহা কেমনে?
ল্যুভর মিউজিয়মে দোতলায় ডেনন উইং-এর ছ’নম্বর ঘরে মোনালিসার সামনে দাঁড়াই। ঠাসাঠাসি ভিড়। বিরাট বড় দেওয়ালে ছোট্ট একখানি ছবি। তামাম বিশ্ব যে ছবিতে মুগ্ধ। কুর্নিশ জানাই স্রষ্টাকে।

প্যারিস বেড়াতে গেলে সকলেই এক নিশ্বাসে চাক্ষুষ করতে চান আইফেল টাওয়ার। আমরা অবশ্য প্রথম দিনেই চলে গিয়েছিলাম ল্যুভর মিউজিয়ম। সুকান্ত’দা বলেছিলেন, সারাদিন ধরে ঘুরে ঘুরেও তাঁর আশ মেটেনি, অধিকাংশ গ্যালারিই দেখা বাকি থেকে গিয়েছে। জানতাম। বাকি তো থাকবেই। একে হাতে সময় কম। শিল্প-বোদ্ধা বা কলা-রসিক কোনোটিই নই যে অসীম বিস্ময়ে এক মাস ধরে খুঁটিয়ে দেখবো তাবৎ সংগ্রহ। দেখলেও, বুঝব কতটুকু? বড়জোর হাঁ করে খানিক তাকিয়ে চাট্টি ছবি তুলে ফেসবুকে সাঁটানো। আত্মপ্রচার। সংগে কিছু ফরাসী কবির নাম আর কোবতের লাইন তুলে কোটেশান মারলে তো আর কথাই নেই। ছাক্কা মার্কস।

কিছু শিল্পীর নাম জানি। তাঁদের কিছু কাজ-কর্মের কথাও পড়েছি। অতএব, প্রথমে তাঁদের মুখোমুখি হওয়াই ভাল। মোনালিসা, আথেনা, ভেনাস। কিছু ছবি, কিছু ভাস্কর্য। এই ডেনন উইঙেই তারা আছেন। খুঁটিয়ে দেখার সময় কম। ঘাড় তুলে হাঁ করে গিলি। উঁচু ছাদের দিকে চেয়ে হাঁটলে চোখে ঝিলমিল লেগে যাবে।

শ্যেন নদীর ধারের এক প্রাচীন দূর্গে ইউরোপের যাবতীয় ছবি আর স্থাপত্য সাজিয়ে বসে আছে প্যারিস।

সাবানের ফেনায় বুদবুদ তৈরি হয়। বাইরের খোলা মাঠে খেলা দেখায় কেউ। অনেক বুদবুদ উড়ে যায়, ভেসে যায়। দূরে কাঁচের পিরামিডে রোদ ঠিকরে পড়ে। দীর্ঘদেহী কৃষ্ণাঙ্গ হাত বাড়িয়ে দেখান, এক মুঠোয় পাঁচটি আইফেল টাওয়ার। মাত্র এক ইউরো।

দোতলা বাসের মাথায় চড়ে পর্যটক এগিয়ে যান। অন্য কোথা। অন্য কোনোখানে।

আমি লিখি না। লিখতে পারি না। শুধু লেখা লেখা খেলি। শব্দে ধরা সম্ভব নয় ল্যুভর মিউজিয়ম।
আর সেভাবেই বিদেশ ভ্রমণের গপ্পো। যেভাবে ভাবি, যা দেখি, অবিকল তাই। যতটা পারি…

ছবি : লেখক